স্তর জেমস্ ফ্রেসার(৬৬২) এ-বিষয়ে নিম্নোক্ত তথ্যের উল্লেখ করছেন। নিকরগুয়া বলে রেড-ইণ্ডিয়ানরা বীজ বোনবার সময় থেকে ফসল কাটার দিনটি পর্যন্ত সুকঠিন ব্রহ্মচর্য পালন করে; পুরুষেরা স্ত্রীদের সঙ্গে এক বাড়িতে রাত্রি যাপন করে না, নুন বা তাড়ি খায় না—এককথায়, স্পানিস ঐতিহাসিক যেমন বলছেন, এই সময়টিতে তাদের কঠিন আত্মসংযমের পালা। আধুনিক যুগ পর্যন্ত মধ্য-আমেরিকার কোনো কোনো রেড-ইণ্ডিয়ান ট্রাইবকে শস্য বৃদ্ধির কামনায় ব্ৰহ্মচর্য পালন করতে দেখা গিয়েছে : কেকচি-জাতির মধ্যে বীজবপন প্রসঙ্গে পাঁচদিন এবং অন্য কোনো কোনো জাতির মধ্যে তেরো দিন কঠোর সংযম পালনের নিয়ম। হাঙ্গেরিতেও একই নিয়ম চোখে পড়ে : কৃষকদের বিশ্বাস এভাবে সংযম পালন না করলে শস্য দুর্বল হবে। মধ্য-অস্ট্রেলিয়ায় কাইটিস নামের ট্রাইবের মধ্যে প্রথা হলো, শস্য-বৃদ্ধি কামনায় মোড়ল যতোদিন জাদুআনুষ্ঠান চালাবে ততোদিন পর্যন্ত সে স্ত্রী-সংসর্গ করবে না; তার বিশ্বাস এই নিয়মটি ভঙ্গ হলে বীজ থেকে ঘাস উৎপন্ন হওয়া বন্ধ হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
যোগসাধন-পদ্ধতি যদি আর্য-বহির্ভূতদের যাদুবিশ্বাস থেকেই গৃহীত হয়ে থাকে এবং ওই তথাকথিত আর্য-বহির্ভূতদের প্রধানতম জীবনোপায় বলতে যদি কৃষিকাজই হয়ে থাকে, তাহলে আদিম মানুষদের কৃষিকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের অঙ্গ এই নিরোধ-সাধনা স্বভাবতই যোগের উৎস-সংক্রান্ত সমস্যার উপর আলোকপাত করতে পারে।
