এক এক গুণে কৈল এক এক প্রকৃতি।
হরকে ভজয়ে সবে ভাবে উপপতি।
শক্তি জানে রসতত্ত্ব আর জানে শঙ্করে।
সহজ বস্তু আস্বাদিল কুচনি নগরে।
আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুমান করতে পেরেছেন যে, সহজিয়া-সম্প্রদায়ের ধ্যানধারণার উপর যদিও পরবর্তী কালে—এবং অতএব কৃত্রিমভাবেই—বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব ধ্যানধারণা প্রক্ষিপ্ত হয়েছিলো, তবুও এ-সম্প্রদায়ের আদি-অকৃত্রিম রূপটির সঙ্গে বৌদ্ধ বা বৈষ্ণব কোনো ধ্যানধারণার মৌলিক এবং আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নেই। তিনি বলছেন, আমাদের দেশে বহুদিনের পুরোনো একটি সাধন-পদ্ধতি প্রচলিত ছিলো এবং তারই উপর উত্তরকালের রকমারি ধ্যানধারণা প্রক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে পরবর্তী যুগে রকমারি সহজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্তের মতে যে-প্রাচীন সাধনপদ্ধতিটি আগে থাকতেই দেশে প্রচলিত ছিলো এবং যার সঙ্গে পরে বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম ও বৈষ্ণবধর্মের নানান ধ্যানধারণা মিশেছে, তা হলো একরকম গুহ্য যোগসাধনা ৷
তিনি(৬৫৩) বলছেন, ‘আমাদের দেশে এক গুহ্য সাধনপদ্ধতি প্রচলিত ছিলো। তাকেই ঘিরে বিভিন্ন সহজিয়া সম্প্রদায়ের শাখা-প্রশাখা গজিয়েছিলো। কিন্তু এই গুহ্য সাধনপদ্ধতি হিন্দু বা বৌদ্ধ কোনো ধর্মেরই অন্তর্গত নয়। এ হলো যোগসাধনী—তারই সঙ্গে বৌদ্ধ ও হিন্দু বিভিন্ন ধর্মমতের সংস্রব ঘটবার ফলে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে। এই গুহাসাধনার প্রধানতম অঙ্গ হলো যৌন-মুখকে যোগপদ্ধতিতে আয়ত্তে এনে তাকে অতীন্দ্রিয় আনন্দে পরিণত করা। তার ফলে দেহ ও মন উভয়েরই বলবৃদ্ধি হয়। এই যোগসাধনা ও তার অঙ্গগুলির সঙ্গে শিব-শক্তিমূলক দর্শনের যোগাযোগ হয়ে হিন্দু-তন্ত্রের কেন্দ্র হয়েছে; তারই সঙ্গে উত্তরযুগের বৌদ্ধধর্মের প্রজ্ঞা-উপায়মূলক চিন্তার যোগাযোগ হয়ে বিভিন্ন তান্ত্রিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে—সহজিয়া সম্প্রদায় তারই অন্তর্গত; আবার, গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের রস ও রতিরূপে কল্পিত রাধা ও কৃষ্ণের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওই একই যোগসাধন পদ্ধতি বাংলা দেশে বৈষ্ণব-সহজিয়া আন্দোলনে পরিণত হয়েছে’ (স্বাধীন তর্জমা)।
