“এইখানে আর একটা অবাস্তুর কথা বলিয়া রাখিব। দেহসৃষ্টি এবং বিশ্বসৃষ্টি একই পদ্ধতিক্রমে হইয়াছে, এই সাধারণ সিদ্ধান্তটা বা generalisation বৌদ্ধ তান্ত্রিকগণ কামবজ্রযান নাম দিয়া একটা উপাসক সম্প্রদায় গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। যখন পাঠানগণ এদেশে প্রথম আগমন করেন, তখন বাঙ্গালায় এই সম্প্রদায়ের সাধকদিগের বেজায় প্রাবল্য ছিল। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় এই সম্প্রদায়ের প্রচলিত দুই চারিখানি তন্ত্রগ্রন্থ খুঁজিয়া পাইয়াছেন। সে সকল গ্রন্থ সাধারণ্যে প্রকাশ করিবার যোগ্য নহে, কারণ উহা এতই কুৎসিত ক্রিয়াকাণ্ডের বর্ণনায় পূর্ণ। তাঁহাদের মত এই যে, মনুষ্যদেহ যেমন কামের সাহায্যে সৃষ্ট বা উৎপন্ন, বিশ্বসৃষ্টিও তেমনি কামের সাহায্যে সৃষ্ট বা উৎপন্ন। কামে যেমন রেতঃস্খলন হয় এবং রজঃ ও রেতের সম্মেলনে জীবের সৃষ্টি হয়, তেমনি বিশ্বসৃষ্টি শক্তিসমন্বিত শিবলিঙ্গের রেতঃস্খলন হইতে উৎপন্ন। এই হেতু বিশ্বসৃষ্টিকে তন্ত্রে বিসৃষ্টি বা discharge বলিয়াছে। অর্থাৎ কামান্ধ বিশ্বব্যাপী আত্মা হইতে এই বিশ্বসৃষ্টি একটা স্খলন বা বিসৃষ্টিমাত্র। এই সম্প্রদায়ের তান্ত্রিকগণের মত এই যে, যেমন যুবক-যুবতী সদা রিরংসায় পূর্ণ থাকে, তেমনি বিশ্বব্যাপী শিব ও শক্তি সদাই নিত্যনব সৃষ্টির জন্য রিরংসায় পূর্ণ। তাঁহাদের নিত্যসম্মিলনে ক্ষণেক্ষণে বিসৃষ্টি হইতেছে, ফুটিতেছে, উঠিতেছে, ডুবিতেছে, শুকাইতেছে। বিশ্বসৃষ্টির রিরংসা এবং জীবদেহগত রিরংসার সামরস্য ঘটাইতে পারিলেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করা যাইতে পারে। ইহারা তাই সদাই কামসাধনা করিত। ইহাদের অত্যাচারের প্রভাবে জাতিটা একেবারেই নিবীর্য হইয়া পড়িয়াছিল। সাধনার দোহাই দিয়া ইহার নির্লজ্জভাবে সমাজের সর্বাঙ্গে কামের প্রকট বিকাশ ঘটাইত। মন্দিরে, মঠে, দেবায়তনে, সর্বত্রই রিরংসার ছবি অঙ্কিত করিয়া রাখিত। …আমার মনে হয়, জগন্নাথের শ্রীমন্দির এই কামচক্রযানীদের প্রভাবকালেই নির্মিত হইয়াছিল। বিমলার ক্ষেত্র কামচক্রযানীদের পুণ্যক্ষেত্র ছিল। …বিশ্বসৃষ্টি এবং দেহসৃষ্টির সমরসতা এই শ্রীমন্দিরেই পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। অশ্লীল ছবির মধ্যে পুরুষমাত্রেই কামযানী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, নারীমাত্রেই দেবদাসী অথবা ভিক্ষুনী। মন্দিরটা আগাগোড়া বৌদ্ধ কামযানীদের principles বা মতানুসারে নির্মিত। দেশীয় ভাস্কর্য পদ্ধতির উপর সৃষ্টিতত্ত্বের অর্থবাদ পাষাণের লেখায় ফুটান আছে।”(৬৭৯)
