এখানে আমাদের যুক্তির পক্ষে ঠিক কোন প্রশ্ন একান্তভাবে প্রাসঙ্গিক? প্রশ্নটা হলো, যোগসাধনার আদি-রূপটির সঙ্গে আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদু-বিশ্বাস বা জাতু-অনুষ্ঠানের সম্পর্ক অনুমান করবার মতো কোনো ইংগিত খুঁজে পাওয়া যায় কিনা? এই প্রশ্নটি এখানে না-উঠে পারে না। তার কারণ, আমাদের যুক্তি অনুসারে তান্ত্রিকাদি—তথা লোকায়তিকও— ধ্যানধারণার উৎসে রয়েছে ওই আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসই।
অবশ্যই উত্তরকালে এই তন্ত্রের উপর নানারকম অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন ধ্যানধারণ প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। অতএব, আমাদের এই যুক্তির সমর্থনে প্রথমে দেখানে প্রয়োজন ছিলো যে, যদিও আমরা উত্তরকালে তন্ত্রকে নান৷ সম্প্রদায়ে বিভক্ত হিসেবে নানারূপে দেখতে পাই, তবুও তার আদি এবং অকৃত্রিম রূপটি এ-জাতীয় সম্প্রদায়বিভাগের চেয়েও অনেক প্রাচীন।
এই কথাটি প্রতিপন্ন করবার আশায় আমরা প্রধানতই বৃদ্ধসম্মতির উপর নির্ভর করেছি। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্ত উভয় বিদ্বানই তন্ত্রবিষয়ে সুপণ্ডিত। এবং উভয়ের রচনাতেই এই কথাটি স্বীকৃত হয়েছে। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “তন্ত্রের যে কোন পুঁথি পাঠ কর না কেন, তাহা পাঠ করিলে বুঝা যাইবে যে, অতি পুরাতন একটা শক্তি-ধর্মের বুনিয়াদের উপর বৌদ্ধ মনীষা একটা নতুন ধর্মের প্রাসাদ গড়িয়া তুলিয়াছিলেন; পরে নব্য-হিন্দুর ব্রাহ্মণ-প্রতিভা বৌদ্ধের সেই মনীষা-প্রাসাদের উপর ব্রাহ্মণ্যের লেখা গাঢ় করিয়া লিখিয়া রাখিয়াছেন।” ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্তও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন। কেবল তিনি সেই আদিম সাধনপদ্ধতিটিকে শক্তিধর্ম না বলে sexo-yogic practice আখ্যা দিচ্ছেন। তাঁর মতে এই যৌন-যোগ-সাধনাই তন্ত্রের আদিরূপ। উত্তরকালে এরই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব প্রভৃতি নানাপ্রকার ধ্যানধারণার সংমিশ্রণ হয়ে তন্ত্রের নানা সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিলো।
অতএব, আমাদের যুক্তির দিক থেকে প্রশ্ন উঠলে, ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্ত যাকে ওই যৌন-যোগসাধন পদ্ধতি বলে বর্ণনা করছেন তার সঙ্গে আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাতৃঅনুষ্ঠানের যোগাযোগ অনুমান করবার মতো কোনো ইংগিত পাওয়া যায় কি? লেখক যদি তার বর্ণনায় ‘যোগ’ শব্দটি ব্যবহার না করতেন তাহলে অবশ্যই আমাদের সমস্যা অপেক্ষাকৃত লঘু হতো। কেননা, পঞ্চমকার-প্রাণ তন্ত্রের মৈথুনাদি যে আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদু-অনুষ্ঠানেরই স্মারক—এ-কথা আমরা ইতিপূর্বেই দেখাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যোগ বলতে অন্তত আধুনিক কালে আমাদের মনে প্রধানতই এমন সব ধারণা জাগে যার সঙ্গে ওই আদিম অনুষ্ঠানের সম্পর্ক কল্পনা করা আয়াস-সাধ্য।
ফলে, আমাদের কাছে ওই দ্বিতীয় প্রশ্নটি—অর্থাৎ, আধুনিক কালে যোগ বলতে যাই বোঝাক না কেন, তার আদিরূপটির সঙ্গে কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠানের সম্পর্ক ছিলো কি না,—বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো।
আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে কেউকেউ ইতিপূর্বেই ‘যোগ’-এর উৎস-প্রসঙ্গে এমন কোনো কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবার চেষ্টা করেছেন যা থেকে আমাদের অনুমানটিরই অন্তত আভাস পাওয়া যায়। তাই এ-জাতীয় সিদ্ধান্তের আলোচনা থেকেই আমাদের পক্ষে অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয় হবে।
