সুখের বিষয়, তন্ত্রের সঙ্গে সাংখ্যের সম্পর্ক প্রসঙ্গে এ-জাতীয় ক্ষীণ ও ভঙ্গুর ইংগিতই আমাদের একমাত্র সম্বল নয়। কেননা, উভয় ধ্যানধারণার মধ্যে তত্ত্বগত মৌলিক সাদৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায়। অবশ্যই, সে-কথা ভারতীয় দর্শনের সাধারণ পাঠ্য-পুস্তকে স্বীকৃত হয় না। অথচ, ওই সাদৃশ্যের দিকটা একটুও অস্পষ্ট নয়। মুখের বিষয়, যে-কথা পাঠ্যপুস্তকের লেখকদের চোখে পড়তে চায়নি, তা অত্যন্ত সহজেই শ্ৰীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের(৭০৬) দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে :
আবার সাংখ্যের প্রকৃতি-পুরুষ লইয়া তন্ত্রের সৃষ্টি। সেই তান্ত্রিক কাণ্ডে দেশ ব্যাপ্ত হইয়াছে। এই তন্ত্রের কৃপায় বিক্রমপুরে বসিয়া নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ ঠাকুর অবিরাম মদিরা উদরস্থ করিয়া, ধর্মাচরণ করিলাম বলিয়া পরম পরিতোষ লাভ করিতেছেন। সেই তন্ত্রের প্রভাবে প্রায় শতযোজন দূরে, ভারতের পশ্চিমাংশে কাণফোঁড়া যোগী উলঙ্গ হইয়া কদৰ্য উৎসব করিতেছে। সেই তন্ত্রের প্রসাদে আমরা দুর্গোৎসব করিয়া এই বাঙালা দেশের ছয় কোটি লোক জীবন সার্থক করিতেছি। যখন গ্রামে গ্রামে, নগরে মাঠে জঙ্গলে শিবালয়, কালীর মন্দির দেখি, আমাদের সাংখ্য মনে পড়ে; যখন দুর্গ কালী জগদ্ধাত্রী পুজার বাদ্য শুনি, আমাদের সাংখ্যদর্শন মনে পড়ে।
আমাদের দেশে তন্ত্রের প্রভাব যে কতো ব্যাপক, কিংবা, আমাদের দেশের আধুনিক পরিবেশে এই তন্ত্র যে কী বিকট বীভৎসতায় পরিণত হয়েছে তা দেখাবার জন্য আমরা বঙ্কিমচন্দ্রের ওই মন্তব্য উদ্ধৃত করিনি। কেননা, এ-সব কথা আমরা ইতিপূর্বেই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। বর্তমানে, বঙ্কিমচন্দ্রের যে-মন্তব্যের প্রতি আমরা বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে চাইছি তা হলো, এই তন্ত্রের সঙ্গে সাংখ্যের সম্পর্কের কথা। তান্ত্রিক ধ্যানধারণা বা আচারঅনুষ্ঠানের পরিচয় দেখলে বঙ্কিমচন্দ্রের সাংখ্য-দর্শন মনে পড়ে; যদিও, সাংখ্যের প্রকৃতি-পুরুষ লইয়া তন্ত্রের সৃষ্টি কিনা এই প্রশ্ন আমাদের পক্ষে পরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে হবে।
মৌলিক তত্ত্বের দিক থেকে তন্ত্র আর সাংখ্যের সাদৃশ্য সত্যিই বিস্ময়কর। সাংখ্যের মতোই, প্রকৃতি আর পুরুষ নিয়েই তন্ত্রের তত্ত্ব, যদিও সম্প্রদায়ভেদে ওই প্রকৃতি আর পুরুষ তন্ত্রে নানান আখ্যা পেয়েছে—শিব ও শক্তি, রতি ও রস, প্রজ্ঞা ও উপায় ইত্যাদি। আবার, এই দু’য়ের মধ্যে তন্ত্র অনুসারে প্রকৃতিই প্রধান—তাই হিন্দু তান্ত্রিকেরা শাক্ত; তাই চর্যা-সঙ্গীতে চণ্ডালী, ডোম্বী, শবরী, যোগিনী, নৈরামণি, সহজসুন্দরী ইত্যাদির প্রাধান্য; তাই বৈষ্ণব-সহজিয়াদের বক্তব্য,
পুরুষের দেহ ত্যাগ করিয়া
প্রকৃতি স্বরূপ হবে।
তবে হে জানিহ রাধার স্বরূপ
হৃদয়ে দেখিতে পাবে॥
প্রকৃতি হইলে প্রকৃতি মিলয়ে
পুরুষ দেহতে নাই।
আছয়ে পরেশ শোধন করিলে
