আগন্তুক আর্যরাই যে এদেশের আধবুনো অধিবাসীদের উন্নত করে তুলেছিলো—এমনতরো একটা কল্পিত ইতিহাসের সঙ্গে ইংরেজ শাসকদের ‘হোয়াই্ট্-ম্যান্-বার্ডেন’ বলে অতিকথাটির অপরূপ সাদৃশ্য সত্ত্বেও, এককালে এমন কি আমাদের বিদগ্ধ-মহলেও ওই কল্পিত ইতিহাসটি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলো। মুখের বিষয় আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এই সংস্কারগত মতবাদটি থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করছেন। তাই অধ্যাপক গল্ফ-এর উদ্ধৃত সিদ্ধান্তের মধ্যে মূল্যবান মন্তব্যটা অন্য। তিনি বলছেন, যোগসাধনার উৎসে প্রাকৃত পর্যায়ের বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠান অনুমান করবার অবকাশ রয়েছে এবং এই কথাটি প্রতিপন্ন করবার উদ্দেশ্যে লেখক আদিম সংস্কৃতিংক্রান্ত নৃতত্বমূলক গবেষণা থেকেই আলোক পাবার চেষ্টা করছেন। তিনি এখানে টেলর-এর গবেষণার নজির দেখাচ্ছেন। টেলর(৬৫৮) বলছেন, ধ্যান, উপবাস, মাদকদ্রব্য ইত্যাদির সাহায্যে একটা অসুস্থ অবস্থা সৃষ্টি করাই অনেক সময় আদিম মানুষদের কাছে একরকমের পুরুষাৰ্থ :
নিচু-পর্যায়ের জাতিদের মধ্যে এবং এমন কি তাদের চেয়ে অনেক উন্নত অবস্থাতেও, ধ্যান, উপবাস, মাদকদ্রব্য, উত্তেজনা এবং রোগজনিত অসুস্থ উচ্ছ্বাসের দশা প্রায়ই চোখে পড়ে এবং বিশেষত পৌরাণিক ভাববাদে বিভোর জাতিগুলি এই অবস্থাকে সম্মানের চোখে দেখে। সভ্যতার নিম্ন পর্যায়ে সর্বত্রই চোখে পড়ে, রোগ, শ্রান্তি, অসুস্থ-উত্তেজনা বা মাদকদ্রব্যের প্রভাবজনিত মায়া-দৃশ্যগুলির বাস্তবতায় সকলেই গভীরভাবে বিশ্বাসী। উপবাস, তপস্যা, মাদকদ্রব্য ইত্যাদির সাহায্যে অসুস্থ উত্তেজনা সৃষ্টি করবার একটি উদ্দেশ্য হলো, এইভাবে রোগীরা অশরীরী জীবের দর্শন পাবে এবং সেই অশরীরী জীবের কাছ থেকেই তারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও এমন কি পার্থিব শক্তিও সংগ্রহ করতে পারবে।
প্রশ্ন হলো, টেলার-এর এ-জাতীয় মন্তব্য আমাদের আলোচ্য বিষয়ের উপর সত্যিই কতোটুকু আলোকপাত করতে পারে? আমাদের ধারণায় খুব বেশি নয়। কেননা, এ-জাতীয় বর্ণনা থেকে আমাদের মূল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আমাদের কাছে প্রশ্নটা এই নয় যে, আদিম মানুষদের মনে ভ্রান্ত ধারণা ছিলো কি না। তার বদলে, আমাদের প্রধান প্রশ্ন হলে, আজকের দিনে আমরা যে-বিশ্বাসকে সহজেই আত্মপ্রবঞ্চনা বলে চিনতে পারি ওই আদিম মানুষের কেন তাকেই ও-রকম পরম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলো? এ-কি শুধুই তাদের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ফল। টেলর-এর সিদ্ধান্ত মোটের উপর ওই রকমই কোনো এক কথায় পরিসমাপ্ত হয়। কেননা, ওই ‘কেন’র কোনো বৈজ্ঞানিক উত্তর তিনি অনুসন্ধান করেননি। কিংবা যেটুকু উত্তর তিনি দিয়েছেন তার বৈজ্ঞানিক এবং বাস্তব মূল্য অত্যন্ত সংকীর্ণ।
