সাংখ্য-দর্শনের বৈদিক-ঐতিহা-স্বীকৃত সংস্করণটির পরিচয় হিসেবে গার্বে ভগবদগীতা ও উপনিষদের সেই অংশগুলিরই উল্লেখ করছেন যেগুলির নজির দেখিয়ে ওল্ডেনবার্গ-প্রমুখ বিদ্বানেরা উপনিষদের মধ্যেই সাংখ্য-দর্শনের বীজ আবিষ্কার করবার কল্পনা করেছিলেন। অতএব, এখানে অন্তত একটি বিষয়ে গার্বে ওবং ওল্ডেনবার্গ-এর মতের মিল দেখা যায়। বিষয়টি হলো, গীতা ও উপনিষদের আলোচ্য অংশগুলির মধ্যে প্রকৃত সাংখ্যমতেরই উল্লেখ আছে। আমাদের মন্তব্য হলো, সাংখ্য-বিচারে ব্রহ্মসূত্রের সাক্ষ্যকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেছেন বলেই আধুনিক বিদ্বানের উপনিষদে সাংখ্য-দর্শনের খণ্ডনপ্রচেষ্টাকেই সাংখ্য-পরিচয় বলে কল্পনা করবার মতো ভ্রান্তিকে এতোখানি প্রশ্রয় দিতে পেরেছেন।
প্রথমত, বাদরায়ণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বৈদিক সাহিত্যে সাংখ্য-দর্শনের অব্যক্তাদি পারিভাষিক শব্দ দেখলেই, সাংখ্য-চিন্তাধারা অনুমান করবার সুযোগ নেই :
আনুমানিকমপ্যেকেষামিতি চেন্ন, শরীররূপকবিন্যস্ত-গৃহীতের্দ্দর্শয়তি চ ॥১।৪।১
বৈদান্তিক আচার্যরা এই সূত্রটির ভাষ্য-রচনা করবার সময় স্বভাবতই আর বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন, শ্রুতিতে মহৎ, অব্যক্ত প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার দেখলেই সাংখ্য চিন্তাধারা কল্পনা করা যায় না। শঙ্কর(৭৩০) যেমন বলছেন;
সাংখ্য যে স্বতন্ত্র ত্রিগুণ অব্যক্ত প্রতিপাদন করে, সেই অব্যক্তই যে কঠশ্রুতিতে পঠিত হইয়াছে, এরূপ প্রত্যভিজ্ঞ জন্মে না। কঠশ্রুতিতে কেবল সাংখ্যের অব্যক্ত শব্দটি পঠিত হইয়াছে বলিয়া প্রত্যভিজ্ঞ জন্মে সত্য; কিন্তু তাহার অর্থের প্রত্যভিজ্ঞ জন্মে না। অর্থাৎ, যে অব্যক্তশব্দ সাংখ্য স্মৃতিতে ত্রিগুণ অচেতন পদার্থবিশেষের বোধক, কঠশ্রুতির অব্যক্তও যে সেই অব্যক্তই, এরূপ প্রত্যভিজ্ঞা-জ্ঞান জন্মে না। যাহা ব্যক্ত নয় তাহাই অব্যক্ত, এ-অর্থ বা এরূপ যোগার্থ লইয়া দুর্লক্ষ্য সূক্ষ্মতত্ত্বেও অব্যক্ত শব্দের প্রয়োগ হইতে পারে। অব্যক্ত-নামে কোনো রূঢ় (সর্ববিদিত) পদার্থ নাই। যাহা কেবলমাত্র সাংখ্যের রূচি, সাংখ্যের পরিভাষা, তাহা লইয়া বেদার্থ নিরূপণ হয় না।
বাদরায়ণের কাছে উপনিষদের তত্ত্ব এবং সাংখ্যের স্বরূপ—উভয় বিষয়ই সম্যকভাবে বোঝবার পক্ষে এই বিষয়টির গুরুত্ব অত্যন্ত মৌলিক। তাই তিনি একাধিকবার এ-কথা উত্থাপন করেছেন। পাছে সাংখ্যবিদ পণ্ডিতেরা উপনিষদের নজির দেখিয়েই ত্রিগুণাত্মক অচেতন প্রধানকে বা প্রকৃতিকেই, জগৎকারণ বলে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেন, এই আশঙ্কা নিরসনের জন্য তিনি বলছেন :
ঈক্ষতের্নাশব্দম্॥ ১।১।৫॥
ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলছেন :
