জগৎকারণ হিসেবে অচেতন বস্তুকে স্বীকার করা একান্তই সম্ভবপর কিনা—এ-প্রশ্ন অবশ্যই স্বতন্ত্র। আধুনিক বস্তুবাদীরা নিশ্চয়ই বলবেন, তা সম্ভবপর এবং বাদরায়ণের উপরোক্ত যুক্তি সত্ত্বেও। আমাদের পক্ষে বর্তমানে এই সমস্যার আলোচনায় প্রবেশ করবার প্রয়োজন নেই। কেননা, এখানে আমাদের মূল সমস্ত হলো সাংখ্যের আদিরূপটিকে সনাক্ত করা। এবং সাংখ্যের বিরুদ্ধে প্রাচীনদের এ-জাতীয় যুক্তি থেকে আমরা অন্তত এটুকু অনুমান করতে পারি যে, আদিতে সাংখ্য শুধুমাত্র নিরীশ্বরবাদই ছিলো না, বস্তুবাদ বা জড়বাদও ছিলো। আধুনিক পরিভাষায় শুধুমাত্র atheism নয়, materialism-ও। তাই উত্তরকালে সাংখ্য-প্রসঙ্গে আমরা যে-সব অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী চিন্তার পরিচয় পাই, আদি-সাংখ্যের দিক থেকে সেগুলিকে অর্বাচীন ও প্রক্ষিপ্ত ধ্যানধারণার নমুনা বলেই অভিহিত করা প্রয়োজন।
এইখানে আমাদের মন্তব্যটি আরো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। আমরা নিরীশ্বরবাদ ও বস্তুবাদের কথা একই সঙ্গে উল্লেখ করলাম, কেননা এ-দুয়ের মধ্যে একটা তত্ত্বগত যোগাযোগ আছে, যেমন তত্ত্বগত যোগাযোগ আছে অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদের মধ্যে। সাংখ্য যে আদিতে নিরীশ্বরবাদই ছিলো এবং পরে তার উপর জোর করে ঈশ্বরতত্ত্ব চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিলো, এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানেরা বড়ো বেশি দ্বিমত হবেন না। এমন কি, আমাদের সনাতনপন্থী বিদ্বানেরাও তা স্পষ্টভাবেই স্বীকার করছেন। কিন্তু সাংখ্যে যে আদিতে সুস্পষ্ট জড়বাদও ছিলো এবং উত্তরযুগে সাংখ্যকারিকা ও সাংখ্য-সূত্রের মতো গ্রন্থেও ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারার যে-পরিচয় পাওয়া যায় তাও যে বিজাতীয় ও প্রক্ষিপ্ত ধ্যানধারণারই নমুনা মাত্র—এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানের সম্যকভাবে সচেতন নন। এর কারণ কী এবং কী ভাবে এই কারণেই তারা উপনিষদের মধ্যেও সাংখ্য-দর্শনের বীজ আবিষ্কার করবার চেষ্টা করেছেন, তার আলোচনা তোলা প্রয়োজন।
প্রথমত, সাংখ্যে ঈশ্বরের স্থান আছে কী? পণ্ডিত কালিবর বেদান্তবাগীশ(৭৩৫) লিখছেন :
…মহাভারত, ভাগবত ও পুরাণ, এই সকল গ্রন্থে কপিল সম্বন্ধে যেরূপ ইতিহাস প্রকটত আছে তাহা দেখিলে কপিল ঈশ্বরনাস্তিক ছিলেন বলা দূরে থাকুক, তিনি সম্পূর্ণ আস্তিক, ঈশ্বরের প্রধান ভক্ত বা অবতার না বলিয়া থাকা যায় না। কিন্তু তাহার গ্রন্থ দেখিলে অনুভব হয়, তিনি একজন ঈশ্বরনাস্তিকের অগ্রগণ্য।…প্রথম অধ্যায়ের ৯২ সূত্র “ঈশ্বরাসিদ্ধেঃ”।
…ভাষ্যকার বিজ্ঞানভিক্ষু আভাস দিয়াছেন যে, এ-স্থলে ঈশ্বরাপলাপ করা কপিলের উদ্দেশ্য নহে; বাদীর মুখস্তম্ভ করাই তাহার উদ্দেশ্য। ঈশ্বর নাই বলিবার অভিপ্রায় থাকিলে “ঈশ্বরাসিদ্ধেঃ” এরূপ না বলিয়া “ঈশ্বরাভাবাৎ” এইরূপ বিস্পষ্ট উক্তি করিতেন। ভাষ্যকার যাহাই বলুন, আমরা বুঝি “ঈশ্বরাসিদ্ধেঃ”, “ঈশ্বরাভাবাৎ” ফলকল্পে তুল্য।
