এই জাতীয় আত্মবিরোধের ব্যাখ্যা কী? আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, মাতৃপ্রধান সমাজ-বাস্তবের মধ্যেই এমন এক স্ববিরোধ লুকিয়ে রয়েছে যা ওই মাতৃপ্রধান সমাজের প্রতিবিম্ব নারীপ্রধান দর্শনের মধ্যে এইভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অতএব আমরা, আমাদের পদ্ধতি অনুসারে, সাংখ্য-দর্শনের এই বৈশিষ্ট্যটিকে বোঝবার আশায় মাতৃপ্রধান সমাজ-বাস্তবের আলোচনায় ফিরে যাবো।
আসাম-অঞ্চলে খাসিদের মধ্যে আজো মাতৃপ্রধান সমাজব্যবস্থা অনেকাংশেই অক্ষুন্ন রয়েছে।
Their social organization presents one of the most perfect examples still surviving of matriarchal institutions, carried out with a logic and thoroughness which, to those accustomed to regard the status and authority of the father as the foundation of society, are exceedingly remarkable. Not only is the mother the head and source and only bond of union of the family; in the most primitive parts of the hills, the Synteng country, she is the only owner of real property, and through her alone is inheritance transmitted. The father has no kinship with his children, who belong to their mother’s clan.(৭১২) এবং, অতএব—
The Khasis have a saying, ‘From the Woman sprang the clan.’ This does not leave much scope for the man. As a husband he is a stranger to his wife’s people, who refer to him curtly as a ‘begetter.’(৭১৩)
অর্থাৎ, খাসিদের সমাজসংগঠন হলো, আজো মাতৃপ্রধান ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ থাকবার একটি প্রায় নিখুঁত দৃষ্টান্ত; এ-ব্যবস্থা এতো যুক্তিযুক্তভাবে ও ভালো করে পালন করা হয় যে, যারা পিতার প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তিকেই সমাজের ভিত্তি বলে চিন্তা করতে অভ্যস্ত তাদের কাছে বিস্ময়কর বোধ হবে। শুধুই যে পারিবারিক ক্ষেত্রে মাতাই প্রধান ও একমাত্র বন্ধন তাই নয়, সিণ্টেঙ প্রদেশের মতো সবচেয়ে আদিম পার্বত্য অঞ্চলে সম্পত্তিতে প্রকৃত অধিকার শুধু মায়েরই এবং এই মাতৃত্বসূত্রেই উত্তরাধিকার প্রবর্তিত হয়। পিতার সঙ্গে সন্তানদের জ্ঞাতিসম্বন্ধ নেই; সন্তানেরা মাতৃগোত্রান্তর্গত।
এবং অতএব,
খাসিদের মধ্যে প্রবাদ আছে, ‘নারী থেকেই ক্লানের (গোত্রান্তর্গত সকলের) উদ্ভব’। ফলে, এ-ব্যবস্থায় পুরুষদের ভূমিকা বলতে খুব বেশি কিছু থাকবার কথা নয়। স্বামী হিসেবে স্ত্রীর আত্মীয়দের কাছে সে আগন্তুক অনাত্মীয় মাত্র। স্ত্রীর আত্মীয়রা তাকে তাচ্ছিল্যভরে ‘জন্মদাতা’ বলে উল্লেখ করে।
অতএব, মাতৃপ্রধান সমাজে পুরুষের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে একটা অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। এই সমাজে একদিকে পুরুষ জন্মদাতা বলে স্বীকৃত। এটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা—নারীর সঙ্গে পুরুষের মিলন ঘটলে পরই সন্তানজন্ম সম্ভব হয়। আবার অপরদিকে কিন্তু এই পুরুষের সঙ্গে সন্তানদের কোনো আত্মীয়তা নেই; কেননা, সন্তানেরা মাতৃবংশের অন্তর্গত— তাদের জন্মদাতা পিতা তাদের কাছে স্বতন্ত্র গোত্রান্তর্গত আগন্তুক ব্যক্তিমাত্র। মাতৃপ্রধান সমাজে এটাও সমান প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই।
আমাদের যুক্তি হলো, সাংখ্য-দর্শনে পুরুষের ভূমিকাটিকে কেন্দ্র করে যে-অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে মাতৃপ্রধান সমাজের পুরুষের ভূমিকাসংক্রান্ত ওই অস্তদ্বন্দ্বের প্রতিবিম্ব অনুমান করা যায়।
সাংখ্য একদিকে বলছে, প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের মিলনের দরুনই সৃষ্টি : “যথা স্ত্রী ও পুরুষের সংযোগে সন্তান-উৎপত্তি হয় সেইরূপ প্রধান-পুরুষের সংযোগে সৃষ্টির উৎপত্তি হয়।” আবার অপরদিকে সাংখ্য বলছে, প্রকৃতিই প্রধান—পুরুষ নেহাতই অপ্রধান এবং উদাসীন। এই দ্বিবিধ মনোভাব কী করে একইসঙ্গে থাকতে পারে তা বুঝতে আমাদের পক্ষে অসুবিধে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনেই যদি সৃষ্টি সম্ভব হয় তাহলে তা সত্বেও পুরুষ কেন এতোখানি গৌণ হয়ে যাবে? কিংবা, পুরুষ যদি সত্যিই অমন একান্তভাবে অপ্রধান ও উদাসীন হয় তাহলে সৃষ্টিব্যাপারে তার একান্তই কোনো ভূমিকা কী করে থাকতে পারে? প্রাচীন আচার্যরা তাদের নিজেদের পরিভাষায় সাংখ্যের বিরুদ্ধে এই আপত্তিই তুলেছেন। তারা দেখাচ্ছেন অন্ধ-পঙ্গু বা অয়স্কান্ত-লৌহের দৃষ্টান্ত দিয়েও সাংখ্য এই মূল অস্তদ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি পেতে পারে না। এবং আধুনিক গবেষকদের মধ্যেও অনেকেই বলছেন যে, সাংখ্যদর্শন প্রবর্তক ওই পুরুষের কথাটুকু বাদ দিলেই অনেক সুসঙ্গত মনোভাবের পরিচয় দিতেন। আমাদের যুক্তি হলো, সাংখ্য-ধ্যানধারণার মধ্যে মাতৃপ্রধান সমাজের প্রতিবিম্ব খুঁজে পাওয়া যায় বলেই সে-সমাজে পুরুষের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে যে-অস্তদ্বন্দ্ব তাই সাংখ্য-দর্শনে পুরুষের তত্ত্বকে কেন্দ্র করে ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ, মাতৃপ্রধান সমাজের মনোভাবটির দিক থেকে সাংখ্য-দর্শনের এই উভয় তত্ত্বেরই একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। এ-সমাজের মানুষ একদিকে দেখছে সন্তান-উৎপাদন ব্যাপারে পিতার একটা ভূমিকা রয়েছে, আবার অপরদিকে তারা দেখছে যে, তা সত্ত্বেও পিতার সঙ্গে সন্তানের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই তারা ভাবছে, নারী থেকেই গোত্রের উৎপত্তি,—From the Woman sprang the clan; আবার অপরদিকে, অবজ্ঞাসূচকভাবে হলেও, পিতাকে–পুরুষকে—‘জন্মদাতা’ বলে স্বীকার করতে তারা বাধ্য হচ্ছে : refer to him curtly as a begetter.