বিমলাক্ষেত্রের ভাস্কর্য-প্রসঙ্গে এ-মন্তব্য নিশ্চয়ই লঘুমূল্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই কামযানকে বৌদ্ধসম্প্রদায়-মাত্র বলে বর্ণনা করে এবং অতএব বিমলাক্ষেত্রের ভাস্কর্যকে বৌদ্ধ-সম্প্রদায়-বিশেষেরই মতানুসারে নির্মিত বলে ব্যাখ্যা করলেই কি প্রকৃত সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়? আমরা বলতে চাই, তা যায় না। কেননা, এ-ভাস্কর্যের মূল সমস্যাট কামসাধনার বিষয়বস্তু নিয়ে, এবং সে-বিষয়বস্তু শুধু বৌদ্ধ ধ্যানধারণারই নিজস্ব তত্ত্ব নয়, তার বদলে এক আদিম বিশ্বাস, যে-বিশ্বাসের সঙ্গে উত্তরকালে বৌদ্ধ ধ্যানধারণার সংমিশ্রণ হয়ে বৌদ্ধ তন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিলো। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই স্বীকার করছেন, ‘অতি পুরাতন একটা শক্তিধর্মের বনিয়াদের উপর বৌদ্ধ মনীষা একটা নতুন ধর্মের প্রাসাদ গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, পরে নব্য-হিন্দুর ব্রাহ্মণ্য-প্রতিভা বৌদ্ধের সেই মনীষা-প্রাসাদের উপর ব্রাহ্মণ্যের লেখা গাঢ় করিয়া লিখিয়া রাখিয়াছেন। বিমলাক্ষেত্রে পাষাণের লেখায় ফুটানো অর্থবাদের মৌলিক তাৎপর্যটিকে খুঁজে পেতে হলে সেই আদিম বিশ্বাস—পাঁচকড়িবাবু যাকে অতি পুরাতন শক্তি-ধর্মের বনিয়াদ বলে বর্ণনা করছেন—থেকেই অগ্রসর হতে হবে। আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি, এই আদিম বিশ্বাস বলতে উর্বরতা-মূলক জাদুবিশ্বাসই। তার উপর নিশ্চয়ই বৌদ্ধ এবং তথাকথিত ব্রাহ্মণ্য ধ্যানধারণা আরোপিত হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্বাসটি ঢাকা পড়েনি বা তার স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে যদিই বা এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, কামচক্রযানী বৌদ্ধরাই বিমলাক্ষেত্রের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলো, তাহলেও এই ভাস্কর্যকে শুধুমাত্র বৌদ্ধ বললে অতিসারল্যের দোষ হবে। কেননা, ওই কামচক্রযান নামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়টিকে নিছক বৌদ্ধ সম্প্রদায় বলা যায় না; তার বদলে এ-হলো বৌদ্ধ কারুকার্যেশোভিত সেই আদিম বিশ্বাসমাত্র। অর্থাৎ কিনা, এ-ক্ষেত্রে আদিম জাদুবিশ্বাসটির উপর বৌদ্ধ পরিভাষা এসে জমলেও, বৌদ্ধ ধ্যানধারণার দ্বারা মূল বিশ্বাসটির পরিবর্তন হওয়ার বদলে আদিম বিশ্বাসটির দ্বারা বৌদ্ধধ্যানধারণাগুলিই জীর্ণ হয়েছে।
কিন্তু তন্ত্রের উপর উত্তরকালে শুধুমাত্র বৌদ্ধ প্রলেপই পড়েনি; তন্ত্রের দেহতত্ত্বের সঙ্গে উত্তরকালের পৌরাণিক হিন্দু ধ্যানধারণার মিশ্রণের ফলও ঠিক একই রকম হতে দেখা যায়—অর্থাৎ কিনা, উক্ত ধ্যানধারণাগুলির নিচে দেহতত্ত্বের কথাটা ঢাকা পড়বার বদলে বরং পৌরাণিক ধ্যানধারণাগুলিই দেহতত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
