আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো, রিচার্ড গার্বের এই মহামূল্যবান মন্তব্যের মধ্যে দুর্বলতম অংশ বলতে শেষের কথাগুলিই। কেননা, সাংখ্য-দর্শনের পক্ষে আস্তিক্যপদ লাভের যে সহজ-সরল ব্যাখ্যা তিনি এখানে দিয়েছেন তা স্বীকারযোগ্য হতে পারে না। বস্তুত, নিজস্ব মৌলিক তত্ত্বগুলি বিসর্জন দেবার পরই সাংখ্য-দর্শন আস্তিক বলে স্বীকৃত হয়েছে : অর্থাৎ আদি-সাংখ্য এবং আস্তিক-সাংখ্য মোটেই এক নয়। সাংখ্য-দর্শনের ইতিহাসে এই গুণগত পরিবর্তনটির কথা রিচার্ড গার্বে একেবারেই স্বীকার করেন না।
আপাতত, আমাদের মন্তব্য হলো, গার্বের উদ্ধত মন্তব্যে সাংখ্য-দর্শনের আদি-অবৈদিকত্ব সংক্রান্ত যে-যুক্তি ও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা অগ্রাহ্য করবার কোনো কারণ নেই। এবং যদিও গার্বে নিজে বাদরায়ণের এবং অন্যান্য বৈদান্তিক আচার্যের মন্তব্যকে একেবারে গুরুত্ব দেননি, তবুও তাঁর সিদ্ধান্ত এঁদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে যায়নি। কিন্তু বাদরায়ণের সাক্ষ্যকে গুরুত্ব না দেবার ফলে গার্বের নিজের সিদ্ধান্তের মধ্যেই স্ব-বিরোধিতা থেকে গিয়েছে; তার আলোচনায় পরে প্রত্যাবর্তন করা যাবে।
সাংখ্যের উৎপত্তি-প্রসঙ্গে আমরা যে-সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি তার পক্ষে প্রধানতম প্রয়োজন হলো আধুনিক বিদ্বানদের ওই মতবাদটি খণ্ডন করা, যে-মতবাদ অনুসারে উপনিষদের মধ্যেই সাংখ্য-দর্শনের বীজ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অতএব আমরা সুবিস্তৃতভাবে সে-মতবাদের আলোচনা করলাম। সুখের বিষয়, বৃদ্ধসম্মতি হিসেবে রিচার্ড গার্বের নাম ছাড়াও এখানে আমরা আরো কয়েকজন আধুনিক বিদ্বানের নাম উপস্থিত করতে পারি যাঁদের সিদ্ধান্তের গুরুত্বকে অগ্রাহ্য করতে ভারতীয় দর্শনের ছাত্ৰ-মাত্রই দ্বিধা করবেন : মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং হেইনরিখ জিমার। মহামহোপাধ্যায়ের উক্তি আমরা ইতিপূর্বেই (পৃঃ ৫০৮) কিছুটা উদ্ধৃত করেছি; তাই এখানে জিমার-এর সিদ্ধান্ত আলোচনা করা যাক। সাংখ্য-মত প্রসঙ্গে জিমার(৭২৯) বলছেন :
সাংখ্যের তত্ত্বগুলি বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যের অন্তর্গত নয়।…দুটি ধ্যানধারণার উৎস স্বতন্ত্র : সাংখ্য ও যোগ জৈনদের যান্ত্রিক দর্শনের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত এবং এই জৈন চিন্তাধারাকে সুদীর্ঘ তীর্থঙ্কর পরম্পরার দিক থেকে আধা-ঐতিহাসিক এবং আধা-পৌরাণিকভাবে, প্রাচীন ভারতের এক সুদূর বন্য অ-বৈদিক যুগ পর্যন্ত পিছনে দেখতে পাওয়া যায়। অতএব, সাংখ্য আর যোগের মূল ধারণাগুলি অসম্ভব পুরোনো। তবুও, আস্তিক রচনায় এগুলির আবির্ভাব অনেক পরের ঘটনা—উপনিষদের অপেক্ষাকৃত নবীন অংশে এবং গীতায়-ই প্রথম এই ধারণাগুলির আবির্ভাব ঘটেছে এবং তাও বৈদিক দর্শনের মূল ধ্যানধারণার সঙ্গে ইতিমধ্যেই মিশ্রিত হয়ে। তীব্র প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস উত্তীর্ণ হয়ে আর্যদের ব্রাহ্মণ মনের রুদ্ধ দরজা শেষ পর্যন্ত খুলে গেলো, এবং স্থানীয় সভ্যতা থেকে ইংগিত ও প্রভাব গ্রহণ করতে শুরু করলো। তারই ফলে দুটিঐতিহ্যের মিলন হলো। (স্বাধীন তর্জমা)
