সকলের সার হয় আপন শরীর।
নিজ দেহ জানিলে আপনে হবে স্থির ॥(৬৭৩)
কিংবা,
ভজনের মূল এই নর বপু দেহ।
আপন জানিলে তবে সহজ বস্তু জানে ॥(৬৭৪)
কিংবা,
আপন শরীর তত্ত্ব জানে যেই জন।
সেই ত পরম যোগী শাস্ত্রের বচন ॥(৬৭৫)
ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, আধুনিক মনের কাছে এ-জাতীয় বক্তব্য অত্যদ্ভূত ও এমন কি অর্থহীন বলেই প্রতীয়মান হয় এবং সন্ধ্যা-ভাষার দুরূহতাই তার একমাত্র কারণ নয়। তাই প্রশ্ন ওঠে, দেহতত্ত্বকে আমরা কী ভাবে বোঝবার চেষ্টা করবো? আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই দেহতত্ত্বের মধ্যে একটা নিগূঢ় আধ্যাত্মিক সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টিকে আরো রহস্যময় করে তুলেছেন। অপরপক্ষে, এর মধ্যে কোনো গৃঢ় সত্যের সন্ধান না করে যদি সহজ সরল অর্থেই একে গ্রহণ করা যায় তাহলে আমাদের কাছে প্রধান প্রশ্ন হবে, কোনো এককালে—বা মানবোন্নতির কোনো এক পর্যায়ে—এ-জাতীয় আপাত-অদ্ভূত ধ্যানধারণাই মানুষের কাছে চরম সত্য বলে কী করে প্রতীত হয়েছিলো? এবং আমাদের যুক্তি হলো, কৃষি-কর্মের অপেক্ষাকৃত প্রাথমিক পর্যায়ের আচার-অনুষ্ঠানগুলি পরীক্ষা করলে যে-বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায় তারই দিক থেকে এই দেহতত্ত্বের উপর আলোকপাত হওয়া সম্ভব। কেননা এই বিশ্বাস অনুসারে, মানব-রহস্য ও প্রকৃতি-রহস্যের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই।
তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্বকে পরীক্ষা করলে এই কথাটি আরো স্পষ্টভাবে বোঝবার অবকাশ হতে পারে। প্রথমত মনে রাখা প্রয়োজন, তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব ও দেহতত্ত্ব একই সূত্রে বাধা। শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬৭৬) যেমন বলছেন, “দেহতত্ত্ব না বুঝিতে পারিলে তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব বুঝা যায় না। কারণ তন্ত্রের সিদ্ধান্ত এই যে, জীবদেহ—বিশেষত মানবদেহ—যে-পদ্ধতি অনুসারে সৃষ্ট হয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও সেই একই পদ্ধতি অনুসারে উৎপন্ন হইয়া থাকে। বিশ্বসৃষ্টি এবং জীবসৃষ্টির মধ্যে পদ্ধতির কোনরূপ বৈষম্য নাই।” কিংবা(৬৭৭), “সৃষ্টিতত্ত্ব দেহতত্ত্বের সহিত মিলাইয়া লেখা। বিশ্বসৃষ্টি এবং মনুষ্য বা জীবদেহসৃষ্টি যে একই প্রকরণ অনুসারে হইয়া থাকে, ইহা তন্ত্রের সিদ্ধান্ত।”
যদি তাই হয়, তাহলে তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্বটা কী রকম হবার কথা? শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬৭৮)বলছেন,
“যে পদ্ধতিক্রমে নরনারীর সংযোগে নূতন জীবের সৃষ্টি হয়, সেই পদ্ধতিক্রমে পুরুষ-প্রকৃতির সংযোগে বিশ্বসংসারের উদ্ভব হইয়াছে। পুরুষের প্রভাবে নূতন জীবে আমিত্ত্বের বোধ ফুটিয়া উঠে, দেহের মধ্যে যাহা কতকটা স্থিতিবাচক, তাহারই সৃষ্টি হয়, আর নারীর প্রভাবে দেহের নাম ও রূপ, যাহা কিছু পরিবর্তনশীল তাহারই সৃষ্টি হয়। তাই তন্ত্র অনুমান করেন যে, মেদ, মজ্জা, অস্থি, নখ, প্রভৃতি পিতৃবীর্যে সৃষ্টি হয়; মাতৃরজে শোণিত, মাংস, চর্ম, কেশ প্রভৃতি উদ্ভূত