তাহলে, শুধুই যে তন্ত্রসাহিত্যে তন্ত্র-রচক হিসেবে কপিলের নাম পাওয়া যাচ্ছে তাই নয়, প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক পরিবেশের দিক থেকেও তন্ত্রের এলাকা এবং সাংখ্যের এলাকা যে একই, এ-কথা অনুমান করবার অবকাশও রয়েছে।
এই প্রসঙ্গেই আরো একটি ইংগিতের কথা তোলা যায়। আধুনিক বিদ্বানের যদিও সকলেই স্বীকার করছেন যে, সাংখ্যমত খুবই প্রাচীন, তবুও এবিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, সাংখ্য-দর্শনের খুব বেশি প্রাচীন পুঁথিপত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রাচীনতম পুঁথি বলতে ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্য-কারিকা, আধুনিক বিদ্বানদের(৬৯৭) অনুমান অনুসারে তার তারিখ আনুমানিক ২০০ খৃস্টাব্দ। এই সাধু-কারিকার লেখক বলছেন, ‘কপিলমুনি এই শাস্ত্র আসুরিকে দেন, আসুরি তা পঞ্চশিখকে দেন এবং পঞ্চশিখ দ্বারা উহ। পরে বহুধা বিস্তারিত হন’(৬৯৮)। এবং এইভাবে শিষ্যপরম্পরায় প্রাপ্ত সাংখ্যমতকেই ঈশ্বরকৃষ্ণ আখ্যায়িকা ও বিচারভাগ বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্তরূপে বিচার করলেন। কিন্তু যে-কথা বিশেষ চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয় তা হলো, ঈশ্বরকৃষ্ণ এখানে ওই সাংখ্যমত বা সাংখ্যশাস্ত্রকে সাংখ্য না বলে ‘যষ্টিতত্ত্ব’ নামে অভিহিত করছেন(৬৯৯)। যষ্টিতত্ত্ব বলে এই চিত্তাকর্ষক শব্দটি আধুনিক বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তারা অনুমান করতে চাইছেন, এ হলো সাংখ্যের কোনো এক বিলুপ্ত আদিগ্রন্থের নাম। কিন্তু সে-অনুমানে বাধা আছে। প্রথমত, ঈশ্বরকৃষ্ণের রচনায় এমন কোনো ইংগিতই নেই যার উপর নির্ভর করে আমরা এ-কথা অনুমান করতে পারি; বরং তার রচনা থেকে অনুমান করা সঙ্গত যে, ষষ্টিতন্ত্র কোনো গ্রন্থবিশেষের নাম না হয়ে সম্প্রদায়বিশেষের ধ্যানধারণার নাম। যদি তাই হয় তাহলে সে-সম্প্রদায়ের পক্ষে ওই তন্ত্র শব্দটি তান্ত্রিক অর্থেই গৃহীত হয়েছিলো কিনা তা ভেবে দেখবার অবকাশ নিশ্চয়ই আছে। এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা যায় যে, ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে(৭০০) সাংখ্য-বাদীরা তন্ত্রান্তরীয়াঃ বলে উল্লিখিত হয়েছেন। এবং গুণরত্ব(৭০১) যে-দুটি সুপ্রাচীন সাংখ্যগ্রন্থের উল্লেখ করছেন তার মধ্যে একটির নাম হলো আত্ৰেয়তন্ত্র। এ-গ্রন্থ অবশ্যই বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তার নামের সঙ্গে তন্ত্রশব্দের যোগাযোগ উপেক্ষণীয় নয়।
