আমাদের মন্তব্য হলো, স্বয়ং পাঁচকড়িবাবু পুরোনো তন্ত্রের পারিভাষিক অর্থ যতোখানি উদ্ধার করেছেন, এবং তারই উপর নির্ভর করে তান্ত্রিক দেহতত্ত্বের যে-বর্ণনা দিয়েছেন, তার মূল্য কম নয় এবং দেহতত্ত্ববিদ্ পণ্ডিত হিসেবে তাকে পাওয়াও আমাদের পক্ষে কম সৌভাগ্যের কথা নয়। কিন্তু সেই সঙ্গেই আমরা বলতে চাই, মহাপুরুষদের সাধনালব্ধ গূঢ় অনুভূতির দোহাই দিয়ে তার পক্ষে পুরোনো তন্ত্রকে আধুনিক রুচি আর বুদ্ধির কাছে সত্যগর্ভ বলে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টাটাই বরং এক উদ্ভট, অসম্ভব এবং আজগুবি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। “কেবল ভাষার সাহায্যে ঠিকমতো দেহতত্ত্ব এবং রসতত্ত্ব বুঝানো যায় না।” আমাদের যুক্তিও নিশ্চয়ই তাই। কেননা, তন্ত্র প্রাচীন। এবং প্রাচীন বলেই তন্ত্রের তত্ত্বকে বুঝতে হলে ভাষাগত অর্থনির্ণয়ের পরও প্রাচীন মানুষদের বিশ্বাস সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্যের সাহায্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাই দেহতত্ত্বের ভাষাগত অর্থ হিসেবে শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের যে-তথ্য দিয়েছেন আমরা তা বোঝবার চেষ্টা করবো প্রাচীন মানুষদের বিশ্বাস-সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্যের আলোয়।
তন্ত্রের সাধন-পদ্ধতি এবং তন্ত্রের দেহতত্ত্ব একই সূত্রে বাঁধা। আমরা ইতিপূর্বে কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠানের দিক থেকেই তান্ত্রিক সাধনার প্রধান অঙ্গগুলি বোঝবার চেষ্টা করেছি। অতএব, আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের দিক থেকেই আমরা তন্ত্রের দেহতত্ত্বকেও বোঝবার আশা করতে পারি। তাই, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুসরণ করে দেহতত্ত্বের বর্ণনা দেখবার আগে ওই কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মূল কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন।
কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মূল কথাটা কী? মানবীয় প্রজননের সাহায্যে বা সংস্পর্শে প্রকৃতির উৎপাদনকে আয়ত্তে আনবার পরিকল্পনা। তাহলে, এই বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করলে প্রকৃতি সংক্রান্ত কোন তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়? স্বভাবতই, সে-তত্ত্ব অনুসারে মানবীয় প্রক্রিয়া আর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সমজাতীয়, উভয়ের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই। কেননা, সন্তান-উৎপাদনের রহস্য আর শস্য-উৎপাদনের রহস্য যদি একই মূল রহস্যের দুটি দিক না হয় তাহলে একটির সাহায্যে অপরটিকে আয়ত্তে আনবার পরিকল্পনা কী করে সম্ভবপর হবে? তাই কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মূলে এই তত্ত্বটি অন্তর্নিহিত থাকতে বাধ্য যে, মানবীয় ব্যাপারকে সম্যকভাবে চিনতে পারলে, বা বুঝতে পারলে, প্রকৃতির রহস্যকেও বুঝতে পারা যাবে, চিনতে পারা যাবে।
কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মধ্যে এ-তত্ত্ব বীজাকারে আছে। এবং ঠিক এই তত্ত্বটিই নানা রকম শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, নানানভাবে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে তন্ত্রের দেহতত্ত্বে পরিণত হয়েছে। তন্ত্রের দেহতত্ত্বের মূল কথা হলো, মানবদেহকে বিশ্লেষণ করেই, মানবদেহ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেই, আমরা বিশ্বপ্রকৃতির রহস্যকেও বুঝতে পারবো, কেননা মানবদেহের রহস্য আর বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য আসলে সমজাতীয়—উভয়ের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই।
দেহতত্ত্বের ব্যাখ্যায় শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬৬৯) বলছেন :
“যাহা আছে দেহভাণ্ডে, তাহাই আছে ব্ৰহ্মাণ্ডে। অর্থাৎ, “ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণা: সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে”। ইহাই সকল তন্ত্রের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত অবলম্বন করিয়াই সকলে তন্ত্রতত্ত্বের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তন্ত্রের এই ব্যাখ্যা পুরাণাদি নানা শাস্ত্র অবলম্বন করিয়াছে।…
