এই মনোভাব নিয়ে এবং দেহভাণ্ডের অনুরূপ হিসেবেই যদি ব্রহ্মাওকে বোঝবার চেষ্টা করা যায়, তাহলে? তাহলে একদিকে যে-রকম বলতে হয় সৃষ্টির জন্য প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের একটা মিলন প্রয়োজন আবার অপরদিকে তা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, প্রকৃতিই প্রধান, প্রকৃতিই সৃষ্টির আদিকারণ এবং পুরুষ শুধুই অপ্রধান নয়, উদাসীন, নির্লিপ্ত ও নিশ্চেষ্ট।
প্রশ্ন উঠতে পারে, দার্শনিক চিন্তাকে সমাজবাস্তবের এতোখানি হুবহু প্রতিবিম্ব মনে করবার চেষ্টাটা যান্ত্রিক, অতএব অবৈজ্ঞানিক, মনোভাবের পরিচায়ক কিনা? উত্তরে বলবো, দার্শনিক চিন্তার কাঠামোটা যে কতো গভীরভাবে সমাজবাস্তব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে তার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্বয়ং মার্ক্স্-এর(৭১৪) রচনাতেই দেখতে পাওয়া যায় :
…what would old Hegel say in the next world if he heard that the general (Allgemeine) in German and Norse means nothing but the common land (Gemeinland), and the particular, Sundre, Besondere, nothing but the separate property divided off from the common land 2 Here are the logical categories coming damn well out of “our intercourse” after all.
মাক্স-এর এ-উক্তি আমাদের বৈশেষিক দর্শনের সামান্য ও বিশেষ সংক্রান্ত সমস্যার উপর আলোকপাত করে কিনা, গবেষকেরা অবশ্যই তার আলোচনা তুলবেন। বর্তমানে আমাদের যুক্তি শুধু এইটুকু যে, হেগেল-দর্শনের সামান্য ও বিশেষ-এর মতো জটিল দার্শনিক ‘পদার্থে’র মধ্যে যদি এইভাবে সমাজবাস্তব প্রতিফলিত হয়ে থাকে তাহলে সাংখ্য-দর্শনের প্রকৃতির প্রাধান্য ও পুরুষের ঔদাসীন্যের মধ্যে মাতৃপ্রধান সমাজের প্রতিবিম্ব অন্বেষণ করা অন্তত আপাত-অযৌক্তিক মনোভাবের পরিচায়ক হবে না।
পুরুষের ভূমিকা সংক্রান্ত সাংখ্যের এই অন্তর্বিরোধ থেকে তান্ত্রিক ধ্যানধারণাও নিশ্চয়ই মুক্ত নয়। কেননা, প্রকৃতি আর পুরুষের তত্ত্ব নিয়েই তন্ত্র, এবং তন্ত্রেও প্রকৃতির প্রাধান্য এমনই প্রকট এবং তার পাশে পুরুষের ভূমিকা এতোই গৌণ যে, আপাত-দৃষ্টিতে এমন কি এ-কথাও মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে, নেহাতই কৃত্রিম ও অসংলগ্নভাবে তন্ত্রে ওই পুরুষের কথা প্রবেশলাভ করেছে। তন্ত্রের আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা এই অন্তর্দ্বন্দ্বের দিকটির কথা উত্থাপন করিনি। তার কারণ আমাদের মনে হয়েছিলো, সাংখ্য-প্রসঙ্গেই এই দিকটির আলোচনা তোলা যুক্তিযুক্ত হবে। মূল তত্ত্বের দিক থেকে সাংখ্যের সঙ্গে তন্ত্রের সাদৃশ্য সত্যিই বিস্ময়কর!
বস্তুত, এই কারণেই আমরা বঙ্কিমচন্দ্রের উদ্ধত মন্তব্যটি থেকে শুরু করতে চেয়েছি। কেননা, তন্ত্রের সঙ্গে সাংখ্যের মৌলিক সাদৃশ্য সতিই বিস্ময়কর হলেও আরো বিস্ময়কর ঘটনা হলো আধুনিক বিদ্বানের সাংখ্যের উৎপত্তি সংক্রান্ত বহু আলোচনা করলেও এ-বিষয়ে তন্ত্রের সাক্ষ্যকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অবজ্ঞা করে থাকেন। ফলে সাংখ্যের উৎস সংক্রান্ত নানারকম মতবাদ উদ্ভাবন করে তারা যেন তারই গোলকধাধায় পথ হারিয়ে যান, সমস্যাটি মোটের উপর রহস্যময়ই হয়ে থাকে। অপরপক্ষে, তন্ত্রের সঙ্গে সাংখ্যের গভীর সাদৃশ্যের কথা মনে রাখলে এবং তন্ত্রের উৎস-প্রসঙ্গে আমাদের যুক্তি স্বীকৃত হলে সাংখ্যের মতো ওই আপাত-বিস্ময়কর দার্শনিক চিন্তার উৎস আমাদের কাছে আর রহস্যময় হয়ে থাকে না।
আধুনিক গবেষকেরা সাংখ্যের উৎস-প্রসঙ্গে যে মতবাদ রচনা করেছেন আমরা একটু পরেই তার আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করবো। তার আগে সাংখ্যের সঙ্গে তন্ত্রের সম্পর্কটাকে আরো একটু খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা দরকার।
