সহজিয়াদের সাধন-পদ্ধতির মধ্যেও এই নারী-প্রাধান্যমূলক চিন্তার কী রকম পরিচয় পাওয়া যায় তাই দেখা যাক। অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসু(৬৪৪) বলছেন :
The Sahajiao also believe that at a certain stage of spiritual culture the man should transform himself into a woman and remember that he cannot have experience of true love so long as he cannot realise the nature of a woman in him.
অর্থাৎ, সহজিয়াদের বিশ্বাস অনুসারে সাধনার একটা পর্যায়ে পুরুষের পক্ষে নারীভাবে পর্যবসিত হওয়া প্রয়োজন এবং এ-কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, নারীত্বের অনুভূতি ছাড়া প্রকৃত প্রেমের অভিজ্ঞতা হয় না।
এই উক্তির সমর্থনে অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসু – – সহজিয়াদের গান উদ্ধৃত করছেন :
পুরুষ ছাড়িয়া প্রকৃতি হবে।
একদেহ হয়ে নিত্যতে যাবে।
কিংবা,
স্বভাব প্রকৃতি হইলে তবে রাগ রতি।
কিংবা,
প্রকৃতি আচার পুরুষ বেভার
যে জনা জানিতে পারে।
কিংবা,
আপনি পুরুষ প্রকৃতি হইবে।
ইত্যাদি। ইত্যাদি।
আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, তন্ত্রেরও এই একই উপদেশ : বামা ভূত্বা যজেং পরাম্। এবং আমরা দেখেছি, এ-থেকে অনুমান করা যায়, তন্ত্রসাধনা এককালে মেয়েদেরই সাধন-পদ্ধতি ছিলো। সহজিয়া-প্রসঙ্গেও একই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আধুনিক মনোবিজ্ঞানের নজির দেখিয়ে অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসু এই তত্ত্বের যে-আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন তা প্রায় হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে; পাদটীকায়(৬৪৬) আমরা তার সিদ্ধান্ত উল্লেখ করবো এবং সে-সিদ্ধান্ত কেন আমাদের কাছে প্রায় হাস্যকর মনে হয়েছে তারও আলোচনা তুলবো। আপাতত, সহজ-সাধনায় নারীপ্রাধান্যের দিকটিকে আরো ভালো করে দেখা যাক :
অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত(৬৪৭) বলছেন :
Another thing that deserves special attention in connection with the yogic practice of the Sahajia Buddhists is the conception of the female force. In the Carya-songs we find frequent reference to this female force variously called as the Chandi, Dombi, Savari, Yogini, Nairamani, Sahaja-sundari, etc., and we find frequent mention of the union of the yogin with this personified female deity.
সহজিয়াদের যোগসাধনা প্রসঙ্গে স্ত্রী-শক্তি সম্বন্ধে তাদের ধারণার কথা বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন। চর্যা-পদে নানান নামে এই স্ত্রী-শক্তির উল্লেখ বারবার পাওয়া যায় : চণ্ডী, ডোম্বী, শবরী, যোগিনী, নৈরামণি, সহজস্বনারী ইত্যাদি। এবং মানবীরূপে কল্পিত এই দেবীর সঙ্গে যোগসাধকের মিলনের উল্লেখও বারবার পাওয়া যায়।
লেখক স্বীকার করছেন, সহজিয়াদের এই স্ত্রী-শক্তিটি তন্ত্রের শক্তি ছাড়া য়ার কিছু নয় :
This conception of Sakti of the Buddhist Sahajias is an adoption of the general Tantric conception of the Sakti.
