আমরা ইতিপূর্বে কৃষিকেন্দ্রিক আদিম বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানের আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি। সহজিয়া-সম্প্রদায়ের মূল তত্ত্বগুলির বিচার করেও সেই নির্দিষ্ট বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানের পরিচয় পাওয়া যায় কি না তা একটু পরেই দেখবো। কিন্তু তার আগে আমরা এটুকু বলে নিতে চাই, মহামহোপাধ্যায়ের নিজের রচনাতেই এমন ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায় যে-ইঙ্গিত অনুসারে সমাজবিকাশের পিছনদিককার পর্যায়ে আটকে পড়ে থাকা মানুষদের মধ্যেই এই বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের স্পষ্টতর স্বাক্ষর খুঁজে পাওয়া সম্ভবপর।
মহামহোপাধ্যায়(৬৩৯) প্রশ্ন তুলছেন, বৌদ্ধধর্ম কোথায় গেল? উত্তরে তিনি করছেন, প্রধানত মুসলমান আক্রমণের দরুনই বাংলাদেশ থেকে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়। কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি। উড়িষ্যার জঙ্গলে, চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে আজো ওই বৌদ্ধধর্মের (অর্থাৎ মহামহোপাধ্যায় যাকে অধঃপতিত বৌদ্ধধর্ম বলছেন তার) জীবন্ত নিদর্শন পাওয়া যায়। এই অঞ্চলগুলি যে প্রধানতই দেশের পিছিয়ে-পড়া মানুষদের অঞ্চল সে-কথা প্রমাণ করবার প্রয়োজন নেই। কেবল প্রশ্ন হলো, মহামহোপাধ্যায় যে-সব ধ্যানধারণাকে অধঃপতিত বৌদ্ধধর্মের পরিচায়ক বলে অনুমান করছেন সেগুলি টিকে থাকবার মতো স্বাভাবিক জমি কেন এই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের মানুষদের মধ্যেই পেলে? এইদিক থেকেও, ওই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের সঙ্গে এ-জাতীয় ধ্যানধারণার একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক অনুমান করা সঙ্গত নয় কি?
শুধু তাই নয়, ওই সহজিয়া সম্প্রদায়ের আলোচনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়(৬৪০) বলছেন, এ-জাতীয় সম্প্রদায় একটি নয়, বহু। পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে নানান নামের অন্তরালে মূলত এই একই সম্প্রদায়কে টিকে থাকতে দেখা যায় : কর্তাভজা, বাউল, বৈষ্ণব এবং আরো অনেক নাম। এবং শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬৪১) এই জাতীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে তত্ত্বগত সাদৃশ্যের প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন : “সহজিয়া, বৈষ্ণব, শৈব, কিশোরীভজা, কর্তাভজা, পরকীয়া সাধনা—সবই রিরংসার উপর প্রতিষ্ঠাপিত।” এবং আমাদের যুক্তি অনুসারে এই জাতীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা, উক্ত ধ্যানধারণার উৎসে যদি কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠানই বর্তমান থাকে এবং যদি বাংলা দেশের কৃষকদের উৎপাদন-পদ্ধতিতে খুব বড়ো রকমের মৌলিক উন্নতি দেখা না দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের নানান দলের চেতনায় উক্ত ধ্যানধারণাগুলির প্রভাব নানান নামে প্রতিভাত হওয়াই সম্ভব এবং স্বাভাবিক।
অবশ্যই অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন নিজেও এই সহজিয়া সম্প্রদায়কে বৌদ্ধধর্মেরই স্মারক বলে গ্রহণ করতে চান। তবুও তাকে স্বীকার(৬৪২) করতে
হচ্ছে যে, আধুনিক বিদ্বানদের এই সিদ্ধান্তটি সহজিয়াদের নিজেদের কাছে অজ্ঞাত :
The Sahajias would by no means confess that they were Buddhists, nor refer to any Buddhist texts which would make it far easier to trace the doctrines to their genuine origin…… It is the duty of a historian and scholar to thrash out grains from the chaff and find out the true Buddhist elements in their views and practices.
অর্থাৎ, সহজিয়ারা কিছুতেই স্বীকার করবে না যে তারা আসলে বৌদ্ধ। তার কোনো বৌদ্ধ গ্রন্থেরও উল্লেখ করবে না—তাহলে তাদের মতের প্রকৃত উৎস খুঁজে পাওয়া সহজ হতো।…ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানের কর্তব্য হলো, ধানকুটে চাল বের করবার মতো করেই সহজিয়াদের মতবাদ ও আচার-অনুষ্ঠান থেকে প্রকৃত বৌদ্ধধর্মের অঙ্গগুলিকে খুঁজে বের করা।
ধান কুটে চাল বের করা। আমাদের যুক্তিও ঠিক তাই। কেবল কোন্টে চাল আর কোন্টে তুষ—এই নিয়ে তফাত। আমরা বলতে চাইছি, ওই বৌদ্ধধর্মের অঙ্গগুলিই তুষের মতো—সহজিয়ার স্বরূপ নির্ণয় করতে হলে এই তুষই বাদ দিতে হবে।
বাদ দিলে কী পড়ে থাকে? কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠান।
অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন সহজিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদ ও আচারঅনুষ্ঠানকে ভালো করে বিশ্লেষণ করবার কথা বলছেন। তাঁর এই নির্দেশ মেনেই অগ্রসর হওয়া যাক।
প্রথম প্রশ্ন হলো, এই প্রসঙ্গে সহজ শব্দটির মানে কী? ডক্টর শশীভূষণ দাসগুপ্ত(৬৪৩) বলছেন :
The word Sahaja’ literally means that which is born or which originates with the birth or origination of any entity.
সহজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো, যা জন্মেছে বা যা একটা কিছুর জন্মের সঙ্গে উৎপন্ন হয়।
অবশ্যই অধ্যাপক দাসগুপ্ত বৌদ্ধধর্মের আলোয় এই অর্থটিরও একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি, তন্ত্র কথাটির শব্দার্থের পিছনেও এই জাতীয় একটা ইঙ্গিতই খুঁজে পাওয়া যায়। ইঙ্গিতটা হলো, প্রজনন ও উৎপাদন পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত—কিংবা প্রজননের অনুকরণেই উৎপাদনকে আয়ত্তে আনবার পরিকল্পনা। ‘সহ-জ’ কথাটির মধ্যেও ওই একই ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যায় না কি? এবং এই ইঙ্গিত থেকে কৃষিকেন্দ্রিক আদিম জাদুবিশ্বাসই অনুমান করা সম্ভব নয় কি?
যদি কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠানই এই সাধনপদ্ধতির উৎস হয় তাহলে সহজিয়াদের ধ্যানধারণা ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে নারীপ্রাধান্যের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া উচিত। এবং তা পাওয়া যায়।