সাংখ্যকল্পিত জড়রূপ প্রকৃতি বেদান্তশাস্ত্রে জগৎকারণরূপে স্থান পাইতে পারে না, অর্থাৎ বেদান্তশাস্ত্রে অচেতন প্রকৃতির জগৎকর্তৃত্ব প্রতিপন্ন হয় না। অথবা, সৃষ্টিবিষয়ক বেদান্তবাক্যের “অচেতন প্রধান জগৎকারণ” এরূপ অর্থও হয় না, অর্থাৎ প্রকৃতি বা প্রধান তদ্বাক্যস্থ পদের বাচ্য বা বোধ্য নহে। কেননা, যে জগৎকারণ, সে ঈক্ষিতা, এইরূপ শুনা যায়। যেহেতু ঈক্ষিতৃত্ব শুনা যায় সেইহেতু প্রধান অশব্দ,—অর্থাৎ শৌত শব্দের অপ্রতিপাদ্য।—ইত্যাদি, ইত্যাদি।
শুধু তাই নয়। সাংখ্য যে আদিতে বেদ-বিরুদ্ধ ছিলো তার প্রমাণ হিসেবে বাদরায়ণ প্রমুখ সাংখ্য-বিরোধী দার্শনিকদের উক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের কাছে একমাত্র প্রমাণ নয়। সাংখ্য-কারিকা প্রভৃতি গ্রন্থেও আদিসাংখ্যের এই স্পষ্ট বেদ-বিরোধিতার চিহ্ন থেকে গিয়েছে। এ-বিষয়ে শ্ৰীযুক্ত পুলিনবিহারী চক্রবর্তী(৭৩১) আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন :
খুব সম্ভব এমন এক যুগে কপিল-দর্শন প্রণীত হয় যখন বৈদিক যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়ার প্রবল প্রভাব ছিলো এবং সাধারণের বিশ্বাস ছিলো যে বিহিত-পদ্ধতিতে যজ্ঞ করলে যজমানের স্বৰ্গলাভ হবে। বৈদিক পুরোহিতের কাছে স্বৰ্গই ছিলো পরমপুরুষাৰ্থ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে সাংখ্য প্রবল প্রতিবাদ ঘোষণা করে এবং প্রমাণ করতে চায়, স্বর্গের কথা অমূলক এবং বৈদিক যাগযজ্ঞ অনর্থক। ‘দৃষ্টবদানুশ্রবিক:’ ইত্যাদি সাংখ্য-কারিকার দ্বিতীয় শ্লোকে তার প্রমাণ আছে। অবশ্যই কারিকা খুব প্রাচীন গ্রন্থ নয়; কিন্তু তবুও তা প্রাচীন ঐতিহ্যের বাহক। (স্বাধীন তর্জমা)।
তাহলে শুধু যে বৈদান্তিকেরাই বলছেন সাংখ্য বেদবাহ্য ও বেদ-বিরুদ্ধ তাই নয়, সাংখ্যের নিজস্ব সাহিত্য থেকেও আদি-সাংখ্যের বেদবিরোধিতার(৭৩২) পরিচয় মুছে যায়নি। এদিক থেকেও বেদান্তের মধ্যেই আদি-সাংখ্য আবিষ্কার অত্যন্ত অস্বাভাবিক প্রচেষ্টা হতে বাধ্য।
আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে যাঁরা উপনিষদের ভিতরেই সাংখ্য-চিন্তার পরিচয় পেয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই বাদরায়ণ এবং তার অনুগামী বৈদান্তিক আচার্যদের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে বলবেন, এইভাবে সাংখ্যের প্রধানকে ‘অশব্দ’ অর্থাৎ বৈদিক ঐতিহ্য বিরুদ্ধ বা বৈদিক ঐতিহ্য বহির্গত বলে প্রমাণ করবার চেষ্টাটা নেহাতই আত্মপক্ষ সমর্থনে গায়ের-জোরের কথা। কেননা, উপনিষদের অংশ-বিশেষে এবং গীতায় সাংখ্যের তত্ত্ব রয়েছে এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই রয়েছে। অর্থাৎ, চলতি কথায় আমরা যাকে বলি ফ্যাক্ট—চোখের-সামনে থাকা বাস্তব সত্য—তা অস্বীকার না করে বাদরায়ণ বা বৈদান্তিক আচার্যদের কথা স্বীকার করা যায় না।