বেদান্তবাগীশ মহাশয় এখানে কপিলের গ্রন্থ বলতে সাংখ্য-সূত্রেরই উল্লেখ করছেন। এবং এই গ্রন্থে যে যে স্থানে “যে যে ভাবের ঈশ্বর সম্বন্ধীয় কথা আছে তাহা একত্রিত করিয়া” বিচার করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মুস্কিল এই যে, তার উপরোক্ত মন্তব্যের সঙ্গে সাংখ্য-সূত্রের ঈশ্বর-সম্বন্ধীয় অন্যান্য উক্তিগুলির সহজ সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায় না। এবং এই কারণেই বেদান্তবাগীশ মহাশয়কে শেষ পর্যন্ত উপরোক্ত উক্তিকে শুধরে বলতে হয়েছে যে, সাংখ্যের প্রকৃত কথাটা হলো, “নিত্য-ঈশ্বর নাই, কিন্তু জন্য-ঈশ্বর আছেন।”
এদিক থেকে অধ্যাপক গার্বের(৭৩৬) মন্তব্য আরো সংস্কারমুক্ত। তিনি দেখাচ্ছেন, প্রথমত সাংখ্য-সূত্র নামের গ্রন্থটিকে কপিলের রচনা বলে কল্পনা করবার কোনো কারণ নেই; এ-গ্রন্থের রচনাকাল চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দী। বিজ্ঞানভিক্ষুর ভাষ্য আরো শ’ দেড়েক বছর পরের রচনা। এবং ওই সাংখ্য-সূত্রের মধ্যেও সাংখ্য-দর্শনের আদি অকৃত্রিম রূপটিকে দেখতে পাওয়া যায় না। কেননা, এই গ্রন্থের একটি মূল চেষ্টা হলো, সাংখ্য এবং উপনিষদের চিন্তাধারার মধ্যে মৌলিক প্রভেদকে অস্বীকার করা। গার্বে বলছেন, সাংখ্য-তত্ত্বের সঙ্গে ঈশ্বর এবং উপনিষদের ব্রহ্মের তত্ত্বের কোনো গরমিল নেই, কিংবা সাংখ্যের দিক থেকে স্বৰ্গলাভমুলক পুরুষার্থের কথায় অসঙ্গতি নেই—এর চেয়ে অসম্ভব অনুমান আর কিছুই হতে পারে না; অথচ, সাংখ্য-সূত্রকার সেই কথাটি প্রচার করবার জন্যেই বিস্তর অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন। বস্তুত, ওই সাংখ্য-সূত্রের মধ্যে বৈদান্তিক প্রভাব যে কতো প্রকট তার পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গার্বে নিম্নোক্ত সূত্রটির উল্লেখ করেছেন :
আবৃত্তিরসকৃদুপদেশাৎ॥ সাংখ্যসূত্র : ৪,৩ ॥
অর্থাৎ, “যদি সকৃৎ শ্রবণে বিবেকজ্ঞান না হয় তবে তাহা বার বার শ্রবণ করিবে। (শ্বেতকেতু সাত বার শ্রবণের পর বিবেকজ্ঞান পাইয়াছিলেন)”। সাংখ্য-সূত্রের এই সূত্রটি যে একেবারে হুবহু ব্ৰহ্মসূত্রের (৪৷১।১) পুনরুক্তিমাত্র, সে-বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। কিংবা, সাংখ্যসূত্রের পঞ্চম অধ্যায়ের ১১৬ সূত্র হলো :
সমাধিসুষুপ্তিমোক্ষেয়ু ব্ৰহ্মরূপতা॥
এ-তত্ত্ব যে খাঁটি বৈদান্তিক তত্ত্ব এবং এমন কি ‘ব্রহ্মরূপতা’ বলে পরিভাষাটিও যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বেদান্ত-দর্শন থেকে গৃহীত হয়েছে, সেবিষয়েই বা সন্দেহের অবকাশ কোথায়? বলাই বাহুল্য, এ-জাতীয় কথা যদি সত্যিই সাংখ্য-দর্শনেরই প্রতিপাদ্য হতো তাহলে বাদরায়ণের পক্ষে বেদান্তদর্শনের প্রধানতম প্রতিপক্ষ হিসেবে সাংখ্যকেই খণ্ডন করবার অমন তাগিদ থাকতো না।
