সুখের বিষয় লেখকদ্বয় গ্রন্থের অন্যত্র(৬৫৬) এই প্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এবং সেখানে তারা ন্যায়সঙ্গতভাবেই আদিম জাদুবিশ্বাস ও জাদুঅনুষ্ঠানের দিকেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন।
অধ্যাপক বেলভেলকার এবং রানাডে বলছেন, যোগসাধনার মূল কথা হলো শরীর-মনের একরকম অবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা,—সেই প্রচেষ্টার সাহায্যে শুধুই যে শরীর ও মনের নির্দিষ্ট শক্তিকে জাগিয়ে তোলায় বিশ্বাস তাই নয়, নানাপ্রকার প্রাকৃতিক শক্তিকেও আয়ত্তে আনবার কল্পনা করা হয়। যোগ-সাধকের মনে করেন, এ-জাতীয় শক্তিকে জাগরিত করা সত্যিই সম্ভব। প্রশ্ন ওঠে, এ-হেন বিশ্বাস এলো কোথা থেকে? লেখকদ্বয় বলছেন, বৈদিক যাগ-যজ্ঞকে বিশ্লেষণ করলেও তার পিছনে ওই একই বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়। অতএব তাদের মতে, বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ডের অন্তর্নিহিত ওই বিশ্বাসটির বিশ্লেষণ থেকেও যোগ-সাধনার উৎস সংক্রান্ত সমস্যার উপর আলোকপাত হতে পারে। এবং বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ডের অন্তর্নিহিত ওই বিশ্বাসটিকে সনাক্ত করতে গিয়ে তারা বলছেন, অন্তত বহু ক্ষেত্রেই একে আদিম মানুষদের জাৰ্ছ-বিশ্বাস—sympathetic magic—না বলে উপায় নেই। বৈদিক অনুষ্ঠানের মধ্যে যে জাদুবিশ্বাসের স্থান সত্যিই ছিলো তারই আর একটি নজির হিসেবে লেখকদ্বয় বৈদিক দীক্ষার কথা উল্লেখ করছেন; বৈদিক দীক্ষার সঙ্গে আদিম মানুষদের সমজাতীয় অনুষ্ঠানের তুলনা করলে সহজেই দেখতে পাওয়া যাবে, ওই বৈদিক অনুষ্ঠানটিতে আদিম জাদুবিশ্বাসের পরিচয় কতো স্পষ্ট!
বৈদিক অনুষ্ঠানাদির মধ্যে আদিম জাদুবিশ্বাসের এই পরিচয় থেকে যোগসাধনার উৎস-সংক্রান্ত সমস্যার উপর কোন ধরনের আলোকপাত হতে পারে? লেখকদ্বয়ের ধারণায়, বৈদিক অনুষ্ঠানের এ-জাতীয় অঙ্গ স্থানীয় আর্যপূৰ্বদের কাছ থেকেই গৃহীত হয়েছিলো এবং যোগসাধন পদ্ধতিও কালক্রমে এইভাবেই আর্য সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়েছে। যোগ-সাধনার মূল বিশ্বাস হলো প্রাণায়াম, আসন প্রভৃতি কয়েকটি শারীরিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে যেমন চিত্তকে সংহত ও শক্তিশালী করা সম্ভব তেমনিই চিত্তের একাগ্রত। প্রভৃতি কয়েকটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে শারীরিক শক্তিকেও উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। শুধু তাই নয়। এইভাবে নিজের মধ্যে শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে তারই সাহায্যে প্রকৃতিকেও আয়ত্তে আনা যেতে পারে। এই জাতীয় ধারণায় জাদুবিশ্বাসের প্রভাব অস্পষ্ট নয়। আদিম ধর্মাচরণ ও জাদুবিশ্বাসের মূলে এ-জাতীয় বিশ্বাসের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। পারিভাষিক অর্থে ‘যোগ’ শব্দটি প্রচলিত হবার আগেই ওই আদিম বিশ্বাসটি বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ডের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
অবশ্যই আমরা ইতিপূর্বে দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, বৈদিক সাহিত্যে যা-কিছু আদিম তাই আৰ্য-পূৰ্বদের কাছ থেকে গৃহীত হয়েছিলো, এ-কথা অনুমান করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কেননা, বৈদিক মানুষদেরও একটা অতীত ছিলো : পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত মানবজাতির মতোই বৈদিক মানুষদের পক্ষেও আদিম পর্যায় পার হয়ে এগিয়ে আসতে হয়েছে; এবং, অতএব, সেই আদিম পর্যায়ের চিন্তাচেতনার অনেক স্মারক বৈদিক সাহিত্যে টিকে থাকা নিশ্চয়ই আশ্চর্যের বিষয় নয়। কিন্তু তবুও যোগ-সাধনার আদিরূপ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট সমস্যাটি প্রসঙ্গে অধ্যাপকদ্বয়ের উদ্ধৃত মন্তব্যের যাথার্থ সম্ভাবনা একদিক থেকে যথেষ্ট বেশি। অর্থাৎ আদিম জাদুবিশ্বাস বা জাদুঅনুষ্ঠান থেকেই যদি যোগসাধনার উৎপত্তি হয়ে থাকে তাহলে তার পক্ষে আদিতে ওই তথাকথিত আর্য-বহির্ভূতদের বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানের অঙ্গ হবার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত প্রবল। তার কারণ, বৈদিক মানুষদের জীবন প্রধানতই পশুপালন-নির্ভর ছিলো; তুলনায় তথাকথিত আৰ্য-পূর্ব বা আর্য-বহির্ভূতরা প্রধানতই কৃষি-নির্ভর জীবনযাপন করতো এবং আমরা আগেই দেখেছি, পশুপালনের চেয়ে কৃষিকাজের পক্ষেই জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি (পৃ. ৩৪৭)।
অধ্যাপক এ. ই. গফ-ও অনুমান করছেন, স্থানীয় অনার্য আদিবাসীদের কাছ থেকেই বৈদিক আর্যরা কালক্রমে যোগসাধন-পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছিলো। অতএব, যোগ-সাধনার আদিরূপকে খুঁজে পাবার আশায় লেখক(৬৫৭) অসভ্য অধিবাসীদের অত্যদ্ভুত বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানের দিকেই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখতে চাইছেন :
আর্যরা তখন যে-সব আধ-বুনো জাতিদের সঙ্গে মিশ্রিত হচ্ছিলো ও যাদের উন্নয়ন-সাধন করছিলো তাদের কাছ থেকেই আর্যরা এই যোগ-সাধনপদ্ধতিটি গ্রহণ করেছিলো। যোগ অনুসারে, সাধারণ অবস্থার তুলনায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে মর্মর মূর্তির মতো নিশ্চল করে রাখবার অভ্যাস এবং ক্যাটালেন্সি রোগে শরীরটা ষে-রকম স্থায়ু ও স্পর্শকাতরহীন হয়ে যায় সে-রকম অবস্থায় পৌঁছোনোর চেষ্টাই সাধকের অন্যতম উদ্দেশ্য। এই অবস্থাটিকেই সাধকের নির্বিকল্প সমাধিতে বিলীন হয়ে যাওয়া বলে কল্পনা করেন। মাঝে মাঝে সাধকের স্বায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্কের অসুস্থ উচ্ছ্বাস দেখা দেয়, ফলে প্রত্যক্ষ ও কল্পনার মধ্যে প্রভেদ মুছে যাবার উপক্রম হয় এবং শুধুই যে যোগী নিজেকে অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী বলে মনে করেন তাই নয়, অপরেও তাকে এ-জাতীয় শক্তির অধিকারী বলে বিবেচনা করে।
