সাংখ্যের উৎস-প্রসঙ্গে আধুনিক বিদ্বানের যে-সব মতবাদ রচনা করেছেন তা নিয়ে আলোচনা তোলবার আগে আমাদের পক্ষে বলে নেওয়া প্রয়োজন, এ-বিষয়ে ঐতিহাসিক তথ্য বলতে ঠিক কী পাওয়া যায়, কিংবা ঠিক কোন ধরনের মালমশলার সাহায্যে আধুনিক বিদ্বানেরা তাদের ওই মতবাদগুলিকে নির্মাণ করবার চেষ্টা করে থাকেন।
প্রথমত, মনে রাখা দরকার, সাংখ্যদর্শনের নিজস্ব পুঁথিপত্র বলতে সত্যিই যৎসামান্য এবং সাংখ্যের প্রাচীনত্বের তুলনায় এই পুঁথিগুলি নেহাতই অর্বাচীন। মূল পুঁথি বলতে দুটি। এক : ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্যকারিকা—তাতে মোট ৭২টি শ্লোক পাওয়া যায়। দুই : সাংখ্য-প্রবচন-সূত্র। যদিও এই সাংখ্যপ্রবচন-সূত্রকে কপিলের নিজস্ব রচনা বলেই উল্লেখ করা হয় তবুও আধুনিক বিদ্বানেরা ও নিঃসন্দেহেই প্রমাণ করেছেন যে, এই সূত্রগুলি নেহাতই অর্বাচন—আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত। তুলনায়, ঈশ্বরকৃষ্ণের কারিকা নিশ্চয়ই প্রাচীনতর—আনুমানিক দ্বিতীয় শতাব্দীর রচনা।
ঈশ্বরকৃষ্ণের কারিকার উপর দুটি খুব নামকরা ভাষা আছে। এক, গৌড়পাদের ভাষা—আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীতে রচিত। দুই, বাচস্পতিমিশ্রের সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী—আনুমানিক নবম শতাব্দীতে রচিত।
সাংখ্য-প্রবচন-সূত্রের উপর সবচেয়ে বিখ্যাত ভাষ্য বিজ্ঞানভিক্ষুর সাংখ্য-প্রবচন-ভাষ্য—অনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত। এই সাংখ্য-প্রবচন ভাষা, এমন কি সাংখ্য-প্রবচন-সূত্রও—যে সাংখ্য-দর্শনের মূল তত্ত্বগুলিকে অত্যন্ত প্রকটভাবে বিকৃত করেছে সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই; আমরা একটু পরে তার আলোচনা তুলবো। আপাতত এইটুকু কথাই পর্যাপ্ত হবে যে, সাংখ্য-প্রবচন-সূত্র বা বিজ্ঞানভিক্ষুর ভাষা থেকে সাংখ্যের আদিরূপটিকে সংগ্ৰহ করা সম্ভব নয়।
সাংখ্যের নিজস্ব সাহিত্য বলতে বাকি থাকে ঈশ্বরকৃষ্ণের কারিকা। কিন্তু, এ-কারিকাও যদি দ্বিতীয় শতাব্দীর রচনা হয় তাহলে তার মধ্যেও সাংখ্যের আদি-অকৃত্রিম রূপটির পরিচয় পাবার সম্ভাবনাও খুব বেশি নয়; কেননা, এ-বিষয়ে কোনো রকম সন্দেহের অবকাশই থাকতে পারে না যে, সাংখ্য-দর্শন অন্তত সনতারিখের দিক থেকে অনেক অনেক পুরোনো। এ-কথার পক্ষে নানান রকম প্রমাণ রয়েছে। যেমন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলছেন, “কৌটিল্য তিনটি মাত্র দর্শনের উল্লেখ করেন—সাংখ্য, যোগ ও লোকায়ত; কৌটিল্য ২৩০০ বৎসর পূর্বের লোক”। এবং “বৌদ্ধধর্ম সাংখ্যমত হইতে উৎপন্ন হইয়াছে, এ-কথা অশ্বঘোষ একপ্রকার বলিয়াই গিয়াছেন। বুদ্ধদেবের গুরু আডার কলম উদ্রক দু’জনেই সাংখ্যমতাবলম্বী ছিলেন”। অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে(৭১৮) এমনকি অথৰ্ববেদ-এর মধ্যেও সাংখ্যের উল্লেখ খুঁজে পাচ্ছেন। তাছাড়া, উপনিষদাদি প্রাচীন সাহিত্যে সাংখ্য বা