অধ্যাপক উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের এই মন্তব্যের জন্য আমরা তার কাছে বিশেষ ঋণী, কেননা সাংখ্যের উৎস ও বিকাশ নিয়ে বহু গবেষণা হলেও উল্লিখিত দিকটির প্রতি সাধারণত আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় না। কিন্তু দুঃখের বিষয় অর্ধ-নারীশ্বর ও রাধাকৃষ্ণের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেও অধ্যাপক ভট্টাচার্য এখানে তন্ত্রের কথা তুলছেন না, অথচ তন্ত্রের সঙ্গেই পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্বের দিক থেকে সাংখ্যের সাদৃশ্য সবচেয়ে প্রকট এবং আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠান এবং জাদুবিশ্বাস থেকেই তন্ত্রের উৎস। অতএব, অধ্যাপক ভট্টাচার্য এখানে যে ‘সাধারণ উৎসর’ ইংগিত করছেন, আমাদের যুক্তি অনুসারে তা হলো অনুন্নত পর্যায়ের বাস্তব জীবনসংগ্রামই। আমাদের এই যুক্তিটি ব্যাখ্যা করবার জন্য ধীরে ধীরে অগ্রসর হবো।
প্রথমত মনে রাখা দরকার, সাংখ্য যদিও পুরুষ-প্রকৃতির তত্ত্বের উপদেশ দিয়েছে তবুও এই দুয়ের মধ্যে প্রকৃতিই প্রধান—পুরুষ শুধু অপ্রধান নয়, উদাসীনও। এবং আমরা দেখলাম, এই প্রকৃতি বলতে শুধুই primordial matter বোঝায় না, female principle-ও বোঝায়। কথাটি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা আমাদের যুক্তি অনুসারে এই নারীপ্রধান ধ্যানধারণায় অনিবাৰ্যভাবেই নারীপ্রধান সমাজ-বাস্তবের প্রতিবিম্ব অনুমান করা যায়।
তাহলে, প্রশ্ন ওঠে, সাংখ্য-দর্শনে পুরুষের স্থান ঠিক কী রকম? প্রথমত মনে রাখতে হবে, সাংখ্যের আদিরূপটি ঠিক কোথা থেকে সংগ্রহ করা যাবে, এ-বিষয়ে বিশেষজ্ঞ-মহলে বাদানুবাদ আছে। আমরা পরে সাংখ্যের উৎস সংক্রান্ত বিভিন্ন মতের আলোচনা-প্রসঙ্গে সে-প্রশ্নে প্রত্যাবর্তন করবো। আপাতত এইটুকু বলা দরকার যে, সাংখ্যের আদিরূপের পরিচয় শুধুমাত্র সাংখ্যপ্রবচন-সূত্র বা এমনকি, সাংখ্য-কারিকা থেকেও সংগ্রহ করবার চেষ্টা করলে ভুল হবে। তাই, পুরুষ সম্বন্ধে সাংখ্যের তত্ত্ব এই দুটি গ্রন্থের মধ্যে যেভাবে পাওয়া যায় তার উপর নির্ভর করে সাংখ্য-দর্শনে পুরুষের স্থান বোঝা যাবে না। উত্তরকালে, প্রধানত সাংখ্য-প্রবচন-সূত্রের প্রভাবেই, আমাদের ধারণা হয়েছে যে, সাংখ্যে পুরুষ বলতে আত্মাই বোঝায়। তাই আধুনিক লেখকেরা প্রকৃতি ও পুরুষের ইংরেজী প্রতিশব্দ হিসেবে matter এবং soul এই ছটি কথা ব্যবহার করে থাকেন এবং অতি সহজেই ধরে নেওয়া হয় যে, সাংখ্য-মতে পরম-পুরুষাৰ্থ বা মুক্তি বলতে, বুঝি এই আত্মার ত্রিতাপনাশেরই ইংগিত করা হয়েছে; এ-ধারণাও সাধারণত স্বীকৃত হয়েছে যে, মুক্তি বা ত্রিতাপনাশের পদ্ধতি হিসেবে সাংখ্য ওই ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি থেকে পুরুষ বা আত্মার স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি করবার উপদেশ দিয়েছে। আমরা একটু পরে দেখবো, এ-জাতীয় তত্ত্ব সাংখ্য-দর্শনের উপর বেদান্তর প্রভাবেরই পরিণাম।
আপাতত কথা হলো, সাংখ্য-দর্শনের আদি-রূপ অনুসারে পুরুষ বলতে আত্মা বা soul বোঝায়নি। কালক্রমে অবশ্যই সাংখ্যের পুরুষ আত্মাবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো; কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনাটা সাংখ্যের আদি-রূপ নিয়ে, এবং আদি-পর্বে সাংখ্যের ওই পুরুষ বলতে আত্মা বোঝাতো না—তার বদলে পুরুষমানুষই বোঝাতো। এ-বিষয়ে অধ্যাপক বেলভেলকার ও রানাডে(৭০৯) ইতিপূর্বেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ব্রাহ্মণগ্রন্থের ক্রিয়াকাণ্ড প্রসঙ্গে পুরুষ শব্দটির প্রয়োগ বিশ্লেষণ করে তাঁরা সিদ্ধান্ত করছেন :
This clearly shows that Purusa originally denoted the human being with its peculiar bodily structure and not any inner or spiritual entity in dwelling therein. (In the first and second group of our Upanisadic texts, this is almost the exclusive sense in which the term is used.)