কিন্তু ষষ্টিতন্ত্র বলে ওই নামটি নিয়ে আরো প্রশ্ন ওঠে। সাংখ্যের নাম ষষ্ট তন্ত্র কেন? আধুনিক বিদ্বানেরা ২ অনুমান করছেন, সাংখ্যতে ষাটটি তত্ত্বের। পরিচয় পাওয়া যায়, তাই জন্যে। কিন্তু এ-অনুমান সম্পূর্ণ কৃত্রিম। প্রথমত মনে রাখতে হবে, এ-অনুমানের পিছনে যে ভ্রান্ত ধারণা থেকে গিয়েছে, তা হলো সংখ্যা শব্দ থেকেই সাংখ্য নামের উৎপত্তি। এই ভ্রান্ত ধারণার বশেই এককালে পণ্ডিতেরা মনে করেছিলেন যে, সাংখ্য-দর্শন পিথাগোরীয়-দর্শনেরই সমগোত্রীয়। কিন্তু পিথাগোরীয়-দর্শনের সঙ্গে সাংখ্যের কোনো তত্ত্বগত সম্পর্কই নেই; এবং সংখ্যা-নির্ণয় প্রচেষ্টা থেকেই যদি সাংখ্য নাম হয় তাহলে বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের পক্ষেই সাংখ্য নাম অনেক বেশি প্রযোজ্য হওয়া উচিত ছিলো—কেননা, ওই সংখ্যা-নির্ণয় প্রচেষ্টা উক্ত দুটি দর্শনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রকট। মুখের বিষয় এইজাতীয় যুক্তির উপর নির্ভর করে আধুনিক বিদ্বানেরা ও আর সংখ্যা শব্দ থেকে সাংখ্যের উৎপত্তি অনুমান করতে চান না। কিন্তু দুঃখের বিষয় ‘ষষ্টিতন্ত্র’ বলে নামটির ব্যাখ্যায় তারা ওই ভ্রান্তির উপর নির্ভর করেই অগ্রসর হতে চান,—সাংখ্যে ষাটটি তত্ত্বের উল্লেখ আছে বলেই তার নাম ষষ্টিতন্ত্র। কিন্তু, সাংখ্যে ৬০টি তত্ত্বের উপদেশ সত্যিই নেই : প্রকৃতি, মহৎ, অহঙ্কার, ১১টি ইন্দ্রিয়, ৫টি তন্মাত্র, ৫টি মহাভূত এই ২৪ এবং পুরুষ, মোট পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব নিয়েই সাংখ্য দর্শন। ফলে, ৬০টি তত্ত্বের তালিকা দিয়ে ষষ্টিতন্ত্র নামটির ব্যাখ্যা খোঁজ করবার যে-সব প্রচেষ্টা করা হয়েছে সেগুলির। বেলায় প্রতিটি তালিকার কথা অবধারিতভাবেই কৃত্রিম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো একটি তালিকার সঙ্গেই অপর কোনো তালিকার মিল নেই এবং প্রতিটি তালিকাকে পরীক্ষা করলেই দেখা যায় যে, সেগুলির মূল উপাদান হলো তালিকাকারদের উদ্ভাবনী-শক্তি(৭০৪)। অতএব, আমরা সিদ্ধান্ত করতে চাই যে, তত্ত্বসংখ্যা নির্ণয়ের দিক থেকে যে-রকম সাংখ্য নামের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করা যায় না, সেই রকমই ষষ্টিযন্ত্র নামটিও নয়। অপরপক্ষে ষষ্টিতন্ত্র নামের পিছনে আর একরকম তাৎপর্যের আভাস পাওয়া অসম্ভব নয়। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি (পৃ. ৩৫০) আমাদের দেশে সন্তান-দায়িনী দেবীর নাম ষষ্ঠী এবং ষষ্টিক বা ষষ্টিকা বলতে আবার বৃহীধান্যও বোঝায়—সেদিক থেকে ষষ্টিতন্ত্র নামটির পিছনে কৃষিভিত্তিক ধ্যানধারণার—তন্ত্রের—আভাস খুঁজে পাওয়া অসম্ভব না হতেও পারে। এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা দরকার যে, ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্ৰজ্ঞ(৭০৫) বলে সাংখ্যের পরিভাষাগুলি অবধারিতভাবেই কৃষিজীবন থেকেই সংগৃহীত। অতএব, এ-জাতীয় ইংগিত থেকে অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, যে-কৃষিভিত্তিক মাতৃপ্রধান সমাজজীবনকে তান্ত্রিক ধ্যানধারণার মধ্যে আমরা প্রতিফলিত হতে দেখেছি সাংখ্য-দর্শনের পিছনেও তারই স্মৃতির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে, কিংবা, যা প্রায় একই কথা, আদিতে হয়তো তন্ত্র আর সাংখ্য সমগোত্রীয় ছিলো।
