মোটের উপর এই হলো সাংখ্য-দর্শনের আদিরূপকে পুনর্গঠন করবার মালমশলা। এগুলির কথা মনে রেখে এবার আধুনিক বিদ্বানদের সিদ্ধান্তগুলি পর্যালোচনা করা যাক।
অধ্যাপক ওল্ডেনবার্গ(৭২০) বলছেন, উপনিষদের মধ্যে—বিশেষত কঠ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের কোনো কোনো উক্তির মধ্যেই—সাংখ্য-দর্শনের বীজ আবিষ্কার করা যায়। অতএর তার মতে, এ-বিষয়ে দুটি প্রচলিত সিদ্ধান্ত বর্জন করা প্রয়োজন। প্রথম সিদ্ধান্ত হলো, কপিল নামের জনৈক আদি-বিদ্বানই সাংখ্য-দর্শন প্রবর্তন করেছিলেন। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হলো, রিচার্ড গার্বে প্রমুখ কোনো কোনো আধুনিক গবেষক যেমন বলছেন, বেদ-বহির্গত মানুষদের চিন্তা-চেতনার মধ্যেই এ-দর্শনের উদ্ভব হয়েছিলো। উপনিষদের মধ্যেই সাংখ্য-দর্শনের বীজ আবিষ্কার করতে হলে এই উভয় সিদ্ধান্তকেই কেন পরিহার করা প্রয়োজন তার আলোচনা দীর্ঘ করবার দরকার পড়ে না। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, অন্যান্য প্রাচীন রচনায় সাংখ্যের যে-পরিচয় পাওয়া যায় তার সঙ্গে কঠ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে পাওয়া সাংখ্য-দর্শনের সংস্করণটির মিল আছে কিনা? যদি না-থাকে তাহলে সেই অমিলের ব্যাখ্যা কী? অধ্যাপক ওল্ডেনবার্গ বলেন, শ্রীমদ্ভগবদগীতায় এবং ঈশ্বরকৃষ্ণের কারিকায় সাংখ্যের যে-রূপকে আমরা দেখতে পাই তার সঙ্গে কঠ ও শ্বেতাশ্বতর-তে পাওয়া রূপটির বৈষম্য আছে। এই বৈষম্যের ব্যাখ্যা হলো, কঠ ও শ্বেতাশ্বতর-র সংস্করণটিই সাংখ্যের আদি-সংস্করণ; উত্তরকালে দুটি স্বতন্ত্র পথে বিকশিত হতে হতে গীতায় ও কারিকায় সাংখ্য দুটি স্বতন্ত্র মূর্তি, ধারণ করেছে।
জে, ডাহলম্যান-এর(৭২১) মতে সাংখ্যের আদিরূপটিকে ঔপনিষদিক ঐতিহ্যের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়; কিন্তু সাংখ্যের এই ঔপনিষদিক সংস্করণটির সঙ্গে গীতায় পাওয়া সংস্করণটির অমিল নেই। অতএব উত্তরকালে সাংখ্যের বিকাশকে দুমুখে মনে করবার কোনো কারণ নেই। উপনিষদ আর গীতায় সাংখ্যের যে-পরিচয় পাওয়া যায় তাই উত্তরকালে পরিবর্তিত হয়ে কারিকার সাংখ্যে পরিণত হয়েছে।
ডাহলম্যানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নানাবিষয়ে মতান্তর থাকলেও অধ্যাপক বেলভেলকার ও রানাডে(৭২২) উপরোক্ত বিষয়ে মোটের উপর তাঁর সঙ্গে একমত। অর্থাৎ, উপনিষদ ও গীতায় সাংখ্যের যে-পরিচয় পাওয়া যায় তার মধ্যে মূলতঃ কোনো পার্থক্য নেই এবং এই পরিচয়ই হলো সাংখ্যের আদি-অকৃত্রিম পরিচয়। অবশ্যই, এ-পরিচয়ের প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে কঠ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের মধ্যে। অতএব, অধ্যাপক বেলভেলকার ও রানাডে সিদ্ধান্ত করছেন, “ওল্ডেনবার্গ যখন কঠ ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের মধ্যে সাংখ্যের উৎস অনুসন্ধান করেন তখন আমরা মোটের উপর তার সঙ্গে একমত হই।”
