প্রথমত, আমরা আগেই বলেছি, যে-মূর্ত পরিস্থিতিতে এ-জাতীয় বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানের উদ্ভব, সেই পরিস্থিতি থেকে উৎপাটিত হয়ে উত্তরকালের পরিস্থিতিতেও টিকে থাকবার সময় এই বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানগুলির আদি-তাৎপর্য অনিবার্যভাবেই বিপরীতে পর্যবসিত হয়েছে; যতোই কাল্পনিক আর অসম্ভব হোক না কেন, মানসিক উদ্দীপনার উৎস হিসেবে অতীতে (বা, পিছিয়ে-পড়ে থাকা মানুষদের জীবনে, বর্তমানেও) এই তন্ত্রই ছিলো জীবন-সংগ্রামের অঙ্গ, উৎপাদন কৌশলের সহায়ক। অথচ, উত্তরকালের ধর্মবিশ্বাস আর ধর্মানুষ্ঠান ছিসেবে টিকে থাকবার সময় এই তন্ত্রই আজ অর্থহীনতায় ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, উত্তরপর্যায়ে রচিত হয়েছে বলেই তান্ত্রিক পুঁথিপত্রগুলির মধ্যে উত্তরকালের অজস্র ধ্যানধারণা অনিবাৰ্যভাবেই প্রবেশলাভ করেছে। শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬৩০) যেমন বলছেন, “বাঙ্গালীকে ব্রাহ্মণ-শাসনাধীন করিতে পূৰ্ব্বকালের ব্রাহ্মণগণকে তান্ত্রিক এবং বৌদ্ধ ধর্মের সহিত অনেকটা আপোস করিতে হইয়াছিল।…আধুনিক তন্ত্রগ্রন্থে যে এই আপোসের নিদর্শন অতি সুস্পষ্ট, তাহা তন্ত্রের পাঠকমাত্রেই জানেন।” আপোসজনিত ধ্যানধারণাগুলি শুধুই যে বিজাতীয় তাই নয়; বহুলাংশে পরস্পর-বিরোধীও—কেননা, তা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধ্যানধারণা। বিজাতীয়, কেননা এই সব তান্ত্রিক পুঁথিপত্রে পূজা, উপাসনা, মোক্ষ, এমন কি ব্ৰহ্মজ্ঞানের কথাও এসে জুটেছে; অথচ, তান্ত্রিক দেহতত্ত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো যে, তন্ত্রের আদি-রূপটির সঙ্গে আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণার সঙ্গতি যে থাকতে পারে না, তা অনুমান করবার প্রভূত কারণ রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র বিজাতীয় ধ্যানধারণাই নয়, পরস্পরবিরোধী ধ্যানধারণাও। আর, তার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো হিন্দুতন্ত্র ও বৌদ্ধতন্ত্র উভয়ের চেয়েও অনেক প্রাচীন এবং উত্তরকালে হিন্দুধৰ্মমূলক ধারণা এবং বৌদ্ধধৰ্মমূলক ধারণ তন্ত্রের উপর প্রক্ষিপ্ত হয়েই যে তথাকথিত হিন্দুতন্ত্র এবং বৌদ্ধতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে,—একথা ইতিপূর্বে যোগ্য বিদ্বানেরা স্বীকার করেছেন। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৬৩১) বলছেন,
তন্ত্রসাহিত্য পড়িয়া যতদূর বুঝা যায়, তাহাতে ইহা মনে দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, তন্ত্রধর্মই বাংলার আদিম ধর্ম। …এখন কথা এই যে, বৌদ্ধতন্ত্রধর্ম অতি পুরাতন কোন মূল তান্ত্রিক ধর্মের বৌদ্ধ সমন্বয়, কি একেবারেই একটা নতুন ধর্ম, তাহা এখনও স্থির হয় নাই। আমার মনে হয়, একটা অতি পুরাতন তন্ত্রধর্ম এদেশে খুব প্রচলিত ছিল; বৌদ্ধধর্ম সেই ধর্মের সহিত মিশিয়া প্রবলতর আকার ধারণ করিয়াছিল। তন্ত্রের অধিকতর আলোচনা হইলে এ-প্রশ্নের মীমাংসা পরে হইবে।
পরে, তন্ত্রের অধিকতর আলোচনা করেই অধ্যাপক শশীভূষণ দাসগুপ্ত(৬৩২) পাঁচকড়িবাবুর ওই সিদ্ধাস্তকেই সমর্থন করতে চাইলেন :
Tantrism is neither Buddhist nor Hindu in origin. : it seems to be a religious undercurrent, originally independent of any abstruse metaphysical speculation, flowing on from an obscure point of time in the religious history of India. With these practices and yogic processes, which characterise Tantrism as a whole, different philosophical, or rather theological, systems got closely associated in different times…
কিংবা(৬৩৩),
Side by side with the commonly known theological speculations and religious practices, there has been flowing in India, an important religious undercurrent of esoteric yogic practices from a pretty old time; these esoteric practices, when associated with the theological speculations of the Saivas and the Saktas, have given rise to Saiva and Sakta Tantrism; when associated with the Buddhistic speculations, have given rise to the composite religious system of Buddhist Tantrism; and again, when associated with the speculations of Bengal Vaisnavism, the same esoteric practices have been responsible for the growth of the esoteric Vaisnavite cult, known as the Vaisnava Sahajia movement,
অতএব(৬৩৪)
The real origin of the cult lies more outside Buddhism than inside it.
অর্থাৎ সংক্ষেপে, উৎসের দিক থেকে তন্ত্র বৌদ্ধও নয়, হিন্দুও নয়। অতি প্রাচীন কাল থেকে তন্ত্র-সাধনার স্রোত এ-দেশে প্রবাহিত ছিলো। আদিতে তার সঙ্গে কোনো রকম জটিল দার্শনিক তত্ত্বের সম্পর্ক ছিলো না। সেই আচরণ ও যোগসাধনাই হলো সামগ্রিকভাবে তন্ত্রের প্রধান লক্ষণ। উত্তরযুগে তার সঙ্গে বিভিন্ন দার্শনিক কিংবা ধৰ্মমূলক মতবাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। কিংবা,
দেশে সাধারণভাবে যে-সব ধর্মবিশ্বাস ও সাধনপদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায় তার পাশাপাশি অনেক পুরোনো যুগ থেকে আর একরকম গুহ্য সাধনার ফল্গুস্রোত বয়ে চলেছে। এই গুহ্য সাধনার সঙ্গে শৈব ও শাক্ত মতবাদের সম্পর্ক ঘটে জন্ম হয়েছে শৈব বা শাক্ত তন্ত্রের; বৌদ্ধ চিন্তাধারার সম্পর্ক ঘটে জন্ম হয়েছে বৌদ্ধ তন্ত্রের; বাংলার বৈষ্ণবধর্মের সম্পর্ক ঘটে জন্ম হয়েছে বৈষ্ণব সহজিয়া আন্দোলনের।
