শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬২৩) বলছেন,
দুই চারিজন বিশেষজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদ বলিয়া থাকেন যে, তন্ত্রধর্ম বৈদিক ধর্মের মতন পুরাতন এবং সনাতন।
অবশ্যই এই কথার ব্যাখ্যা হিসেবে উক্ত প্রত্নতত্ত্ববিদেরা যা অনুমান করছেন তা স্বীকারযোগ্য কিনা সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে :
এই সকল প্রত্নতত্ত্ববিদ্দিগের বিশ্বাস যে, শ্বেতাঙ্গ আর্যদিগের উদ্ভবের সময়ে অপেক্ষাকৃত কৃষ্ণাঙ্গ আর্যও একদল ছিল। বেদে কৃষ্ণাঙ্গ আর্যদিগের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইহারা ইরান বা পারস্য দেশ হইতে বাহির হইয়া বর্তমান কাবুলের উত্তর উপত্যকা বাহিয়া, তাগ্লা-মাকান অধিত্যকা হইতে কাশ্মীরে নামিয়া ভারতবর্ষে আসিয়াছিল; পরে কাশ্মীর হইতে পার্বত্য প্রদেশ বাহিয়া বঙ্গদেশ পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। অন্যদিকে গান্ধার সুবান্তু হইয়া লাট ও মহারাষ্ট্র প্রদেশ পর্য্নত ইহাদের বিস্তার ঘটিয়াছিল। ইহারাই নাকি ভারতবর্ষে তন্ত্রধর্ম আনয়ন করে…(৬২৭)
উত্তরকালের উন্নততর ঐতিহাসিক গবেষণার ফলে ওই শ্বেতাঙ্গ আর্যদের কপালেই অনেক বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে; তথাকথিত কৃষ্ণাঙ্গ আর্যগুলির ভারতবর্ষে আগমন-কাহিনীর পক্ষে ঐতিহাসিক সত্যের সম্ভাবনা অবশ্যই আরো সংকীর্ণ। তাছাড়া, দেশান্তরে শাক্ত ধ্যানধারণার বা তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের কোনো নিদর্শন পেলেই তা কোন পথে এ-দেশে এসেছিলো সে-কথা কল্পনা করবার প্রয়োজনও সত্যিই নেই। তার মানে এই নয় যে, প্রাচীন পৃথিবীতে দেশ থেকে দেশান্তরে ধর্মবিশ্বাস বা আচার-অনুষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানিটা একান্তই অসম্ভব ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তা ঘটেছিলো। আমাদের মন্তব্য শুধু এই যে, তাছাড়াও বিভিন্ন দেশে সমান্তরালভাবে, এবং অতএব পরম্পরের উপর প্রভাব-নিরপেক্ষভাবেই, একই বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের উদ্ভব হওয়া অসম্ভব নয়। কেননা, মানববিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের বাস্তব ভিত্তি আছে; সে-ভিত্তি শেষ পর্যন্ত মানুষের উৎপাটন-কৌশল : সমতুল্য পরিবেশে এবং সমতুল্য হাতিয়ারের উপর নির্ভর করে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষ পরস্পরের উপর প্রত্যক্ষ-প্রভাব নিরপেক্ষভাবে প্রকৃতির রহস্যকে মোটের উপর একইভাবে বোঝবার আয়োজন করতে পারে।
আমাদের এই মন্তব্যের পক্ষে জীবন্ত প্রমাণ হলো পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়ে-থাকা মানুষগুলি। এদের মধ্যে যারা আজো কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে রয়েছে তাদের ধ্যানধারণা আর আচার-অনুষ্ঠান অন্তত কাঠামোর দিক থেকে একই রকম। এ-বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বেই প্রাসঙ্গিক তথ্য উদ্ধৃত করেছি। এবং আমরা আরো দেখেছি যে, প্রাচীন মানুষদের মধ্যে যারা কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো