মোটের উপর এ-কথা মনে করা যায় যে, অনুষ্ঠানগুলির মূলে আছে মানুষ, পশু ও শস্যের উর্বরতা বাড়াবার কামনা। উদ্দেশ্যটা জাদুবিশ্বাস-মূলক; কিন্তু সে-জাদুবিশ্বাসের নানামুখী বিকাশের জট খোলা কঠিন : জাদু-অনুষ্ঠানগুলি কখনো সরাসরি উর্বরতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, কখনো বা উর্বরতা-বিরোধী কারণগুলির নিরসনপ্রচেষ্টায় নিযুক্ত। কোথাও আবার অনুষ্ঠানের পিছনে আরো বিশিষ্ট উদ্দেশ্য অনুমান করা যায় : যেমন বৃষ্টি-আনা, ঋতুকে আয়ত্ত করা, কোনো নির্দিষ্ট ফসল ফলানো।
আমাদের পক্ষে এখানে ওই মদনোৎসবের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করবার অবকাশ নেই; এ-উৎসব কোন প্রভাবের ফলে আধুনিক দোলোৎসবে পর্যবসিত হয়েছে তার আলোচনাও স্বতন্ত্র। আমাদের যুক্তির পক্ষে এখানে ছুটি কথা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, গুণরত্নের উক্তি থেকে অনুমান করা যায়, এজাতীয় কোনো উৎসবের সঙ্গে লোকায়তিকদের সম্পর্ক সত্যিই ছিলো। তাই ডক্টর দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী লোকায়তিকদের সঙ্গে মদনোৎসবের যে-সম্পর্ক অনুমান করেছেন তা অসঙ্গত নয়। কিন্তু তিনি এই সম্পর্কের যে-ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন তাও স্বীকারযোগ্য নয়। কেননা, এই মদনোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য অনুসন্ধান করবার বদলে তিনি একে আধুনিক অর্থে নিছক আমোদপ্রমোদ ও উচ্ছৃঙ্খলতার নিদর্শন বলে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। এবং এইখানেই আমাদের দ্বিতীয় বক্তব্যটির শুরু : মদনোৎসব বলে ওই প্রাচীন উৎসবটিকে আধুনিক অর্থে ভোগবাহুল্য বলে মনে করবার কোনো কারণ নেই। প্রাচীন মানুষদের কাছে এ-উৎসব জীবন-সংগ্রামেরই অঙ্গ ছিলো। এ-উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ হলো কামাচার বা বামাচার; তাকে আধুনিক অর্থে কামপরায়ণতা মনে করা ভুল হবে। কেননা, মনে রাখা দরকার, অর্ধ-অসহায় সেই মানুষেরা প্রাকৃতিক নিয়মকানুন বলতে যেটুকু বুঝেছিলো সে-বোধ অনুসারে মানুষের ফলপ্রসূত আর প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার মধ্যে সম্পর্ক আছে। তাই প্রজনন বা প্রজনন-সংক্রান্ত কোনো অনুষ্ঠানের সাহায্যেই তারা ওইভাবে প্রকৃতির ফলপ্রসূতাকেও আয়ত্তে আনবার চেষ্টা করেছে।
এই জাদুবিশ্বাসই যদি মদনোৎসবের প্রাণবস্তু হয় এবং এই মদনোৎসবের সঙ্গে যদি তান্ত্রিকাদি—তথা লোকায়তিক—ধ্যানধারণার যোগাযোগ থাকে, তাহলে একে কোনো একটা মতবাদের অবনত বা পতিত রূপ মনে করবার কারণ নেই। তার বদলে বরং এ-কথাই মনে করা স্বাভাবিক যে, এখানেই সে-ধ্যানধারণার আদিমতম ও প্রাকৃততম রূপটিকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তাই, কোনো একটা যুগে দেশগুদ্ধ, লোক লোকায়ত্ব মতবাদের মোহে পড়ে দেশটাকে একেবারে ব্যভিচারের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছিলো,–এমনতরো সিদ্ধান্ত অবশ্যই কাল্পনিক।
