কিন্তু এই আনুষঙ্গিক মন্তব্যের সূত্র ধরে আরো বিক্ষিপ্ত না হয়ে আমাদের মূল যুক্তিতে প্রত্যাবর্তন করা যাক। আমরা দেখাবার চেষ্টা করছি, তন্ত্রের দেহতত্ত্ব আপাতত যতোই অদ্ভুত মনে হোক না কেন, তন্ত্রসাধনার অন্যান্য অঙ্গগুলির মতোই এই তত্ত্বের উপরও কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের আলোচনা আলোকপাত করতে পারে। সে-বিশ্বাসের মূল কথা হলো মানবীয় উৎপাদনের সাহায্যে প্রাকৃতিক উৎপাদনকে আয়ত্তে আনা যায়; যদি তাই হয় তাহলে মানবদেহের মধ্যেই প্রাকৃতিক রহস্যের সংক্ষিপ্তসার খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এবং এই হলো দেহতত্ত্বের মূল কথা : যা আছে দেহভাণ্ডে তাই আছে ব্ৰহ্মাণ্ডে। স্বভাবতই, এই তত্ত্বের দিক থেকে বিশ্বের উৎপত্তিকেও মানবীয় সন্তান উৎপত্তির অনুরূপ হিসেবেই কল্পনা করা হয়েছে : তন্ত্রমতে পুরুষ ও প্রকৃতির আদি-মৈথুন থেকেই বিশ্বের উৎপত্তি।
আমাদের যুক্তি যদি ঠিক হয়,—অর্থাৎ, কৃষিকেন্দ্রিক আদিম জাদুবিশ্বাস থেকেই যদি তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বের উদ্ভব হয়ে থাকে,— তাহলে ওই সৃষ্টিতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বের অনুরূপ চিন্তাধারার পরিচয় অন্যান্য কৃষিভিত্তিক সভ্যতার ক্ষেত্রেও খুঁজে পাওয়া উচিত। এবং তা পাওয়া যায়ও।
প্রাচীন চীনের চিন্তানায়কেরা(৬৮৬) সৃষ্টির সূত্রপাত হিসেবে পুরুষপ্রকৃতির মিলনের মতোই ইঅঙ (yang=পুরুষ) এবং ইন (yin=নারী)-এর যৌন মিলন কল্পনা করেছিলেন। শুধু তাই নয়। সে যুগের চীন-চিন্তাধারাতেও মানবদেহকে ব্ৰহ্মাণ্ডের সংক্ষিপ্তসার বলে কল্পনা করবার পরিচয় পাওয়া যায় : he (মানব) is described as a microcosm—a world in miniature(৬৮৭). ব্ৰহ্মাণ্ডের সংক্ষিপ্তসার বলেই প্রত্যেক মানবদেহই তান্ত্রিক সম্প্রদায়গুলির কাছে ব্ৰহ্মাণ্ডের মতোই প্রকৃতি ও পুরুষ উভয় উপাদান দিয়ে সৃষ্ট। সহজিয়ারা(৬৮৮) যে রকম বলেন :
সকল শরীরে হয় অর্ধাঙ্গ অবলা॥
পুরুষ প্রকৃতি দুই দেহমধ্যে আছে,
কিংবা,
একরূপ দুই হয় ভিন্ন দেহ নয়।
প্রকৃতি পুরুষ নাম বাহিরে দেখায়॥
সে-যুগের চীন চিন্তাধারা অনুসারেও তাই :
In some men the Yang predominates; in others the Yin. As in the case of Nature, so man has his seasons of spring, summer etc., and his days and nights…His great business, therefore, is to frame and fashion his life so as to live in conformity with the Tao, or observed order of the universe(৬৮৯).
ইত্যাদি, ইত্যাদি
এই জাতীয় চিন্তাধারার সঙ্গে তন্ত্রের দেহতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব ও এমন কি সাধন-পদ্ধতির সাদৃশ্যও বিস্ময়কর নয় কি? সৃষ্টিতত্ত্বের দিক থেকে পলিনেসিয়ার মাওরিদের চিন্তাধারার সঙ্গেও তন্ত্রের মিল চোখে পড়ে; তাদের ধারণাতেও বিশ্বসৃষ্টির সূত্রপাত মানবীয় প্রজননের অনুরূপ পদ্ধতিতে— অর্থাৎ পুরুষ ও নারীর মৈথুন থেকেই—হয়েছিলো।
Throughout this cycle of Polynesian cosmogonic myth, one fact, not without parallel in other religions, is clear. O-tepapa, the primal barren earth or rock, represents the female principle, which is fructified and made to give birth to all things living, by the fertilising rain which falls from the superincumbent male Tangaloa, the sky(৬৯০).
মাওরিদের এই বিশ্বাসের সঙ্গে প্রাচীন চীন ও ভারতীয় সৃষ্টিতত্ত্বের সাদৃশ্য দেখে আধুনিক গবেষক বিস্ময় বোধ করছেন।
It is also noteworthy that creation is ascribed to sexual congress in cosmogonies, so diverse as the Hindu, Maori and Taoist(৬৯১).
কিন্তু আদিম পর্যায়ের উৎপাদন-পদ্ধতির দিক থেকে বিষয়টিকে বোঝাবার চেষ্টা করলে, এ-জাতীয় সাদৃশ্যের নিদর্শন দেখে বিস্ময়বোধ করবার কারণ থাকে না। বস্তুত, কৃষিবিদ্যা আবিষ্কারের ভিত্তিতেই যেহেতু মানুষ পুরোনো পৃথিবীর কয়েকটি ক্ষেত্রে সভ্যতা গড়ে তুলতে পেরেছিলো, সেইহেতু ওই প্রাচীন সভ্যতাগুলির পৌরাণিক কাহিনীর তলায় কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসপ্রসূত এ-জাতীয় কল্পনার পরিচয় পাওয়াই স্বাভাবিক। অধ্যাপক জর্জ টমসনের(৬৯৩) গবেষণা অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাই, এদিক থেকে প্রাচীন চীনের ওই সৃষ্টি-উপাখ্যানের সঙ্গে প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সৃষ্টি-উপাখ্যানের কী আশ্চর্য সাদৃশ্য এবং কেন এই সাদৃশ্য! অবশ্যই, এখানে আমাদের পক্ষে প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার ওই সৃষ্টি-উপাখ্যানকে বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করবার অবকাশও নেই, হয়তো প্রয়োজনও নেই। তার বদলে, তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্বকে বোঝবার জন্যে প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সমজাতীয় সৃষ্টি-উপাখ্যান প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টমসনের(৬৯৩) সংক্ষিপ্ত মন্তব্যটুকু উদ্ধৃত করলেই হবে :
It still moves within the forms of primitive thought, the evolution of the world being expressed in terms of sexual reproduction.
অর্থাৎ, (মেসোপটেমিয়ার সৃষ্টিকাহিনীমূলক) এ-কল্পনা তখনো আদিম চিন্তাধারার কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ, কেননা এখানেও বিশ্বের বিকাশ সন্তান-উৎপাদনের উপমান হিসেবেই পরিকল্পিত।