হইয়া থাকে। তেমনি বিশ্বসংসারে পুরুষপ্রকৃতির প্রেরণায় সৃষ্টির বিকাশ হয়। সৃষ্টির পূর্বে পুরুষ ও মূলাপ্রকৃতির মধ্যে একটা স্পন্দনের—কম্পনের—ভাব অনুভূত হয়। এই স্পন্দন-জন্যই পুরুষপ্রকৃতির মধ্যে বিয়োগ ও মিলন ঘটে। এই মিলনের ফলে বিন্দুর সৃষ্টি বা পতন; আর সেই বিন্দুর মধ্যে সৃষ্টিপ্রকৃতির লীলা হইতে থাকে, সেই লীলার ফলেই বিশ্বসৃষ্টির বিকাশ। এই বিন্দুতে বিলাস করিয়া মহামায়া সৃষ্টি ঘটাইয়া থাকেন বলিয়া তাহার নাম বিন্দুবিলাসিনী।…মহাকাশে যাহা স্পন্দন, নরনারীর মধ্যে তাহা কাম ও মদনের লীলা।…কাম ও মদনজন্য যেমন নতুন জীবের নাম ও রূপের বিকাশ হয়, তেমনি পুরুষপ্রকৃতির মধ্যে কাম ও মদনের স্পন্দনজন্য বিশ্বব্যাপী নাম এবং রূপের বিকাশ হইয়াছে। ইহাই হইল বিশ্বসৃষ্টি এবং জীবস্মৃষ্টির মধ্যে সমতাবিষয়ক গোটা কয়েক মোট কথা। তন্ত্রবিশেষে বিশ্বসৃষ্টির জন্য শিবশক্তির এবং জীবস্মৃষ্টির জন্য নর-নারীর মিলনের একতা পদে পদে খুলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া দেওয়া আছে।”
আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো, এইভাবে মানবীয় প্রজনন-পদ্ধতির অনুরূপ হিসেবেই বিশ্বসৃষ্টিকে বোঝবার চেষ্টা শুধুমাত্র আমাদের দেশের তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ নয়। পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়ে থাকা মানুষদের আদিম ধ্যানধারণার যে-পরিচয় পাওয়া গিয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে মোটের উপর একই সৃষ্টিতত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়; নানান ক্ষেত্রে প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের মধ্যেও এই আদিম চিন্তাধারার স্মারক টিকে থেকেছে, যদিও আমাদের দেশের তান্ত্রিক সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ওই দেহতত্ত্ব শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে যে-রকম জটিল রূপ ধারণ করেছে সে-রকম দৃষ্টান্ত অন্যত্র সত্যিই দুর্লভ। বিশেষ করে সেই কারণেই, তন্ত্রের দেহতত্ত্ব ও সৃষ্টিতত্ত্বের জটিলতায় পথভ্রান্ত হবার বিপদ থেকে নিজেদের বাঁচাবার উদ্দেশ্যে আমাদের পক্ষে ওই আদিম বিশ্বাসটি সম্বন্ধে সচেতন থাকবার প্রয়োজন আছে। দুঃখের বিষয়, আধুনিক বিদ্বানের ঠিক এর বিপরীত পন্থা অবলম্বন করতে চেয়েছেন। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা থেকেই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখানো যায়। তন্ত্রের দেহতত্ত্ব ও সৃষ্টিতত্ত্বের সমর্থনে সাধনলব্ধ গৃঢ় অনুভূতি প্রভৃতির নজির দেখাবার পর যখন তিনি এই তত্ত্বটিরই অপেক্ষাকৃত আদি-অকৃত্রিম রূপের সম্মুখীন হয়েছেন তখনই তিনি আধুনিক নীতিবোধ ইত্যাদির প্রভাবে পড়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষে অধীর হয়ে উঠেছেন। তন্ত্রের দেহতত্ত্বকে আধুনিক মনের পক্ষে স্বীকারযোগ্য সনাতন সত্য বলে প্রমাণ করবার চেষ্ট না করে তিনি যদি প্রাচীন তন্ত্রকে প্রাচীন চেতনারই পরিচায়ক বলে গ্রহণ করতে সন্মত হতেন তাহলে সে-চেতনার প্রাকৃত রূপটির সম্মুখীন হয়ে তাঁর পক্ষে এ-ভাবে শিহরিত হবার প্রয়োজন হতো না।