প্রথমত, বঙ্কিমচন্দ্র যদিও সাংখ্যের সঙ্গে তন্ত্রের সম্পর্কটি দেখতে পেয়েছেন তবুও তার মতে এ-সম্পর্কের ব্যাখ্যা হলো, তন্ত্রের মূল তত্ত্বগুলি সাংখ্য-দর্শনের কাছ থেকেই পাওয়া : “সাংখ্যের প্রকৃতি পুরুষ লইয়া তন্ত্রের সৃষ্টি”। বস্তুত শুধু বঙ্কিমচন্দ্রই নন, ইউরোপীয় বিদ্বানেরাও শাক্ত ধ্যানধারণার ব্যাখ্যায় এ-জাতীয় একটা সহজ সমাধানকে গ্রহণ করাই নিরাপদ বোধ করেছেন। যেমন শাক্ত ধ্যানধারণা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে :
It has been supplied with a philosophical justification, being a popularised version of the Samkhya principle of the union of the soul of the universe (purusa) with the primordial essense (prakriti).(৭১৫)
অর্থাং, সংক্ষেপে, এই শাক্ত মতবাদ সাংখ্য-দর্শনের পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনের এক জনপ্রিয় সংস্করণ হিসেবে দার্শনিক ব্যাখ্যার মর্যাদাও লাভ করেছে।
আমাদের মন্তব্য হলো, আদি-আকৃত্রিম সাংখ্যের পুরুষকে soul ofthe universe আখ্যা দেওয়ার মতোই শাক্ত মতবাদকে সাংখ্যের জনপ্রিয় সংস্করণ বলে কল্পনা করাটাও ঐতিহাসিক বোধের পরিচায়ক নয়। আদিতে সাংখ্যের পুরুষ যে আত্মা বা soul বোঝায়নি, এ-বিষয়ে কিছু তথ্য আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি; যদিও কীভাবে এই পুরুষই ঔপনিষদিক চিন্তার প্রভাবে ক্রমশ আত্মা—এমনকি, উপনিষদের নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত আত্মাই—বোঝাতে শুরু করেছে সে-আলোচনা এখনো আমাদের পক্ষে বাকি আছে। কিন্তু তন্ত্রের ওই প্রকৃতি আর পুরুষের তত্ত্বের জন্য যে কোনো দার্শনিক সম্প্রদায়ের কাছেই ঋণী হবার প্রয়োজন নেই—অতএব সাংখ্যের কাছেও নয়-সে-কথা আমরা বিস্তারিতভাবেই আলোচনা করেছি। কেননা, আমরা দেখেছি যে, কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস থেকেই তন্ত্রের শুধু মৌলিক তত্ত্বগুলিই নয়—এমনকি, আচারঅনুষ্ঠানের দিকগুলিও—অনিবাৰ্যভাবেই জন্মলাভ করেছে। এখানে আমরা তাছাড়াও আর একটি যুক্তির অবতারণা করতে চাই। যদিই বা ধরে নেওয়া যায় যে, তন্ত্রের ওই পুরুষ-প্রকৃতির তত্ত্ব সাংখ্যের কাছ থেকে গৃহীত হয়েছে, তাহলেও এইপ্রসঙ্গে আরো একটি মৌলিক সমস্যা বাকি থাকে : সাংখ্যের ওই পুরুষ-প্রকৃতির তত্ত্বই বা এলো কোথা থেকে? কপিল নামের জনৈক আদিবিদ্বানের মস্তিষ্ক থেকে? কিন্তু কপিল যে সত্যিই কে ছিলেন তা আমাদের জানা নেই। এমন কি, কপিল বলতে আদ্যিকালের কোনো এক নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বোঝাতো কি না তাও সন্দেহের কথা। অপরপক্ষে, ওই প্রকৃতি আর পুরুষের নারীবাচকত্ব আর পুরুষবাচকত্বের প্রতি উপযুক্ত গুরুত্ব দিলে এ-কথাই সন্দেহ করবার সুযোগ থাকে যে, সাংখ্যের মতো ওই আপাত-বিস্ময়কর দার্শনিক চিন্তাধারা একজন ব্যক্তিবিশেষের মস্তিষ্ক-প্রসূত না হওয়াই স্বাভাবিক —কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়ে এ-জাতীয় কল্পনার অন্তত মূল কাঠামোটুকু সার্বভৌম এবং অনিবার্যও। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, প্রাচীন চীন এবং প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়াতেও বিশ্বসৃষ্টিকে নর-নারীর মিলন-প্রসূত হিসেবেই বোঝবার চেষ্টা করা হয়েছিলো এবং অধ্যাপক জর্জ টম্সন দেখিয়েছেন সে-চিন্তার বীজ আদিম সমাজের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। দুঃখের বিষয় আদিম সমাজের চিন্তাচেতনার দিক থেকে সাংখ্যের উৎসকে বোঝবার চেষ্টা আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে দেখা যায় না। ফলে সাংখ্যের উৎপত্তি-প্রসঙ্গে তারা যে-মতবাদগুলি প্রণয়ন করেছেন সেগুলি ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা এবার সংক্ষেপে সেই মতবাদগুলি বিচার করবো।