ডক্টর ই. এইচ. জনস্টন(৭২৩) “প্রাচীন সাংখ্য” নামের বইতে সাংখ্যের উৎপত্তি সংক্রান্ত সমস্যার নতুন করে আলোচনা তুলেছেন। যদিও তিনি অধ্যাপক ওল্ডেনবার্গ-এর মতো শুধু কঠ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের মধ্যেই সাংখ্যের সূত্রপাত আবিষ্কার করতে রাজি নন, তবুও তিনি মোটের উপর ঔপনিষদিক সাহিত্যের মধ্যেই এ-সূত্রপাত দেখতে চান: কেবল শ্বেতাশ্বতর ও কঠ উপনিষদের বদলে তিনি বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য এবং প্রশ্ন উপনিষদের সাক্ষ্যগুলির উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে চান।
আধুনিক বিদ্বান-মহলে উপনিষদ-সাহিত্যের মধ্যেই সাংখ্যের উৎস আবিষ্কার করবার আর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো এ-বিষয়ে শ্রীযুক্ত জ্যাকবির(৭২৪) রচনাবলী। অন্যান্য কয়েকজন আধুনিক বিদ্বানের মতো জ্যাকবিও মনে করেন যে, সাংখ্য-দর্শনের উৎপত্তি বৌদ্ধধর্মের চেয়েও প্রাচীন এবং গীতায়— বা মহাভারতে—সাংখ্য-দর্শনের যে-পরিচয় পাওয়া যায় তার মধ্যে আদি অকৃত্রিম সাংখ্য-দর্শনের সঙ্গে বেদান্ত-দর্শনের সংমিশ্রণ চোখে পড়ে। তাহলে, প্রশ্ন ওঠে, সেই আদি-সাংখ্যের রূপ কী? জ্যাকবি এখানে তিনটি পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করেছেন। এক : এপিক সাংখ্য—অর্থাৎ কিনা, মহাভারতে সাংখ্য-দর্শনের যে-সংস্করণটির পরিচয় পাওয়া যায়। দুই : ক্লাসিক্যাল সাংখ্য— অর্থাৎ কিনা, ঈশ্বরকৃষ্ণের কারিকায় সাংখ্য-দর্শনের যে-সংস্করণটির পরিচয় পাওয়া যায়। তিন : প্রাক্-ক্লাসিক্যাল সাংখ্য—অর্থাৎ কিনা, সাংখ্যের সেই আদি-রূপ, যার সঙ্গে বৈদান্তিক চিন্তাধারার সংমিশ্রণ হবার ফলেই শেষ পর্যন্ত ওই “এপিক সাংখ্য” বা সাংখ্যের শ্ৰীমদ্ভগবদগীতা সংস্করণটির উদ্ভব হয়েছিলো। জ্যাকবির কাল-নির্ণয় অনুসারে, এই প্রাক্-ক্লাসিক্যাল বা আদি-সাংখ্যের যুগ হলো খৃস্টপূর্ব ৮০০; তারপর, খৃস্টপূর্ব ৫০০ বরাবর তা ক্লাসিক্যাল-সাংখ্যের রূপ পরিগ্রহ করেছে। ওই প্রাক্-ক্লাসিক্যাল-সাংখ্য সম্বন্ধে জ্যাকবির কয়েকটি মন্তব্য অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। যেমন তিনি বলছেন, এই আদি-সাংখ্যের বক্তব্যটা উত্তরকালের মতো মোটেই অধিবিদ্যামূলক ছিলো না—জ্ঞানের বদলে কর্মের উপরই প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হতো এবং মার্জিত দার্শনিক-মহলের পরিবর্তে এই সাংখ্যের উপদেশ জনসাধারণের উদ্দেশ্যেই যে প্রচারিত হতো তা অনুমান করবারও যথেষ্ট কারণ আছে। জ্যাকবির এ-জাতীয় মন্তব্যের তাৎপর্য কেন গুরুত্বপূর্ণ সে-কথা পরে বোঝা যাবে। আপাতত প্রশ্ন হলো, তিনি যাকে ওই প্রাক্-ক্লাসিক্যাল বা আদি-সাংখ্য বলে উল্লেখ করতে চান তার পরিচয় কোথায় পাওয়া যাবে? উত্তরে জ্যাকবি বলছেন, উপনিষদ-সাহিত্যের মধ্যেই—তবে তা শ্বেতাশ্বতর বা কঠ উপনিষৎ নয়, তার বদলে ছান্দোগ্য-উপনিষদের ষষ্ঠাধ্যায়ের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ খণ্ডের মধ্যে, যেখানে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, সৎস্বরূপ থেকে তেজ, অপ, ও অন্নের স্মৃষ্টি হরেছিলো, এই আদি দেবত্রয়ের মিশ্রণেই জগদ্যুৎপত্তি হয়েছিলো অতএব অগ্নি সূর্যাদি সমুদয় বস্তুতে আদি দেবত্রয়ের অবস্থিতি আছে।