অধ্যাপক বেলভেলকার ও রানাডে(৬৫৪) সিদ্ধান্ত করছেন, আদিতে ‘যোগ’ একরকমের অবৈদিক সাধন-পদ্ধতিই ছিলো। দেশের আর্য-পূর্ব আদিবাসীদের মধ্যেই এই সাধন-পদ্ধতি প্রচলিত ছিলো। ব্রাহ্মণ-গ্রন্থগুলি রচিত হবার সময় বৈদিক আর্যরা এ-দেশের অনেকখানি অভ্যন্তর-প্রদেশ পর্যন্ত প্রবেশ করেছিলো। ফলে, এই যুগ-বরাবরই তাদের সঙ্গে স্থানীয় আর্য-পূৰ্বদের সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। সে-ঘনিষ্ঠতার পরিণাম হিসেবেই বৈদিক আর্যদের চিন্তাচেতনায় ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে স্থানীয় আর্যপূর্বদের নানাবিধ বিশ্বাস এবং অনুষ্ঠান প্রবেশলাভ করে। অবশ্যই, বৈদিক আর্যদের কাছে প্রধানতম বিষয় ছিলো যাগযজ্ঞ। ফলে, আর্যপূর্বদের কাছ থেকে গৃহীত বিশ্বাস এবং অম্বষ্ঠানাদিকেও তারা এই যাগযজ্ঞেরই অঙ্গীভূত করে নেবার চেষ্টা করেছে। সেগুলি তাই আৰ্যপূৰ্বদের বিশ্বাসাদিরই একরকম আর্যসংস্করণে পরিণত হয়েছিলো। এ-জাতীয় একটি পরিণতিরই প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো যোগ-সাধনা। অর্থাৎ, এই যোগ-সাধনা প্রকৃতপক্ষে কোনো এক প্রাক্-আর্য সাধনপদ্ধতিরই আর্য-সংস্করণ মাত্র।
যে-আর্যপূৰ্বদের কাছ থেকে এই যোগ-সাধন গৃহীত হয়েছিলো তাদের সনাক্ত করবার প্রচেষ্টায় লেখকদ্বয় অনুমান করছেন, হয়তো আর্য-আক্রমণের ফলেই এরা উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিলো। কিংবা, এমনও হতে পারে যে, মানবোন্নতির সোপান ভেঙে যাযাবর জীবনের চেয়ে তারা তখনো খুব বেশি উঁচুতে উঠে আসতে পারেনি। এই দ্বিতীয় সম্ভাবনা-প্রসঙ্গে অধ্যাপক রানাডে আর বেলভেলকার বলছেন, আজকের দিনেও ভারতবর্ষের বুক থেকে এজাতীয় অনুন্নত মানবদলের পরিচয় বিলুপ্ত হয়নি : such people are not extinct in India even up to the present day(৬৫৫)।
আমাদের মন্তব্য হলে, অধ্যাপকদ্বয়ের এই উক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যদিও দুঃখের বিষয় তারা সে-গুরুত্বের প্রতি উপযুক্ত মনোযোগ দেননি। কেননা, তাদের ওই মন্তব্য যদি অভ্রান্ত হয়, অর্থাৎ, যদি সে-জাতীয় অনুন্নত পর্যায়ে সত্যিই আমাদের দেশে কোনোকোনো মানবদল আজো টিকে থাকে, তাহলে যোগ-সাধনার আদিরূপটিকে উদ্ধার করবার উদ্দেশ্যে তাদেরই বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানকে বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হওয়াই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত হওয়া উচিত। এবং এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, উক্ত পদ্ধতি অনুসারে অগ্রসর হলে লেখকদ্বয় অত্যন্ত মূল্যবান সিদ্ধান্তে উপনীত হবার অবকাশ পেতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তারা তা করেননি। তার বদলে তারা ওই মূল্যবান উক্তিটির বিকল্প হিসেবে কল্পনা করেছেন, হয়তে আর্য-আক্রমণের ফলেই আলোচ্য আর্য-পূৰ্বর উদ্বাস্তুর অবস্থায় পরিণত হয়েছিলো এবং অতএব তারা একরকম যাযাবর-বৃত্তিই গ্রহণ করেছিলো। এ-জাতীয় একটি বিকল্পের সম্ভাবনা লেখকদ্বয়ের কল্পনায় উদিত হচ্ছে কেন? কেননা, তারা যাযাবর-বৃত্তিকেই আদি-যোগসাধকদের প্রধানতম লক্ষণ বলে চেনবার চেষ্টা করছেন। তার কারণ হয়তো এই যে, আমাদের চলতি ধারণা অনুসারে যোগীরা গৃহহীন পরিব্রাজক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যোগসাধনার আদিরূপটিকে উদ্ধার করবার জন্য ওই যাযাবর-বৃত্তির উপরই অমন ঐকান্তিক গুরুত্ব আরোপ করবার প্রয়োজন আছে কি? নিশ্চয়ই নয়। এমন কি, লেখকদ্বয়ের নিজেদের উক্তির দিক থেকেও নয়। কেননা, তার নিজেরাই বলছেন, আর্যপূর্বদের কয়েকটি অত্যন্থত এবং অতি-প্রাকৃত বিশ্বাসাদিরই আর্য-সংস্করণ হিসেবে কালক্রমে যোগ-সাধনার উদ্ভব হয়েছিলো। যদি তাই হয়,—এবং ওই তথাকথিত যাযাবর-বৃত্তি নিশ্চয়ই সে-রকম কোনো অত্যন্থত ব্যবহার নয়,—তাহলে যোগসাধনার উৎস-সন্ধানে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত : সেই অতি-প্রাকৃত বিশ্বাসাদির স্বরূপটা কী রকম ছিলো?