তুরিতে পারিবে ভাই॥(৭০৭)
তন্ত্রের মতোই, সাংখ্য-দর্শনেও প্রকৃতিই প্রধান। পুরুষ নেহাতই অপ্রধান এবং উদাসীন। এই কারণেই, প্রাচীনদের পরিভাষায় সাংখ্য হলো প্রধানকারণ-বাদ। প্রধান-কারণবাদ বলতে প্রাচীনেরা আবার জড়বাদ বা বস্তুবাদ বুঝতেন—আধুনিক পরিভাষায় materialism। স্বভাবতই, আধুনিক বিদ্বানেরা প্রকৃতি বলতে primordial matter বোঝেন। সেটা নিশ্চয়ই ভুল নয়; কিন্তু শুধু ওইটুকু বললে এই প্রকৃতিরই আর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা অস্পষ্ট থেকে যাবে। কেননা, প্রকৃতি বলতে সাংখ্যে শুধুমাত্র primordial matter-ই বোঝায়, female principle-ও বোধায়। এদিক থেকে সাংখ্য-দর্শন শুধুমাত্র জড়বাদ বা বস্তুবাদ নয়, নারীপ্রাধান্যমূলক চিন্তার পরিচায়কও।
প্রকৃতি শব্দটি সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে স্ত্রীলিঙ্গ। ইহার নামান্তর প্রধান বা ‘অব্যক্ত’ স্ত্রীলিঙ্গ নয়। শব্দের লিঙ্গ দ্বারা তাহার বাচ্যবস্তুর লিঙ্গ সংস্কৃত ব্যাকরণে বুঝানো হয় না। এখানেও বাচক শব্দের লিঙ্গ খুব বড় জিনিস নয়; কিন্তু বাচ্যবস্তুটিকে স্ত্রীরূপেই সাংখ্য কল্পনা করিয়াছে। প্রকৃতি পুরুষকে মোহিত করে— যেমন নারী পুরুষকে বশ করে; প্রকৃতির ক্রিয়াও নারীর লাস্য ও হাস্য এবং হাব ও ভাবের অনুরূপ কল্পিত হইয়াছে। প্রকৃতিকে কোথাও লজ্জাশীলা বধু (কারিকা ৬/১), কোথাও নর্তকী (সূত্র ৩।৬৯) রূপে কল্পনা করা হইয়াছে। ইহার ফলে পুরুষ ও প্রকৃতির সম্বন্ধ ও সম্বন্ধ-বিচ্ছেদ উভয়ই নরনারীর সম্বন্ধ ও সম্বন্ধচ্ছেদের মতো ভাবা হইয়াছে। অনাদিকাল হইতে নর ও নারীর যে লীলা জগতে চলিয়া আসিয়াছে—কবি ও দার্শনিক যাহাকে অনেক সময় সনাতন— চিরসত্য—মনে করিয়াছেন, সাংখ্যের পুরুষ-প্রকৃতির লীলার বর্ণনায়ও যেন তাহাই মূর্তি পরিগ্রহ করিয়াছে। সাংখ্য কাব্য নয়, দর্শন। কিন্তু দার্শনিকের ভিতর কি কবিমন থাকিতে পারে না? গ্ৰীক দার্শনিক প্ল্যাতোর কি ছিল না? সাংখ্যের মনে উহা স্পষ্টত উপস্থিত থাকুক বা না-থাকুক, তাহার পরবর্তী চিন্তায় অনেকক্ষেত্রে পুরুষ-প্রকৃতির সম্বন্ধটাকে নরনারীর সনাতন সম্বন্ধের রূপক রূপেই দেখা হইয়াছে। ঐতিহাসিক প্রমাণের সাহায্যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মত এখানে কিছু উপস্থিত করিতে না পারিলেও ইহা বোধহয় বলা যায় যে, অর্ধনারীশ্বর বা হরগৌরীর যে কল্পনা পরবর্তী সাহিত্যে পাওয়া যায়, তাহাতে সাংখ্য দর্শনের ছায়া পড়িয়াছে। আর, বৈষ্ণব ধর্মের একটা দিকে রাধা-কৃষ্ণের যে কল্পনা পাওয়া যায়, তাহাও কি সাংখ্যের নিকট ঋণী হইতে পারে না? ভাবিবার মতো প্রশ্ন বলিয়া মনে হয়, তাই ইহাদের উল্লেখ এখানে করিলাম। ইতিহাস যদি কোনটি আগে কোনটি পরে নিশ্চিতভাবে বলিয়া দিতে পারিত, তাহা হইলে কে ঋণী এবং কে ঋণদাতা, এই প্রশ্নের মীমাংসা সহজেই হইয়া যাইত। কল্পনাগুলির সাদৃশ্য এত বেশি যে, কোনো একটা সাধারণ উৎস হইতে ইহার বিভিন্ন ধারারূপে বহির্গত হইয়াছে, ইহাও অচিন্তনীয় নয়।(৭০৮)