_____________
৬৩৭. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : বৌদ্ধধর্ম ৭৮।
৬৩৮. ঐ ৮৫।
৬৩৯. ঐ ১০৬ ইত্যাদি।
৬.৪০. D. Sen CHA 351. “There are hundreds of these sects silently
working in Bengal”…
৬৪১. পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী ২,৩২৫ ।
৬৪২. D. Sen CHA 337.
৬৪৩. S. Dasgupta ORC90.
৬৪৪. M. M. Bose PCSCB 42.
৬৪৫. Ibid. 42.
৬৪৬. Ibid, 42-3. অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসুর মতে ৮০ বছরের বৃদ্ধ যদিও পুরুষ হয়েই থাকে তবুও তার কামনাবাসনার উপসম হয় ; কিন্তু এ-উপসম ক্ষয়জনিত। অপরপক্ষে যুবক যদি সযত্ন-সাধনার ফলে নিরপেক্ষ-দশায় পৌঁছুতে পারে তাহলে তার ইন্দ্রিয়াদি সক্রিয় থাকবে এবং তবুও বহিঃপ্রকৃতির সংবেদনে সে বিচলিত হবে না। অধ্যাপক বসুর এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় : সহজিয়ারা স্ত্রী-পুরুষ-নিরপেক্ষ অবস্থায় পৌঁছুবার সাধনা করে না—স্পষ্টই স্ত্রীভাবে সাধনা করতে চায় এবং স্ত্রীলোক কামনা-বাসনা রহিত নয়। তাছাড়া যে-শান্ত সমাহিত অবস্থাকে অধ্যাপক বসু সহজিয়া-সাধনার লক্ষ্য বলছেন তা সম্প্রদায়ান্তরের পক্ষে প্রাসঙ্গিক হলেও অন্তত সহজিয়াদের বেলায় অপ্রাসঙ্গিক, কেননা সহজ-সাধনা রিরংসার উপরই প্রতিষ্ঠিত। cf. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : (বৌদ্ধধর্ম ৭১) “এই সকল সহজপন্থীর শাস্ত্র স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দিতেছে যে, যদি তোমার বোধিলাভের ইচ্ছা থাকে, তবে পঞ্চকাম উপভোগ কর”।
৬৪৭. S. Dasgupta op. cit. 115-6.
৬৪৮. Ibid. 120.
৬৪৯. Ibid. 121ff.
৬৫০. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : বৌদ্ধধর্ম ৬৯ ৷
৬৫১. S. Dasgupta op. cit. 136.
৬৫২. Ibid,
৬৫৩. Ibid. 134.
৩৯. যোগ-এর উৎস
তাহলে অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্তের এই মন্তব্য অনুসারে সহজিয়া, তথা তান্ত্রিক সাধনার অকৃত্রিম রূপটিকে খুঁজে পেতে হলে যোগসাধনার আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধান করা দরকার। অবশ্যই উত্তরকালের পাতঞ্জলি প্রণীত যোগসূত্র প্রভৃতি গ্রন্থে আমরা যোগসাধনার যে-পরিচয় পাই তার সঙ্গে নর-নারীর ওই সঙ্গম—বা ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্ত যাকে যৌন-তৃপ্তির উদ্গতি (sublimation) বলে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করেছেন, তার—সম্পর্ক নেই। অতএব, যোগসাধনার এই উত্তরকালের সংস্করণকে পরীক্ষা করে ওই সুপ্রাচীন যোগ-সাধনপদ্ধতির পরিচয় পাবার আশা করা উচিত হবে না।
অতএব, আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে, উত্তরকালে যোগসাধনা বলতে যাই বোঝাক না কেন, এই সাধন-পদ্ধতির আদিরূপটি ঠিক কেমন ছিলো? কিংবা, যা একই কথা, কোথা থেকে এই সাধন-পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিলো? লোকায়তর উৎস-সন্ধানেও এ-প্রশ্ন অবান্তর হবে না। কেননা, আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, গুণরত্ন বলছেন লোকায়তিকেরা গায়ে ভস্ম মাখে, তারা মিথুনাসক্ত, তারা যোগী। অর্থাৎ, আদিতে লোকায়তর সঙ্গে যোগ-এরও যে একটা সম্পর্ক থাকা সম্ভবপর, এ-ইংগিত গুণরত্বের রচনা থেকেই পাওয়া যাচ্ছে।
বলাই বাহুল্য, যোগ-এর উৎস-সংক্রান্ত সমস্যা কঠিন ও জটিল। আমাদের পক্ষে এখানে তার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা তোলা নিশ্চয়ই সম্ভব হবে না। অতএব আমরা এখানে উক্ত সমস্যার শুধু সেইদিকটুকুরই আলোচনা তুলবো যেটুকু আমাদের যুক্তির বর্তমান পর্যায়ে একান্তই প্রাসঙ্গিক।