তাদের প্রত্নতত্ত্বমূলক ও অন্যান্য কীর্তিগুলি থেকেও একই বিশ্বাস, একই ধ্যানধারণা অনুমান করা অসঙ্গত নয়। অথচ, আজকের পৃথিবীতে নানান জায়গায় যে-সব মানবদল ওই রকমের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে আটকে রয়েছে তাদের ধ্যানধারণার উপর পরস্পরের প্রত্যক্ষ প্রভাব অনুমান করা যে-রকম অসঙ্গত, সেই রকমই অসঙ্গত হলো তাদের উপর বিলুপ্ত পৃথিবীর মানুষদের ধ্যানধারণার প্রত্যক্ষ প্রভাব অনুমান করবার প্রচেষ্টা।
অতএব, কোনো সুদূর অতীতে পারস্যে বা মধ্য এসিয়ার কোথাও যদি তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় তাহলেই এ-কথা অনুমান করবার তাগিদ নেই যে, বাংলার তান্ত্রিক বিশ্বাসও সেখান থেকেই আসতে বাধ্য(৬২৮)। একই পরিবেশে উভয় দেশের মানুষই প্রকৃতির সঙ্গে একইভাবে বুঝতে গিয়ে একই কথা চিন্তা করতে পারে। যে-কারণে, আজকের পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যেও আমরা এই তান্ত্রিক ধ্যানধারণ আর আচার-অনুষ্ঠানের নিদর্শন পেয়ে থাকি।
পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের কথা উঠলো বলেই এখানে কাল-নির্ণয় প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য অবান্তর হবে না। তন্ত্রের কাল-নির্ণয় শুধুমাত্র সনতারিখের ব্যাপার হতে পারে না। কিংবা, সনতারিখের সাহায্যে তন্ত্রের কাল-নির্ণয় প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত অনেকাংশেই ভ্রান্ত হবার ভয়। তার কারণ, বিভিন্ন মানবদলের অসমান উন্নতি। এই অসমান উন্নতির ফলে পৃথিবীর নানান মানবদল উন্নতির নানান পর্যায়ে আটকে পড়ে আছে; যার আজো কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে আসতে পারেনি তাদের দিক থেকে বিচার করলে তন্ত্র কোনো আদিম কালের ব্যাপার নয়, সাম্প্রতিক— এমনকি সমসাময়িক—বিশ্বাস ও সাধনপদ্ধতি। আবার যারা সহস্ৰ বছর আগে কৃষিবিদ্যার ওই প্রাথমিক পর্যায়টিকে পিছনে ফেলে এসেছে তাদের দিক থেকে বিচার করলে তন্ত্র সহস্র বছরের পুরোনো বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান।
অবশ্যই, সামগ্রিকভাবে এই কৃষিকাজই ভারতীয় অর্থনীতির প্রধানতম অঙ্গ এবং আমরা আগেই দেখেছি, এ-দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলো বলেই কৃষিবিজ্ঞার প্রাথমিক পর্যায়ের নানান অঙ্গ উত্তরযুগেও আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়নি। অতএব, আধুনিক যুগেও আমাদের দেশে ওই প্রাচীন পর্যায়ের ধ্যানধারণাগুলির এমন ব্যাপক ও গভীর প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।
কিন্তু সেই সঙ্গেই মনে রাখা দরকার যে, উত্তরকালে—বিশেষত লিখিত পুঁথিপত্রের মাধ্যমে,—তান্ত্রিক বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান হিসেবে যার পরিচয় পাওয়া যায় তাকেই তন্ত্রের আদি ও অকৃত্রিম রূপ মনে করলে ভুল হবে। শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬২৯) বলছেন, “এখন যে ভাবে যে-সকল তন্ত্রগ্রন্থ এদেশে প্রচলিত আছে, তাহা হইতে তত্ত্বকথা খুঁজিয়া বাহির করা বড়ই কঠিন।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার কারণ কী?
