ব্ৰহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে।
পাতালং ভূধরা লোক আদিত্যাদিনবগ্রহাঃ ॥
নাগাশ্চ সৰ্ব্বদেহিনাং পিগুমধ্যে ব্যবস্থিতাঃ ।
পাদাধস্বতলং বিস্তাত্তদুৰ্দ্ধং বিতল তথা ॥
জানুনো: স্বতলঞ্চৈব তলঞ্চ সন্ধিরন্ধ্রকে।
তলাতলং গুল্ফমধ্যে লিঙ্গমূলে রসাতলম্ ॥
পাতালং কটিসন্ধৌ চ পাদাদৌ লক্ষয়েদুদ্বুধঃ।
ভূর্লোকো নাভিদেশে তু ভূবর্লোকস্তথা হৃদি ॥
স্বর্লোকঃ কণ্ঠদেশে তু মহলোকশ্চ চক্ষুষি।
জনলোকস্তদুর্দ্ধঞ্চ তপোলোকো ললাটকে ॥
সত্যলোকো মহাযোনে ভূবনানি চতুর্দশ।
ত্রিকোণে চ স্থিতো মে্রূ রুদ্রলোকে চ মন্দরঃ ॥
কৈলাসো দক্ষিণে কোণে বামকোণে হিমালয়ঃ।
বিন্ধ্যো বিষ্ণুস্তদূর্দ্ধে চ সপ্তৈতে কুলপৰ্ব্বতা ॥
এইভাবে পুরাণের ব্রহ্মাণ্ড-বৰ্ণনায় যেখানে যাহা ন্যস্ত হইয়াছে তাহাই যে মনুষ্যদেহে বিদ্যমান, তন্ত্র তাই দেখাইতেছেন।…কেবল তাহাই নহে। তন্ত্র ইহাও ইঙ্গিত করিতেছেন যে, পুরাণে হরগৌরীর কৃষ্ণরাধিকার যে-সব লীলা উপাখ্যানের আকারে বর্ণিত আছে, তাহা দেহগত স্ত্রীত্ব এবং পুংস্তের নানা লীলার বাহ্যিক অভিব্যঞ্জনা মাত্র। এই দেহতেই কৈলাস, এই দেহতেই হিমালয়,—এ দেহতেই বৃন্দাবন, এই দেহতেই গোবর্ধন; এই দেহাভ্যন্তরেই হরগৌরী বা কৃষ্ণরাধিকা নানা লীলানাট্য প্রকাশ করিতেছে(৬৮০)॥ ইত্যাদি ইত্যাদি ॥
তান্ত্রিক দেহতত্ত্ব উত্তরকালে কীভাবে পৌরাণিকাদি চিন্তাকে আত্মসাৎ ও এমন কি পরিপাক করে নিয়েছিলো তার আলোচনা দীর্ঘতর করবার প্রয়োজন নেই। তার বদলে, ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই দেহতত্ত্বের বাস্তব অবদানটা কী রকম, সে-বিষয়ে আমাদের পক্ষে সচেতন হবার প্রয়োজন আছে।
তন্ত্রমতে মানবদেহই ব্ৰহ্মাণ্ডের সংক্ষিপ্তসার, সর্বসত্যের আধার। স্বভাবতই তন্ত্রে এই মানবদেহের রহস্য-উদঘাটন করবার যে-উৎসাহ দেখা দিয়েছিলো তা ভারতবর্ষের আর কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা দেবার কথা নয়। ফলে, প্রাচীন ভারতে এ্যানাটমি-ফিসিওলজি বিজ্ঞান বলতে যেটুকু, তাতে তান্ত্রিকদের অবদান বড়ো কম নয়। এখানে তার একটা ছোট্ট উদাহরন দেওয়া যায়। আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল(৬৮১) দেখাচ্ছেন, এ্যারিস্টটল-এর মতো চরক-ও কল্পনা করেছিলেন যে, হৃৎপিণ্ডই চেতনার কেন্দ্র; চৈতন্য যে মস্তিষ্কেরই এক স্নায়বিক ক্রিয়া এ-কথা সর্বপ্রথম তান্ত্রিকেরাই আবিষ্কার করেন। বলাই বাহুল্য, অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কৃত হবার আগে পর্যন্ত আধুনিক ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিকদের পূর্বগামীরাও স্নায়ুতন্ত্র সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাননি এবং এমনকি অতি-আধুনিককালে পাভ্লভ্-আবিষ্কৃত কণ্ডিশ্যণ্ড-রিফ্লেক্স পদ্ধতির প্রয়োগ করে স্নায়ুতন্ত্র সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পাবার যে-অসীম সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, আধুনিক ইউরোপের বৈজ্ঞানিক-জগৎ তার মাত্র অসম্পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে পেরেছ(৬৮২)। অর্থাৎ, সংক্ষেপে, স্নায়ুতন্ত্র সংক্রান্ত বাস্তব বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যতোটা পাওয়া গিয়েছে তা নেহাতই সাম্প্রতিক ও এখনো অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ। কথাগুলি বিশেষ করে মনে রাখা প্রয়োজন এই কারণে যে, দেশপ্রেমের প্রেরণায় আমাদের মধ্যে বিজ্ঞানে ভারতের অবদান সংক্রান্ত একটা সংস্কারগত এবং অতএব অবৈজ্ঞানিক ও ভ্রান্ত উৎসাহ দেখা দিতে পারে। দুঃখের বিষয়, আধুনিক