আমাদের কাছে সমস্যাটা বিশেষ করে উঠেছিলো তন্ত্রসাধনার অঙ্গ হিসেবে ‘যোগ’ বলতে যে বিশেষ প্রণালীটি চোখে পড়ে তাই নিয়ে। কথাটা জরুরী। বিশেষ করে এই কারণে জরুরী যে, পাতঞ্জল-যোগদর্শন প্রভৃতি পরের যুগের রচনায় যোগসাধনার যে-পরিচয় আমরা পাই তা অনেক অর্বাচীন বলেই পরের যুগের ধ্যানধারণার সংমিশ্রণে অনেক বেশি জটিল। যোগসাধনার এই জটিল ও অবাচীন রূপটির দিক থেকেই যোগের আদিরূপ হঠযোগ বলে নিন্দিত হয়েছে। অপরপক্ষে, তন্ত্রসাধনার অঙ্গ হিসেবে যোগ বলে যে সাধনপদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায় তারই মধ্যে যোগসাধনার অপেক্ষাকৃত আদিমরূপটি টিকে থেকেছে। তাই, অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত তন্ত্র-প্রসঙ্গে যে-পদ্ধতিটিকে sexo-yogic-practice বলে বর্ণনা করছেন তারই আলোচনা থেকে যোগ-এর উৎস সংক্রান্ত সমস্যার উপর আলোকপাত হবার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি।
তন্ত্রের এই যোগসাধনার মূল কথাটা কী? অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত(৬৫৯) বলছেন :
The most important of the secret practices is the yogic control of the sex-pleasure so as to transform it into transcendental bliss, which is at the same time conducive to the health both of the body and the mind.
ওই গুহ্যসাধনাগুলির প্রধানতম অঙ্গ হলো যোগপদ্ধতিতে রতিমুখের নিরোধ, যাতে সে-রতিসুখ ঐশি আনন্দে পরিণত হয়; তারই সাহায্যে শরীর ও মনের স্বাস্থ্য (শক্তি) বৃদ্ধি পাবে।
অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত বলছেন, বৈষ্ণব-সহজিয়াদের গানে এবং ছোটোবড়ো অসংখ্য রচনায় বারবার এই যোগ-পদ্ধতিরই উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, হিন্দু-তন্ত্র এবং বৌদ্ধ-তন্ত্র এবং বৌদ্ধ-গান ও দোহার সবচেয়ে মৌলিক কথা বলতে ওই যোগ-পদ্ধতিরই কথা। এরই সঙ্গে শিব-শক্তির তত্ত্ব মিলে হিন্দু-তন্ত্র, প্রজ্ঞা-উপায়ের তত্ত্ব মিলে বৌদ্ধ-তন্ত্র এবং রাধা-কৃষ্ণ বা রস-রতির তত্ত্ব মিলে বৈষ্ণব সহজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে।
যোগসাধনার,—অন্তত তান্ত্রিক যোগসাধনার—সঙ্গে রতিসাধনার বা কামসাধনার সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত নিশ্চয়ই আমাদের কৃতজ্ঞতা-ভাজন হয়েছেন। কিন্তু এ-সাধনা শুধুই যে রতি-নিরোধ বা yogic control of the sex pleasure বুঝিয়েছে সে-কথা মনে করাও ঠিক হবে না। এমন কি আমাদের পুঁথিপত্রের মধ্যে আজো যেখানে যোগসাধনার আদিরূপটির কথা স্মারক হিসেবে টিকে রয়েছে সেখানে রতি-নিরোধের বিপরীত উপদেশও দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, যোগশিখা উপনিষদে(৬৬০) বলা হয়েছে :
রজসো রেতসে যোগাদ রাজ-যোগ ইতি স্থতঃ।।
তাহলে যোগসাধনার মধ্যে আপাত-বিরোধী দুটি দিকের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চমকার প্রভৃতির আলোচনায় আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, তান্ত্রিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো মৈথুন। অপরপক্ষে, অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্তের উদ্ধৃত উক্তিটির মধ্যে ঠিক এর বিপরীত কথা—রতি-নিরোধের কথা—পাওয়া যাচ্ছে। বস্তুত, প্রয়োগ ও নিরোধ,—উভয়বিধ প্রক্রিয়াই তান্ত্রিক যোগসাধনার অঙ্গ। এবং আমরা যে-হেতু আদিম কৃষিকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানাদি থেকেই তন্ত্র সাধনার উৎপত্তি অনুমান করবার চেষ্টা করছি সেই-হেতু আমাদের কাছে এখানে প্রধান প্রশ্ন হবে, আদিম কৃষিকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান বিশ্লেষণ করলে তন্ত্রসাধনার বা তান্ত্রিক যোগের ওই আপাতঃ-বিরোধী দুটি দিকের উপর আলোকপাত হয় কি না।