তন্ত্রের প্রায় সকল সাধনা ও আরাধনার দুইটা দিক আছে; একটা বাহিরের বা বিশ্বতত্ত্বের দিক, আর একটা ভিতরের বা দেহতত্ত্বের দিক। সকল সিদ্ধিরই বিকাশের দুইটা দিক আছে, একটা জগতের বা বাহ প্রকৃতির দিক, অপরটা ভিতরের বা দেহগত প্রকৃতির দিক। তুমি আত্মশক্তি বিকাশের দ্বারা সিদ্ধিলাভ করিতে পার, অথবা বাহ্যশক্তি আয়ত্ত করিয়া আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটাইতে পার।……তন্ত্র বলিতেছেন যে, যখন ব্রহ্মাণ্ড ও দেহভাণ্ড একই পদ্ধতি অনুসারে, একই রকমের উপাদানের সাহায্যে নির্মিত, উভয়ের মধ্যে একইভাবে নানা শক্তির খেলা হইতেছে, তখন দেহগত শক্তির উন্মেষ ঘটাইতে পারিলে ব্রহ্মাণ্ডের শক্তি তোমার অনুকূল, সহায়ক হইবে।…
এ দেশের সিদ্ধগণ বলেন যে, মনুষ্যদেহের মতন পূর্ণাবয়ব যন্ত্র আর নাই; এমন যন্ত্র আর কেহ গড়িতে পারে না, এমন যন্ত্র নির্মাণ করাও মানুষের পক্ষে সম্ভব নহে। অতএব এই যন্ত্রস্থ সকল গুপ্ত এবং সুপ্ত শক্তির উন্মেষ ঘটাইতে পারিলে অন্য কোন স্বতন্ত্র যন্ত্র ব্যতিরেকে তোমার সকল বাসন পূর্ণ হইতে পারে।… প্রকৃতির সকল গুপ্ত শক্তিসমূহের সহিত দেহের গুপ্ত বা সম্মূঢ় শক্তির কেমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে। কি ভাবে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে বা কি ভাবে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপন করিতে পারা যায়, ইহা যে সাধনার ফলে জানা যায় বা আয়ত্তগত করিতে পারা যায়, তাহাই তন্ত্রসাধনা। এই তন্ত্রসাধনার মূল হইল দেহতত্ব। তাই দেহের কথা লইয়া তন্ত্র আগাগোড়া ব্যস্ত”।
আধুনিক বিদ্বানের এ-বিষয়ে দ্বিমত হবেন না যে তান্ত্রিক সম্প্রদায়গুলিতে বিশ্বব্ৰহ্মাওকে মানবদেহের বৃহত্তর সংস্করণ হিসেবেই চেনবার প্রচেষ্ট দেখা যায়। সহজিয়া সাহিত্য-প্রসঙ্গে অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত(৬৭০) বলছেন, এ-সাহিত্যে মানবদেহের উপরই অত্যধিক গুরুত্ব আরোপণ করা হয়, ধরে নেওয়া হয় যে, মানবদেহের মধ্যেই ব্ৰহ্মাণ্ড বীজাকারে বর্তমান আছে; তান্ত্রিক যোগসাধনা-প্রসঙ্গে সর্বত্রই এই তত্ত্বের গুরুত্ব দেখা যায় এবং সহজিয়াদের বেলায় যেহেতু ওই সাধনাই হলো প্রধান কথা সেইহেতু সহজিয়া সাহিত্যে প্রধানতম তত্ত্ব বলতে এই দেহতত্ত্বই। অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসু(৬৭১) যদিও সহজিয়াদের সাধন-পদ্ধতিকে তান্ত্রিক আখ্যা দিতে সম্মত নন, তবুও তিনি অন্তত এ-কথা মানছেন যে, “শরীরতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিতে সহজিয়ারা তন্ত্রের অনুসরণ করিয়াছেন সত্য”। “শরীরের মধ্যে বিবিধ নাড়ী-চক্রাদির কল্পনা করিয়া তান্ত্রিকগণ শরীরতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন। সহজিয়ারা তান্ত্রিক মত অনুসরণ করিয়া তদনুরূপ নাড়ী এবং চক্রের স্থানে সরোবরাদির কল্পনা করিয়াছেন। এই বিষয়ে তাহারা মূলত তান্ত্রিকগণের নিকট ঋণী, যদিও সরোবরের কল্পনায় তাহারা কিছু নূতনত্বের সন্ধান দিয়াছেন”। আমরা যেহেতু ইতিপূর্বেই দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, একই আদিম বিশ্বাস থেকে শাক্ত তন্ত্র, বৌদ্ধ তন্ত্র, সহজিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিলো সেইহেতু এই জাতীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন মৌলিক তত্ত্বের মিল আছে, তাই আমাদের বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য হওয়া উচিত। ওই জাতীয় একটি মৌলিক বিষয় বলতে যে দেহতত্ত্বষ্ট, এ-কথায় আধুনিক বিদ্বানের দ্বিমত হবেন না। অতএব এই দেহতত্ত্ব শাক্ত বা বৌদ্ধ তন্ত্রেরই হোক, কিংবা সহজিয়া-সাহিত্যেরই হোক,—আমাদের যুক্তির দিক থেকে তা একই আদিম বিশ্বাসের বিবিধ প্রকাশমাত্র। বস্তুত, কুলার্ণব প্রভৃতি তান্ত্রিক পুঁথিতে দেহতত্ত্বের যে-পরিচয় পাওয়া যায় তা উত্তরযুগের আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণার সংমিশ্রণের ফলে জটিল রূপ ধারণ করেছে। অপরপক্ষে, শ্রমনিরত সরল মানুষদের মুখে লোকসঙ্গীত হিসেবে টিকে থাকবার সময় দেহতত্ত্বের কথাটাও অনেক সরল ও অকৃত্রিমভাবে থাকবার সুযোগ পেয়েছে। সহজিয়ারা বলছে,