বিদ্বানদের(৬৮৩) মধ্যে অনেকের বেলাতেই এ-জাতীয় অবৈজ্ঞানিক উৎসাহ দেখা দিয়েছে, তন্ত্রের দেহতত্বের মধ্যে তাঁরা আধুনিক অর্থে স্নায়ু-বিজ্ঞানের তত্ত্ব অন্বেষণ করেছেন। বিষয়টি আরো জটিল হয়েছে এই কারণে যে, আমাদের আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকে নিজেরাই আধ্যাত্মিক সাধন-পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। ফলে, তন্ত্রের ষড়চক্র, কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করবার সাধন ইত্যাদি প্রসঙ্গে তার নিগূঢ় আধ্যাত্মিক সত্যের অনুসন্ধান করে তন্ত্রের দেহতত্ত্বকে রহস্যময় করেছেন। তন্ত্রে বিশ্বাস নিয়ে তান্ত্রিক বিশ্বাসকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝবার সম্ভাবনা নেই; তার উপর, উত্তরকালের আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণার মোহ নিয়ে তান্ত্রিক বিশ্বাসের মধ্যে সেগুলিকে আবিষ্কার করবার চেষ্টা করলে পরিস্থিতিটি জটিলতায় আরো অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখা দরকার, তান্ত্রিক বিশ্বাস অত্যন্ত প্রাচীন; তাই প্রাচীন বিশ্বাস সংক্রান্ত আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাহায্যেই এর উপর আলোকপাত হতে পারে।
তাহলে, ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে তান্ত্রিকদের অবদান বলতে ঠিক কী? স্নায়ুতন্ত্র-বিষয়ে তান্ত্রিক সিদ্ধান্তাবলী নয়, তার বদলে মানবদেহকে জানবার ব্যাপারে তান্ত্রিকদের দৃষ্টিভঙ্গি। অতএব, আমরা এখানে তন্ত্রের নাড়ি, শিরা, চক্র, কুলকুণ্ডলিনী, ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা দেবার চেষ্টা করবো না—তন্ত্রে স্নায়ুতন্ত্রকে কীভাবে বোঝবার চেষ্টা করা হয়েছে সে-বিষয়ে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের(৬৮৪) দক্ষ আলোচনা আছে তা পাঠ করলে উৎসাহী পাঠকেরা দেখতে পাবেন, আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে স্নায়ুতন্ত্র-বিষয়ে তান্ত্রিক ধারণাবলী কী রকম প্রাকৃত ও স্থূল। আমাদের মন্তব্য হলো, তা সত্ত্বেও ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে তন্ত্রের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সে-গুরুত্বের প্রকৃত কারণ হলো মানবদেহের প্রতি তান্ত্রিকদের দৃষ্টিভঙ্গি। দেহোত্তর আত্মার কল্পনায় বিভোর হয়ে আমাদের দেশের বেশিরভাগ সম্প্রদায়ই মানবদেহকে অত্যন্ত তুচ্ছ করতে চেয়েছে : বিদেহ-মুক্তিই অনেক সম্প্রদায়ের কাছে পরম পুরুষাৰ্থ। তাছাড়া, শবের সঙ্গে পরিচয় বাদ দিয়ে মানবদেহকে জানবার কোনো উপায় নেই। হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল প্রভৃতি একমাত্র যে-শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গেই শবদেহের পরিচয়, সমাজের সদরমহল এদের প্রতি শুধু ঘৃণা ও বিদ্বেষই প্রকাশ করেছে। অপরপক্ষে, তন্ত্রে শবদেহের স্পর্শকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়নি। শুধু তাই নয়; ওই হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল প্রভৃতি শ্রেণীর মানব-মানবী তন্ত্রসাধকদের কাছে সম্মানের আসন লাভ করেছে। অপরপক্ষে, শবদেহের স্পর্শকে ঘৃণার চোখে দেখতে শেখার দরুন আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চা কীভাবে বাধা পেয়েছে তার একটি অত্যন্ত সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে : “প্রথম যখন কলিকাতায় মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয় তখন শবব্যবচ্ছেদ করার জন্য ছাত্রের অভাব হয়েছিলো ”(৬৮৫)