তাহলে জিমার এবং গার্বে উভয়েই সিদ্ধান্ত করছেন, সাংখ্য-যোগের মূল কথাগুলি আদিতে ভারতীয় আদিবাসীদের চিন্তাধারার,—অতএব অ-বৈদিক ঐতিহ্যের,—অন্তর্গত ছিলো এবং কালক্রমে তা বৈদিক ঐতিহ্য-দ্বারা গৃহীত হয়েছিলো। এ-সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই মূল্যবান, যদিও এ-সিদ্ধান্তের প্রকৃত তাৎপর্য দু’জন বিদ্বানের মধ্যে কেউই নির্ণয় করবার চেষ্টা করেনি। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুটি স্বতন্ত্র ধারা প্রবাহিত হয়েছে। সেই দুটি ধারাকে আমরা আর্য ও অনার্য বা আর্য ও দ্রাবিড় বা বৈদিক ও অবৈদিক—যে-কোনো নামেই উল্লেখ করি না কেন, দুটি ধারার মধ্যে পার্থক্যটা জাতিগত নয়, তথাকথিত আর্যদের কোনো রকম সনাতন মনস্তত্ত্বজনিতও নয়। এই প্রভেদের মূলে ছিলো উৎপাদন পদ্ধতির মৌলিক প্রভেদ; পশুপালন-প্রধান অর্থনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বৈদিক ধ্যানধারণা স্বভাবতই পুরুষ-প্রধান, কৃষিমূলক অর্থনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত অ-বৈদিক ধ্যানধারণা স্বভাবতই মাতৃপ্রধান বা নারীপ্রধান। এই নারীপ্রধান ধ্যানধারণারই প্রকটতম উদাহরণ হলো তন্ত্র : তন্ত্রমতে প্রকৃতিই প্রধান, জগৎ বামোস্তৃত, অকৃত্রিম তন্ত্রের সাধনপদ্ধতিও বামাচার বা স্ত্রীআচার। আধুনিক বিদ্বানেরা যদি অনুমান করতে বাধ্য হন যে, আদিতে সাংখ্যমতও ওই অ-বৈদিক ঐতিহ্যেরই অন্তর্গত ছিলো, তাহলে স্বীকার করা প্রয়োজন যে, যে-ধ্যানধারণাগুলিকে আমরা ব্যাপক অর্থে তান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে থাকি, আদিতে সাংখ্য বলতে তারই অপেক্ষাকৃত দার্শনিক সংস্করণ বুঝিয়েছে। প্রাচীন-রচনায় আমরা এ-ইংগিত পেয়েছি যে, লোকায়তিক ধ্যানধারণা এবং ওই তান্ত্রিক ধ্যানধারণা অভিন্ন ছিলো এবং এই দুয়ের মধ্যে তত্ত্বগত সাদৃশ্যও ঠিক কোথায় তা আমরা তন্ত্রের দেহতত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বোঝবার চেষ্টা করেছি : মানবদেহের অনুরূপ হিসেবে তন্ত্রে বিশ্বরহস্যকে বোঝবার চেষ্টা করা হয়েছে বলেই তার আদি-অকৃত্রিম রূপটির মধ্যে অধ্যাত্মবাদের বা ভাববাদের কোনো স্থান হয়নি। তাই, উত্তরযুগে ওই তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলির উপর অধ্যাত্মবাদের আর ভাববাদের প্রলেপ যতোই মাখানো হোক না কেন, আদিতে এই ধ্যানধারণ লোকায়তিক বা বস্তুবাদীই ছিলো—সে-বস্তুবাদ আদিম বলেই অফুট, তুর্বল এবং অচেতন। বস্তুবাদের আদিম রূপটির—তথা, ওই প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণার—আলোচনা পরে তোলা যাবে। আপাতত আমাদের মন্তব্য হলো, সাংখ্যের আদিরূপটিকেও যদি একই বেদবাহ ঐতিহ্যের অন্তর্গত বলে স্বীকার করতে হয়, তাহলে তার উৎসকেও একইভাবে বোঝবার চেষ্টা করা প্রয়োজন। এই কারণে আমরা শুরুতেই সাংখ্যের সঙ্গে তন্ত্রের এ-সাদৃশ্যের প্রতি মনোযোগ দেবার চেষ্টা করেছি এবং আমরা দেখেছি, সাদৃশ্যের পরিচয় শুধুমাত্র কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ইংগিতের মধ্যেই আবদ্ধ নয়—মূল দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকেও উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট! অবশ্যই সাংখ্য-দর্শনও যে আদিতে প্রাক-অধ্যাত্মবাদী ও লোকায়তিক বা বস্তুবাদী চেতনারই অঙ্গ ছিলো সে-বিষয়ে দীর্ঘতর আলোচনা এখনো বাকি আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে যাঁরা সাংখ্যকে অ-বৈদিক ঐতিহ্যের পরিচায়ক বলে ঘোষণা করলেন তাঁরাও তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তাৎপর্যের দিকে অগ্রসর হতে পারেননি। অতএব, আমাদের পক্ষে তাদের যুক্তির প্রধান দুর্বলতাকে বিশ্লেষণ করেই অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয় হবে।
গার্বে এবং জিমার উভয়েই বলছেন, সাংখ্য-মত আদিতে অ-বৈদিক হলেও কালক্রমে তা বৈদিক ঐতিহ্যের মধ্যে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছিলো।