——————————
৬৫৪. S. K. Belvalkar & R. D. Ranade HIP 2:81, 451.
৬৫৫. Ibid. 81.
৬৫৬. Ibid. 451-2.
৬৫৭. A. E. Gough PUAIM 18.
৬৫৮. Ibid. 19.
৬৫৯. S. Dasgupta op. cit. 134.
৬৬০. উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য : ভারতদর্শনসার ১৬৬।
৬৬১. J. Frazer GB 138.
৬৬২. Ibid.
৪০. তন্ত্রের দেহতত্ব
সম্প্রদায়-বিশেষের পরিভাষায়, যোগ-সাধনার এই তান্ত্রিক সংস্করণটির নাম কায়াসাধনা(৬৬৩)। অতএব, তান্ত্রিক যোগসাধনার আলোচনা থেকে স্বভাবতই দেহতত্ত্বের আলোচনায় গিয়ে পড়তে হয়। লোকায়তর উৎস সন্ধানে এই দেহতত্ত্বের আলোচনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লোকায়তিকের সঙ্গে তান্ত্রিক বা কাপালিকাদির যে যোগাযোগের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তার ভিত্তি বলতে শুধুমাত্র এইটুকুই নয় যে, পুরোনো পুঁথিপত্রে উভয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্বীকৃত হয়েছে। তাছাড়াও, দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকেও লোকায়তিক ও তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার মধ্যে যোগাযোগটা অস্পষ্ট নয়। লোকায়ত বলতে বোঝায় বস্তুবাদ, দেহাত্মবাদ; অর্থাৎ কিনা, আত্মা নেই, ঈশ্বর নেই, পরকাল নেই, পরলোক নেই, দেহই হলো চরম ও সার সত্য। আবার, দেহবাদই হলো তান্ত্রিকাদিবিশ্বাসের প্রাণবস্তু,—যদিও অবশ্যই আধুনিক বিদ্বানের আধুনিক ধ্যানধারণার প্রভাবে ওই দেহতত্ত্বের উপর বস্তুবাদ-বিরোধী —এবং অতএব বিজাতীয়—আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণা আরোপ করে বিষয়টিকে কৃত্রিমভাবে রহস্যময় করে তুলেছেন।
দেহতত্ত্বের মূল কথাটা কী? এ-বিষয়ে যোগ্যতম আলোচনা পাওয়া যায় শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়-এর রচনায়। আমরা স্বভাবতই দেহতত্ত্বের মূল কথাটির বর্ণনায় তারই রচনা অনুসরণ করবো। কিন্তু তার আগে আমাদের পক্ষে আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মূল কথাটুকু মনে রাখবার প্রয়োজন আছে। কেননা, শুধুমাত্র এই বিশ্বাসটির দিক থেকেই তন্ত্রসাধনার অপরাপর দিকগুলির মতোই দেহতত্ত্বকেও বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে পারা সম্ভব। তা না হলে, তন্ত্রের দেহতত্ত্ব আমাদের কাছে এক দুর্বোধ্য ও এমনকি উদ্ভট কল্পনা বলে প্রতীয়মান হবে। বস্তুত, শ্রদ্ধেয় পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই অনুভব করেছেন(৬৬৪) যে, তাঁর অমন প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা সত্ত্বেও আধুনিক পাঠকদের কাছে তন্ত্রের দেহতত্ত্ব ‘গাঁজাখোরি’ মনে হতে পারে। আমাদের যুক্তি অনুসারে তার কারণ, প্রাচীন মানুষের সঙ্গে আধুনিক মানুষের অনেক তফাত,—প্রাচীন বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের অনেক তফাত। এবং তান্ত্রিক দেহতত্ত্বের মধ্যে প্রাচীন বিশ্বাসের স্বাক্ষর রয়েছে বলেই আধুনিক জ্ঞানের মাপকাঠিতে তার মূল্য প্রতিপন্ন করবার বদলে আদিম মানুষদের বিশ্বাস সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্যের দিক থেকেই দেহতত্ত্বের মুল কথাটা বোঝবার আর বিচার করবার চেষ্টা করাই বাঞ্ছনীয়। দুঃখের বিষয়, শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টাটা ঠিক এর বিপরীত। তিনি আধুনিক মনের কাছ থেকে এই আদিম বিশ্বাসটিরই সমর্থন খুঁজছেন এবং যুক্তিতর্কের দিক থেকে এ-সমর্থন অসম্ভব বলেই তিনি “সদ্গুরুর কৃপায় সাধনার এবং আরাধনার অপূৰ্ব্ব রসাস্বাদনে ধন্য”(৬৬৫) হবার কথা বলছেন। বলছেন(৬৬৬), “কেবল ভাষার সাহায্যে ঠিকমত দেহতত্ত্ব এবং রসতত্ব বুঝান যায় না; সঙ্গে সঙ্গে সাধনশীল না হইলে উহার মর্ম বুঝা কঠিন।”
পুরাণ তন্ত্রে প্রযুক্ত নানা শব্দের পারিভাষিক অর্থ আমাদের জানা নাই। তাই পুরাণ তন্ত্রের অনেক কথা এখন আমাদের গাঁজাখোরি বলিয়া মনে হয়। উহার যে কোনটাই গাঁজাখোরি নহে–উদ্ভট, অস্বাভাবিক বা অসম্ভব নহে, তাহা দেহতত্ত্ববিদ্ পণ্ডিতগণ জানিতেন এবং বুঝাইয়া দিতে পারিতেন(৬৬৭)।
