অতএব আমাদের পক্ষে এখানে ভালো করে দেখা দরকার, উপনিষদাদি গ্রন্থে সত্যিই কী আছে। প্রধানাদি সাংখ্য-দর্শনের পারিভাষিক শব্দ যে আছে সে-কথা বাদরায়ণও অবশ্যই অস্বীকার করবেন না। কিন্তু সাংখ্য-দর্শনের পারিভাষিক শব্দ থাকা মানেই সাংখ্যের দার্শনিক তত্ত্ব থাকা নয়। বস্তুত, উপনিষদাদির যে-অংশে আধুনিক বিদ্বানের সাংখ্যের নিদর্শন পাচ্ছেন বলে কল্পনা করেন সেগুলিকে বিচার করলে আমরা দেখতে পাই যে, আসলে সেখানে সাংখ্যের খণ্ডনই বর্তমান। এইটেই হলো আসল ফ্যাক্ট এবং এ-ফ্যাক্ট অগ্রাহ্য না করলে সবিনয়ে স্বীকার করতেই হবে যে, আধুনিক বিদ্বানদের তুলনায় বাদরায়ণ উপনিষদের প্রকৃত ঐতিহ্যের অনেক কাছে ছিলেন বলেই, উপনিষদরচকদের পদামুসরণ করে ব্রহ্মসূত্রের মধ্যে প্রধানকারণবাদ খগুনের প্রচেষ্টাকেই অতোখানি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
উপনিষদাদির আলোচ্য অংশে ঠিক কী আছে? সাংখ্য-তত্ত্ব, না, সাংখ্যখণ্ডন? এ-প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে সাংখ্যের আদি-অকৃত্রিম তত্ত্ব বলতে ঠিক কী বোঝায়, সে-বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। কোথা থেকে সে-ধারণা পাওয়া যাবে? আমাদের যুক্তি অনুসারে, ওই বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্র থেকেই। তার কারণ, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে সাংখ্য-দর্শনের এর চেয়ে পুরোনো আর কোনো উল্লেখ আমরা পাই না। অর্থাৎ কিনা, সাংখ্য-মত হিসেবে বাদরায়ণ তাঁর ব্রহ্মসূত্রে ঠিক যে মতবাদটিকে খণ্ডন করছেন তাকেই সাংখ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে স্বীকার করা প্রয়োজন। তা না হলে কল্পনা করতে হয়, বাদরায়ণ সাংখ্য নাম দিয়ে কোনো এক কল্পিত দার্শনিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিলেন। সে রকম একটা কল্পনা যে নেহাতই অসম্ভব, আশাকরি সকলেই তা মানবেন। সাংখ্য নিশ্চয়ই ব্রহ্মসূত্রের চেয়েও পুরোনো, ব্রহ্মসূত্র রচনাকালে সাংখ্য নিশ্চয়ই ভারতীয় চিন্তার ক্ষেত্রে প্রচুর প্রভাব বিস্তার করেছিলো; তা না হলে সাংখ্য-খণ্ডনে বাদরায়ণের অতোখানি উৎসাহের আর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কিন্তু সাংখ্যের দার্শনিক তত্ত্ব বলতে ঠিক কী বোঝাতে এ-বিষয়ে বাদরায়ণের রচনায় পূর্বপক্ষ হিসেবে বর্ণিত সাংখ্যের ওই পরিচয়টির চেয়ে পুরোনো আর কোনো পরিচয় আমাদের জানা নেই। তাই এই পরিচয়টির উপর নির্ভর না করে সাংখ্যের আদিরূপ সংক্রান্ত অন্য যে-কোনো মতবাদ দাড় করবার চেষ্টা করলে তা মনগড়া হবারই সম্ভাবনা। এই কথাটি স্বীকার করলে মানতে হবে, অন্যত্র আমরা সাংখ্যের যে-পরিচয় পাই—এমনকি সাংখ্য-কারিকা ও সাংখ্য-প্রবচন-সূত্র নামে উত্তরকালে রচিত সাংখ্যের ওই ছুটি পুঁথিতে সাংখ্য-দর্শনের যে-পরিচয় পাওয়া যায়—তার সঙ্গে আদি-অকৃত্রিম সাংখ্যের কতোখানি মিল আছে, এ-প্রশ্নের উত্তর পেতে হলেও আমাদের পক্ষে বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রে প্রত্যাবর্তন করে সেখানে সাংখ্যের যে-পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে তার সঙ্গে এগুলিকে মিলিয়ে দেখা দরকার। এবং উপনিষদাদির অংশ-বিশেষে সাংখ্য-দর্শনের পারিভাষিক শব্দের পরিচয় পেলেও আমাদের পক্ষে এই পদ্ধতি অনুসারেই বিচার করা প্রয়োজন যে, সেখানে সাংখ্য-তত্ত্ব না সাংখ্য-খণ্ডন—ঠিক কিসের নমুনা রয়েছে। কেননা, উপনিষদ যদিও অবশ্যই ব্রহ্মসূত্রের চেয়ে পুরোনো, তবুও উপনিষদে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়নি কোনটি সাংখ্য-মত এবং কোনটি সাংখ্য-মত নয়, ব্রহ্মসূত্রেই সর্ব প্রথম স্পষ্টভাবে সে-কথা বলে দেওয়া হয়েছে। এইভাবে, ব্রহ্মসূত্রে যেকথা স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে তারই আলোয়, উপনিষদে যে-কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি তা বোঝবার চেষ্টা করা ছাড়া আর উপায় কি?
বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রে সাংখ্য-মত হিসেবে নির্দিষ্ট কোন দার্শনিক তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়? প্রাচীনদের পরিভাষায় তার নাম হলো, অচেতনকারণ-বাদ বা প্রধান-কারণ-বাদ। অর্থাৎ, অচেতন বা জড় প্রকৃতিই জগৎকারণ। ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যায় শঙ্করাচার্য(৭৩৩) যেমন বলেছেন, “সাংখ্যের সিদ্ধান্ত এই যে, যেমন ঘটাদি মৃন্ময় পদার্থে মৃত্তিকারূপের অন্বয় থাকায় মৃত্তিকাজাতি সে-সকলের কারণ, তেমনি, যে-কিছু বাহ্য ও আন্তরিকভাবে (পদার্থ) আছে, সে সমস্তই সুখদুঃখমোহ রূপে অম্বিত থাকায় সুখদুঃখমোহাত্মক কোনো এক সামান্য পদার্থ সে-সকলের কারণ। সুখদুঃখমোহাত্মক সেই সামান্য পদার্থটি ত্রিগুণ ও মৃত্তিকাদির ন্যায় অচেতন”। সাংখ্য-দর্শনকে এই অর্থে বুঝেছিলেন বলেই স্বয়ং বাদরায়ণ সাংখ্য-খণ্ডনের একটি চূড়ান্ত যুক্তি হিসেবে বলছেন,
রচনানুপপত্তেশ্চ নানুমান্ম্ ॥২।২।১৷৷
প্রবৃত্তেশ্চ ॥২।২।২৷৷
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
অর্থাৎ, অচেতন প্রধানের পক্ষে জগৎকারণ হওয়া সম্ভবই নয়, কেননা জগতে রচনা বা উদ্দেশ্য-সাধনের (purposiveness) পরিচয় আছে এবং তা অচেতন-জনিত হতে পারে না। এবং “রচনা দূরে থাকুক, রচনাসিদ্ধির জন্য যে প্রবৃত্তি—অমুকুল প্রচেষ্টা,—তাহাও অচেতন প্রধানের পক্ষে স্বাধীনভাবে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।…হেতু এই যে, মৃত্তিকার ও রথাদি অচেতনের তাদৃশী বিশিষ্ট প্রবৃত্তি দেখা যায় না। মৃত্তিকাই হউক আর রথাদিই হউক, কুম্ভকারের ও রথবাহকের অধিষ্ঠান ব্যতীত আপনা হইতে কেহ কখনও মৃত্তিকাকে ও রথকে বিশিষ্ট কার্যাভিমুখ হইতে দেখে নাই।…যেহেতু, অনুমান সমর্থক দৃষ্টান্ত নাই, সেইহেতু অচেতনের প্রবৃত্তি অননুমেয়।…যেহেতু অচেতনের বিশিষ্ট কার্য প্রবৃত্তির অনুমান তুর্ঘট, সেইহেতুই অচেতন জগৎকারণের অনুমানও দুর্ঘট।”(৭৩৪)
