এবার এই প্রশ্নগুলির আলোচনা করা দরকার।
ইতিপূর্বে অনেকেই তন্ত্রের অর্থ-নির্ণয় করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে কথাটির সবচেয়ে সরল শব্দার্থের প্রতি উপযুক্ত মনোযোগ দেবার ইচ্ছা সবসময় চোখে পড়ে না। তার কারণ, তন্ত্রকে কোনো গূঢ় অধ্যাত্মবিদ্যা বলে ধরে নিয়ে অগ্রসর হলে ওই সরল শব্দার্থটির দিক থেকে তার উপর আলোকপাত হবার সম্ভাবনা থাকে না। অথচ, আমরা তন্ত্রের আদিরূপকে যে-অর্থে গ্রহণ করতে চাই তার সঙ্গে এই সরল শব্দার্থের সঙ্গতি অস্পষ্ট নয়।
তন্ ধাতুর উপর ষ্ট্রন্ প্রত্যয় করে তন্ত্র। তনোতি তন্যতে বা তন্ ষ্ট্রন্। তন্ ধাতুর অর্থ বিস্তৃত করা। বংশ-বিস্তার এর একটি মুখ্য অর্থ : তন্+আয়ট্=তনয়; সম্+তন্+ঘঞ=সন্তান। মনিয়ার উইলিয়ম্স্ দেখাচ্ছেন, পুরোনো পুঁথিপত্রে তন্ত্রের প্রজননার্থক ব্যবহার বিরল নয়। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে ‘কুলস্য তন্ত্র’ শব্দ পাওয়া যায়; মনিয়ার উইলিয়ম্স্-এর মতে তার অর্থ হলো the principal action in keeping up a family, i.e., propagation। কাত্যায়নের শ্রৌতসূত্রে, আপস্তম্বর ধর্মসূত্রে ও তৈত্তিরীয় উপনিষদে নিম্নোক্ত অর্থে তন্ত্র শব্দের ব্যবহার হয়েছে : any one propagating his family in regular succession। মহাভারতে কুলতন্তুর অর্থ হলো propagating the succession of a family, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তন্তুকর্ত্রীর অর্থ line of descendants(৬২০)।
কিন্তু শুধু প্রজননই নয়। তন্ত্রের আক্ষরিক অর্থের মধ্যে খাদ্যাদি-উৎপাদনের ইঙ্গিতও খুঁজে পাওয়া যায়। তন্ত্রি কুটুম্বধারণে ঘঞ্। কুটুম্বকৃত্য=কুটুম্বদিগের ভরণাদি কার্য(৬২১)। স্বভাবতই, খাদ্যাদি-উৎপাদনই এই কার্যের মধ্যে অন্যতম। তাহলে, তন্ ধাতুর অর্থ যে বিস্তৃত করা তা শস্য-উৎপাদনবৃদ্ধিও বোঝাতে পারে। গৌণ (?) অর্থ হিসেবে তন্ত্র বলতে তাঁত বোঝায় : কৃষিবিদ্যার পাশাপাশি এই বয়নকর্মও মেয়েদেরই আবিষ্কার এবং তা কৃষিরই আনুষঙ্গিক আবিষ্কার(৬২২)।
তন্ত্রের আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠানের মধ্যেই তন্ত্রের উৎস সে-অনুষ্ঠানের পিছনে মূল বিশ্বাস হলো মানবীয় প্রজননের সাহায্যে প্রকৃতির ফলপ্রসূতা-বৃদ্ধি। অতএব, তন্ত্রের এই জাতীয় শব্দার্থের সঙ্গে আমাদের উক্ত বিশ্লেষণের সঙ্গতি পাওয়া যায়।
তন্ত্র কতোদিনের পুরোনো? তান্ত্রিক পুঁথিপত্রগুলির সনতারিখ অনুসন্ধান করে অনেকে এই প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন। এবং এইদিক থেকে অগ্রসর হয়ে অনেকে সিদ্ধান্তে আসতে চাইছেন যে, ষষ্ঠ বা সপ্তম খৃষ্টাব্দে তন্ত্রের জন্ম(৬২৩)। আমরা বলতে চাই, এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রথমত, তান্ত্রিক গ্রন্থগুলি অবশ্য প্রায়ই অর্বাচীন। এই অর্বাচীনতা যে কতোখানি চূড়ান্ত হতে পারে তার দৃষ্টান্ত(৬২৪) উদ্ধৃত করা যায় :
এদেশে মহানির্বাণতন্ত্র সর্বত্র বিশেষ আদৃত। কিন্তু অনেক স্থলে প্রবাদ প্রচলিত যে, মহাত্মা রামমোহন রায়ের গুরু এই তন্ত্রখানি রচনা করেন। শক্তিরত্নাকরে বৃহন্নির্বাণতন্ত্রের উল্লেখ আছে, কিন্তু নিতান্ত আধুনিক প্রাণতোষিণী ব্যতীত কোন প্রাচীন বা আধুনিক তন্ত্রসংগ্রহে মহানির্বাণতন্ত্রের উল্লেখ না থাকায়, ইহার আধুনিকত্বই প্রতিপন্ন হয়। আবার মেরুতন্ত্ৰে লণ্ড্রজ, ইঙ্গ্রেজ ইত্যাদি শব্দদ্বারা ভারতে ইংরেজাগমনের পর যে ওই তন্ত্র রচিত হইয়াছে তাহাই প্রতিপন্ন হইতেছে।
অতএব, তন্ত্রের লিখিত গ্রন্থগুলি কতো পুরোনো তার হিসেবের উপর নির্ভর করেই তন্ত্রের প্রাচীনত্ব নিরূপণ করা চলে না। অপরপক্ষে, আধুনিক গবেষকদের মধ্যে অনেকেই স্বীকার করছেন যে, এই তান্ত্রিক গ্রন্থাবলীর সনতারিখ যাই হোক না কেন, তান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও আচার-অনুষ্ঠান সেই সনতারিখের তুলনায় অনেক প্রাচীন। এখানে, সে-জাতীয় কয়েকটি মন্তব্য উদ্ধৃত করা যায়।
Their date, however, it is impossible to determine with any precision. The existing treatises are probably for the most part at least reproductions with additions and variations of older works which are no longer extant. In their present form they are usually ascribed to the 6th. or 7th. cen. of our era, but they may be considerably later. Tantrik usages and popular formulas were current and practised in a much earlier age; they belong to a type of thought that is primitive and among primitive peoples varies little in course of the centuries(৬২৫).
এগুলির তারিখ সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। আজকাল যে-রচনাগুলি পাওয়া যায় সেগুলি খুব সম্ভব বিলুপ্ত ও প্রাচীনতর গ্রন্থেরই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ। বর্তমানে এগুলিকে যে-রূপে পাওয়া যায় সাধারণত তার তারিখ ধরা হয় ৬ষ্ঠ বা ৭ম খৃস্টাব্দ; এগুলি আরো পরের যুগের হতে পারে। কিন্তু ঢের পুরোনো যুগ থেকেই তান্ত্রিক অনুষ্টান ও মন্ত্রাদি প্রচলিত ছিলো; এগুলি আদিম চিন্তাধারার পরিচায়ক এবং আদিম মা্নুষদের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী উত্তীর্ণ হয়েও এ-জাতীয় চিন্তাধারায় পরিবর্তন সামান্যই ঘটে থাকে।