স্তর জেমস্ ফ্রেসার(৬৬১) ইতিপূর্বেই এ-বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি দেখাচ্ছেন, প্রাকৃতিক জননশক্তির কামনায় যে-আদিম বিশ্বাস রতি-প্রয়োগ হিসেবে বিকশিত হয় তাই আবার বিকল্পে রতি-নিরোধ হিসেবে বিকশিত হতে পারে :
To the student who cares to track the devious course of the human mind in its gropings after truth, it is of some interest to observe that the same theoretical belief in the sympathetic influence of the sexes on vegetation, which has led some peoples to indulge their passions as a means of fertilising the earth, has led others to seek the same end by directly opposite ImôánS……. If we ask why it is that similar beliefs should logically lead, among different peoples, to such opposite modes of conduct as strict chastity and more or less open debauchery, the reason, as it presents itself to the primitive mind, is perhaps not far to seek. If rude man identifies himself, in a manner, with nature; if he fails to distinguish the impulses and processes in himself from the methods which nature adopts to ensure the reproduction of plants and animals, he may leap to one of two conclusions. Either he may infer that by yielding to his appetites he will thereby assist in the multiplication of plants and animals; or he may imagine that the vigour that he refuses to expend in reproducing his own kind, will form as it were a store of energy whereby other creatures, whether vegitable or animal, will somehow benefit in propagating their species. Thus from the same crude philosophy, the same primitive notions of nature and life, the savage may derive by different channels a rule either of profligacy or of asceticism.
মানবমনের সত্যান্বেষণবৃত্তির বিবিধ বিকাশ সম্বন্ধে অনুসন্ধিৎসুদের পক্ষে একটি বিষয় চিত্তাকর্ষক হতে পারে : উদ্ভিদ জগতের-উপর যৌন-জীবনের অনুকরণজনিত প্রভাব সংক্রান্ত তত্ত্বগত যে-বিশ্বাস পৃথিবীকে ফলবতী করবার উদ্দেশ্যে কোনো মানবদলকে কামপরায়ণতার পথে নিয়ে গিয়েছে সেই বিশ্বাসই এবং সেই উদ্দেশ্যেই অপর মানবদলকে একেবারে বিপরীত উপায়ের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। সমজাতীয় বিশ্বাসই বিভিন্ন মানবদলকে কঠিন শুচিতা ও প্রায় প্রকাশ্য লাম্পট্যের মতো সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবহারের প্রতি কেন আকৃষ্ট করলো?—এ-প্রশ্ন তুললে আদিম মানুষদের দিক থেকে কারণটা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। আদিম মানুষ যদি কোনোভাবে নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্ন মনে করে, যদি সে নিজের অন্তর্গত প্রবৃত্তি ও পদ্ধতির সঙ্গে প্রকৃতিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্মদানসংক্রান্ত পদ্ধতির পার্থক্য বুঝতে না পারে, তাহলে তার পক্ষে দু’রকম সিদ্ধান্তের মধ্যে যে-কোনো একটি গ্রহণ করা সম্ভব। সে হয়তো মনে করতে পারে যে, তার নিজের কাম চরিতার্থতার সাহায্যেই উদ্ভিদ এবং জীবজন্তুর সংখ্যাবৃদ্ধি করা যাবে; কিংবা সে কল্পনা করতে পারে নিজের বংশবৃদ্ধি নিরুদ্ধ করে যে-শক্তিক্ষয় সে বন্ধ করলে সেই সতি-শক্তির সাহাযুেই উদ্ভিদ এবং অন্যান্য প্রাণীরা নিজেদের বংশবৃদ্ধির ব্যাপারে সহায়তা লাভ করবে। অতএব, ওই একই আদিম দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে,–প্রকৃতি ও জীবন সংক্রান্ত ওই একই ধারণা থেকে—আদিম মানুষ দুটি স্বতন্ত্র পথে রিরংস বা রতি-নিরোধ উভয় বিধিই গ্রহণ করতে পারে।