বৌদ্ধ সহজিয়াদের শক্তির এই ধারণ তন্ত্রের শক্তির ধারণাকেই গ্রহণ করবার ফল…
তন্ত্রসাধনার শক্তির আলোচনা আমরা ইতিপূর্বেই করেছি এবং আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, কৃষি-আবিষ্কারের পটভূমিতেই তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব।
অবশ্যই, সহজ-সাধনার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করছেন বলেই ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্ত(৬৪৯) বলছেন, ওই শক্তির সঙ্গে সাধকের যে-সঙ্গমের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে তাকে দৈহিক বা শারীরিক অর্থে গ্রহণ করলে ভুল করা হবে। কিন্তু স্ত্রী-পুরুষের দৈহিক মিলনই যে সহজ-সাধনার একটি প্রধানতম অঙ্গ এ-কথা শুধু ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্ত নন, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ আধুনিক বিদ্বানেরা সকলেই স্বীকার করেছেন। আমাদের যুক্তি অনুসারে ওই সহজসাধনাও যদি কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠান থেকেই জন্মলাভ করে থাকে তাহলে এ-রকমটা না-হয়ে উপায় নেই। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে, কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠানের সেই আদি-অকৃত্রিম রূপটিই সহজ-সাধনার মধ্যে আজো অবিকৃতভাবে দেখতে পাওয়া সম্ভব। বিশেষত, সহজিয়া-সাহিত্যে ওই বৌদ্ধ-প্রলেপের দরুন এই সঙ্গম-সাধনার উপর নানা রকম বৌদ্ধ পরিভাষা প্রক্ষিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক। তাই সহজিয়া-সাহিত্যে এই মৈথুনকে প্রভাস্বর ও নিরাত্মাদেবীর মৈথুন, শূন্যতা ও করুণার মৈথুন, প্রজ্ঞা ও উপায়ের মৈথুন—প্রভৃতি নানান পরিভাষায় ব্যক্ত করা হয়। কিন্তু পরিভাষাটা যাই হোক না কেন, তার মূলে ঠিক কী আছে তা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর(৬৫০) নিম্নোক্ত উক্তি থেকেই অনুমান করা সম্ভবপর :
যোগাচারমতে যেমন কিছুই থাকে না বিজ্ঞানমাত্র থাকে, সহজমতে, তেমনি কিছুই থাকে না আনন্দমাত্র থাকে। এই আনন্দকে তাঁহারা মুখ বলেন, কখনো বা মহামুখ বলেন। সে সুখ স্ত্রী-পুরুষ-সংযোগজনিত মুখ।
আমাদের যুক্তি অনুসারে, তন্ত্রের মতোই ওই সহজিয়া প্রভৃতি সম্প্রদায়গুলিও আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস থেকেই জন্মলাভ করেছে। বস্তুত, তন্ত্রসাধনার আদি-অকৃত্রিম রূপটির সঙ্গে সহজিয়া প্রভৃতি এই সাধনসম্প্রদায়গুলির কোনো মৌলিক পার্থক্য অন্বেষণ করা অনেকাংশেই অনর্থক। ওই আদিম তন্ত্রসাধনার উপর যেমন কৃত্রিমভাবে কখনো বৈদান্তিক আবার কখনো বৌদ্ধ চিন্তাধারা অধ্যস্ত হয়েছে তেমনি কৃত্রিমভাবেই সহজসাধনার উপরও আরোপিত হয়েছে প্রধানত বৌদ্ধ ধ্যানধারণা। ফলে, সহজিয়া সাহিত্য বৌদ্ধ-ধ্যানধারণায় যেন ভরপুর। তবুও এই বৌদ্ধধ্যানধারণা সহজ-সাধনার পক্ষেও বাহিক ও কৃত্রিম। এর একটা প্রমাণ হলো, ওই বৌদ্ধ-ধ্যানধারণা যেমন অনায়াসে সহজ-সাধনার উপর অধ্যস্ত হয়েছে তেমনি অনায়াসেই অ-বৌদ্ধ ধ্যানধারণাও এর উপর অধ্যস্ত হতে পারে। উদাহরণ হিসাবে অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত সহজিয়া সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব সংস্করণের কথা বলেছেন। কিংবা ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্তের বই থেকেই এ-বিষয়ে একটি আরো চিত্তাকর্ষক দৃষ্টান্ত উদ্ধত করা যায়। তিনি বলছেন(৬৫১), বৌদ্ধ-সহজিয়াদের কোনো কোনো পুঁথির মতোই বৈষ্ণব-সহজিয়াদের কোনো কোনো পুঁথিতে দেখা যায় রচনাভঙ্গিটা শিবোক্ত শাস্ত্রের মতোই—অর্থাৎ, শাক্ত ও শৈবদের তন্ত্র যে-রকম শিব ও শক্তির কথোপকথনরূপে রচিত, বৈষ্ণব সহজিয়াদের কোনো কোনো পুঁথিও সেই রকমই শিব ও শক্তির কথোপকথন হিসেবেই রচিত। তাছাড়া, আনন্দ-ভৈরবে(৬৫২) লেখা আছে, শিব বা হর তার বিভিন্ন শক্তিদের সঙ্গে কুচনীদের দেশে (অর্থাৎ, নারীপ্রধান কোচ্-ট্রাইবের দেশে) এই সহজিয়া পদ্ধতিতে সাধনা করেছিলেন :