আমাদের মন্তব্য হলো, ক্রমোন্নতির যে-পর্যায়ে এবং অতএব জীবন-সংগ্রামের যে-অবস্থায় মানুষ এককালে এ-জাতীয় ভ্রান্ত বিশ্বাসকে অবলম্বন করবার চেষ্টা করেছে তারই পটভূমিতে বিচার না করলে আদিম মানুষের জীবনে এ-জাতীয় বিশ্বাসের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। অতএব, প্রাচীনদের জীবনে এ-বিশ্বাসের তাৎপর্য অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের পক্ষে সর্বপ্রথম মনে রাখা দরকার তাদের অসম্ভব আর অভাবনীয় দৈন্যের কথা : প্রকৃতিকে আয়ত্তে আনবার দিক থেকে দৈন্য, আর তারই অনুপাতে প্রকৃতিকে চেনবার দৈন্য, জ্ঞানের দৈন্য। আমরা আগেই দেখেছি, আদিম মানুষদের পক্ষে এই অভাবনীয় দৈন্যের সঙ্গে যোঝবারই একটা উপায় হলো জাদুবিশ্বাস আর জাদু-অনুষ্ঠান : জাদু-অনুষ্ঠানের দরুন বহির্জগতের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব নিশ্চয়ই পড়ে না, কিন্তু অনুষ্ঠানরত মানুষগুলির মনের উপর একটা প্রভাব পড়ে এবং তারই দরুন পরোক্ষভাবে প্রকৃতির উপরও একটা প্রভাব বিস্তৃত না হয়ে পারে না। ফলে, জাদু-বিশ্বাস ভ্রান্ত কুসংস্কার হলেও আদিম মানুষদের জীবনের বাস্তব পটভূমিতে তা জীবন-সংগ্রামের অঙ্গও। আমরা আরো দেখেছি, কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়েই এই জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। অতএব, এখানে বিশেষ করে সেই পর্যায়টির কথাই ভেবে দেখা যাক। প্রকৃতির উৎপাদিকাশক্তির রহস্য তখনো মানুষের কাছে অজ্ঞাত আর তাই মানুষের পক্ষে প্রকৃতির ফলপ্রসূতাকে আয়ত্তে আনবার প্রচেষ্টাও অনেকাংশেই সুদূর-পরাহত। অথচ, ওই অর্ধ-অসহায় মানুষকেই তার জ্ঞান ও শক্তির অনুপাতে প্রায় অসম্ভব কঠিন এই সমস্যাটির সম্মুখীন হতে হয়েছে। সে চেয়েছে, প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ হতে বাধ্য করতে। অতএব, এই সুকঠিন সমস্যাটির সমাধানের জন্য তার নিজের মধ্যে,—অন্তত তার নিজের ধারণায়,—একটা প্রচণ্ড শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। যে-পদ্ধতি ও উপকরণের সাহায্যে সে এই অতি মানবীয় শক্তিকে নিজের মধ্যে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা করছে—ধ্যান, উপবাস, মাদকদ্রব্য বা অসুস্থ উত্তেজনা—সেগুলিকে আমরা আধুনিক ও উন্নত জ্ঞানের মানদণ্ডে উৎকট কুসংস্কার বলে বুঝতে পারি। কিন্তু শুধুমাত্র উৎকট কুসংস্কার বলে বুঝলেই এগুলিকে ঠিকমতো চেনা হবে না। ওই অর্ধঅসহায় মানুষদের কাছে এগুলি কোন ধরনের জীবনোপায় ছিলো, সে-কথাও স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার।
ধ্যান, উপবাস, মাদকদ্রব্য এবং ওই জাতীয় অন্যান্য উপায়ের সাহায্যে সাধকের মধ্যে এক অতি-মানবীয় শক্তি জাগিয়ে তোলবার আদিম কল্পনা থেকেই যে যোগ-এর উৎপত্তি হয়েছিলো এবং এই সাধন-পদ্ধতি যে আদিতে পশুপালনজীবী বৈদিক মানুষদের পরিবর্তে কৃষিজীবী তথাকথিত আর্য-বহির্ভূত আদিবাসীদের মধ্যেই প্রচলিত থাকবার সম্ভাবনা—এ-কথার প্রতি অধ্যাপক বেলভেলকার ও রানাডে এবং অধ্যাপক এ. ই. গল্ফ ইতিপূর্বেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদু-অনুষ্ঠান থেকেই যে যোগ-সাধনার উৎপত্তি সে-কথা তারা স্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করেননি। অতএব আমরা সেই বিষয়টির দিকেই পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করবো। অবশ্য, আমরা আগেই বলেছি, যোগের উৎস-সংক্রান্ত জটিল সমস্যাটির পূর্ণাঙ্গ আলোচনা তোলা এখানে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তার বদলে, আমাদের যুক্তির পক্ষে যেটুকু প্রসঙ্গের অবতারণা করা প্রয়োজন আমরা শুধু সেইটুকুরই উল্লেখ করবো।