অন্তত সাংখ্যের মূল পরিভাষার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে—এই জাতীয় উল্লেখ থেকেই কয়েকজন আধুনিক বিদ্বান অনুমান করছেন যে, সাংখ্যের আদিরূপটিকে ওই উপনিষদাদি গ্রন্থ থেকেই অনুমান বা পুনর্গঠন করতে হবে। অতএব, সাংখ্যের নিজস্ব সাহিত্যের বাইরে সাংখ্যের বা সাংখ্য-দর্শনের মূল তত্ত্বগুলির পরিচয় প্রধানত কোথায় কোথায় পাওয়া যায় তা এখানে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় হবে।
উপনিষদে সাংখ্যের উল্লেখ হিসেবে আধুনিক বিদ্বানের প্রধানত নিম্নোক্ত নজিরগুলির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান :
কঠোপনিষৎ : ১,৩-১০ও১১॥২,৩-৭ও৮
শ্বেতাশ্বতরোপনিষং : ১,-৮ও১০॥৩-১২॥৪,-৫ও১০॥৫-২,৭ও৮॥৬,-১০,১৩ও১৬॥
প্রশ্নোপনিষৎ : ৪,৮॥
মৈত্রায়ণী উপনিষৎ : ২,৫॥৩,২-৫॥৪,৩॥৫,৩॥৬:৫,১০,১৯,২৮,৩০,৩৪,॥৭,১॥
এ-ছাড়া অবশ্যই মহাভারতের মধ্যে, বিশেষত শ্ৰীমদ্ভগবদগীতায়, সাংখ্যের সুদীর্ঘ উল্লেখ রয়েছে। এবং অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত বলছেন, চরকসংহিতায় সাংখ্যের যে-প্রাচীনতর রূপটির পরিচয় পাওয়া যায়, আধুনিক বিদ্বানেরা, দুঃখের বিষয়, তার প্রতি উপযুক্ত মনোযোগ দেন না। আমাদের মন্তব্য হলো, চরকসংহিতার সাক্ষ্য অবশ্যই মূল্যবান; কিন্তু এই প্রসঙ্গেই অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত—তথা আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে প্রায় সকলেই—অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি মূল্যবান সাক্ষ্যের প্রতি কিছুটা যেন উদাসীন। সেটি হলো, বেদান্তসূত্র। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের কাল-নির্ণয় অনুসারেও এই ব্রহ্মসূত্র খৃস্টপূর্ব ২০০-র পরে রচিত নয়; অপরপক্ষে চরকসংহিতা ৭৮ খৃস্টাব্দে রচিত। কিন্তু শুধুমাত্র এই সনতারিখের প্রাচীনত্বই নয়, আমরা একটু পরেই দেখাবার চেষ্টা করবো যে, এই ব্রহ্মসূত্রের সাক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করেছেন বলেই আধুনিক বিদ্বানের একটি মূল ভ্রান্তির বশবর্তী হয়েছেন। সে-ভ্রান্তি হলো, উপনিষদে সাংখ্যের বা সাংখ্য-দর্শনের তত্ত্বগুলির নাম-উল্লেখ থেকেই তারা কল্পনা করেছেন যে, সেখানেই সাংখ্য-দর্শনের প্রাচীনতর রূপটির পরিচয় পাওয়া যেতে পারে। অথচ ব্রহ্মসূত্রের সাক্ষ্যকে অগ্রাহ্য না করলে তারা স্পষ্টষ্ট দেখতে পেতেন যে, বাদরায়ণের মতে উপনিষৎ বা বেদান্তের প্রধানতম প্রতিপক্ষ বলতে এই সাংখ্যদর্শনই অতএব উপনিষদে সাংখ্যের উল্লেখগুলি সাংখ্য-দর্শনের ব্যাখ্যা বা বর্ণনা নয়—তার বদলে আদি-সাংখ্যের খণ্ডন-প্রচেষ্টাই। অতএব, ব্রহ্মসূত্র থেকে সাংখ্যের প্রতি বেদান্ত বা উপনিষদের ভঙ্গিটিকে ভালো করে বুঝে নিয়ে তারপর উপনিষদের ওই অংশগুলির ব্যাখ্যা খোঁজা প্রয়োজন। আমরা পরে প্রধানত সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করে অগ্রসর হবার চেষ্টা করবো।