অর্থাৎ, এ-থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, আদিতে পুরুষ বলতে দেহবিশিষ্ট মানবই বুঝিয়েছে—এই দেহাভ্যন্তরের কোনো আধ্যাত্মিক সত্তা নয়। (আমাদের পর্যায়বিভাগ অনুসারে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের উপনিষদগুলিতে পুরুষ শব্দ প্রায় সর্বত্রই একমাত্র এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।)
অবশ্যই, ব্রাহ্মণ-উপনিষদাদির মতো বৈদিক সাহিত্যের মধ্যেই সাংখ্যের আদিরূপটির সন্ধান পাওয়া যায় কিনা—এ-প্রশ্ন স্বতন্ত্র। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, আদিতে সাংখ্য বৈদিক আর্যদের মতো ছিলো না এবং আমরা পরে দেখবো, এ-বিষয়ে অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে এবং হেনরিখ জিমার প্রমুখ পাশ্চাত্যের বিদ্বানেরাও মহামহোপাধ্যায়ের সঙ্গে একমত হবেন। এবং, আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে যারা বৈদিক সাহিত্যের উপরই নির্ভর করে সাংখ্যের উৎস ও বিকাশ সংক্রান্ত ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছেন তাদের সিদ্ধান্ত অনিবাৰ্যভাবেই অসম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তা-সত্ত্বেও, আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো যে, সাংখ্যের আদিরূপটিকে পুনর্গঠন করবার উদ্দেশ্যে ওই বৈদিক সাহিত্যের ইংগিতগুলি—এবং বিশেষত বেদান্তসূত্রের উক্তিগুলিই—আমাদের কাছে অমূল্য; তার কারণ, বৈদিক চিন্তাধারার সামনে প্রধানতম প্রতিপক্ষ বলতে ছিলো সাংখ্য ধ্যানধারণা। সাংখ্য-প্রবচন-সূত্রে, এমন কি সাংখ্য-কারিকায়, সাংখ্যের যে পরিচয় পাওয়া যায় তার মধ্যে বৈদান্তিক চিন্তার সঙ্গে সাংখ্যের আপোষের চেষ্টাটাই প্রধান; অপরপক্ষে, উপনিষদাদি গ্রন্থের যেখানে সাংখ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় সেখানে প্রধানতম চেষ্টা হলো, সাংখ্যের মূল তত্ত্বকে খণ্ডন করবার বা বৈদান্তিক তত্ত্বের চেয়ে ছোটো করে দেখাবার। তাই আদিতে সাংখ্য ভারতীয় চিন্তাধারায় অবৈদিক ঐতিহ্যের পরিচায়ক হলেও ওই উপনিষদাদি গ্রন্থের মধ্যেই পূর্বপক্ষবর্ণন হিসেবে সাংখ্যের যে-পরিচয় পাওয়া যায় তা থেকে সাংখ্যের আদিরূপটিকে অনুমান করবার অবকাশ আছে। এ-প্রশ্নের আলোচনায় আমরা পরে প্রত্যাবর্তন করবো। আপাতত আমাদের যুক্তি শুধু এইটুকুই যে, আদিতে সাংখ্যে পুরুষ অর্থে যে আত্মা বা soul বোঝায়নি—তার বদলে রক্তমাংসের পুরুষমানুষই বুঝিয়েছে,— অধ্যাপক বেলভেলকার ও রানাডের এই সিদ্ধান্ত ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ সাহিত্যের স্বাক্ষরের উপর নির্ভরশীল হলেও স্বীকারযোগ্য।