———————-
৬১২. D. R. Shastri SHIMSH 1-3.
৬১৩. প্রথমত, ডক্টর দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী এই পর্যায়-বিভাগের সমর্থনে বিশেষ কোনো তথ্য সত্যিই উল্লেখ করেননি, বা করতে সমর্থ হননি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “As the literature of this school is now entirely lost except what has reached us in fragments, we are quite unable to give here verbetim, all the original sutras of this school that represents its various aspetcs and phases. But there are passages both in sutra and sloka which embody in substance these different stages of the lohayata school (P. 2)”. কিন্তু সূত্র এবং শ্লোকলব্ধ তথ্য ঠিক কী এবং কী ভাবেই বা তা লেখকের পরিকল্পিত পর্যায়-বিভাগকে প্রমাণিত করে—এ-প্রশ্নের সদুত্তর সত্যিই তার গ্রন্থে পাওয়া যায় না। বরং তার পরিবর্তে কষ্ট-কল্পনা এবং পরস্পর-বিরোধী মন্তব্যেরই পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে সে-জাতীয় কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করাই পর্যাপ্ত হবে। যথা :
তথাকথিত প্রথম পর্যায়ের বর্ণনায় লেখক বলছেন,…”it was a mere tendency to opposition. It called in question all kinds of knowledge, immediate and mediate, and all evidence, perception as well as inference. In that period its name was Barhaspatya (P. I).” লেখকের মতেম যে-বৃহস্পতির নাম থেকে সম্প্রদায়টির প্রথম পর্যায়ের ওই নামকরণ হয়েছিলো তিনি ঐতিহাসিক ব্যক্তিই ছিলেন (P. 3 ) এবং ঋগ্বেদেই তার পরিচয় পাওয়া যায়—অর্থাৎ, ঋগ্বেদের বৃহস্পতিই এ-সম্প্রদায়ের আদিগুরু (P. 9 ) । যদি তাই হয় তাহলে নিশ্চয়ই আশা করা অন্যায় হবে না ষে, লোকায়ত-সম্প্রদায়ের প্রথম পর্যায়টির উপরোদ্ধৃত বর্ণনার সঙ্গে লেখক বৈদিক বৃহস্পতির কোনো যোগাযোগ—বা অন্তত যোগাযোগের কোনো ইংগিত—প্রদর্শন করবার চেষ্টা করবেন। কিন্তু লেখক তা করেননি। এবং ঋগ্বেদের বৃহস্পতি যে সত্যিই called in question all kinds of knowledge, immediate and mediate-এ কথা প্রতিপন্ন করার একান্তই অসম্ভব। অবশ্যই ডক্টর শাস্ত্রী বলছেন, ‘From the earliest Vedic times, there were people who denied the existence of even the Vedic deities. The Vedic hymns pointedly refer to scoffers and unbelievers ( P. 6-7).” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর সঙ্গে বৃহস্পতির সম্পর্ক কী ? বৈদিক সাহিত্যে কি এ-জাতীয় কোনো ইংগিত পাওয়া যায় যে, বৃহস্পতিই so scoffers and unbelievers-দের অগ্রগামী ছিলেন? নিশ্চয়ই তা যায় না। এমনকি ডক্টর শাস্ত্রী নিজেও সে-কথা দাবি করতে পারছেন না। তার বদলে ঋগ্বেদের বৃহস্পতি প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করছেন, “Some of the verses of the Vedic hymns ascribed to Brihaspati are very noble in thought. Whatever may be said of his followers, his own teachings were of an elevated character. Brihaspati had many followers and all of them were independent thinkers raising objections against the current superstitions. It is perhapes for his freedom of thought that he was regarded as the priest—the adviserthe counsellor of Indra, the king of the gods” (P.9). প্রথমত, এই উক্তির সঙ্গে পুর্বোদ্ধৃত উক্তিগুলির সঙ্গতি নেই। দ্বিতীয়ত, এই উক্তির বিভিন্ন অংশও তথ্য-প্রতিষ্ঠিত নয়। বৈদিক বৃহস্পতির যে সত্যিই বহু অনুগামী ছিলেন এবং তারা সকলেই যে স্বাধীন চিন্তাশীল ছিলেন ও সমসাময়িক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সকলেই যে আপত্তি তুলেছিলেন—এ-বিষয়ে লেখক কোনো প্রমাণই দেননি ; প্রমাণ দেওয়া নিশ্চয়ই সম্ভবও নয়। অতএব বক্তব্যগুলি নেহাতই লেখকের কল্পনাপ্রসূত। দ্বিতীয়ত, স্বাধীন চিন্তার গুণেই যে বৈদিক বৃহস্পতি দেবগুরু বলে স্বীকৃত হয়েছিলেন—এ-জাতীয় মন্তব্যের সমর্থনে অন্তত বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে কোনো তথ্যই খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ ডক্টর শাস্ত্রী লোকায়তর ইতিহাসের যে-স্তরবিভাগ করেছেন তা আগাগোড়াই এ জাতীয় ঐতিহাসিক তথ্য নিরপেক্ষ এবং একান্তই কাল্পনিক কয়েকটি theory-র উপর প্রতিষ্ঠিত।
৬১৪. R. Shastri op. cit. 35-6.
৬১৫. Ibid. 39.
৬১৬. Ibid. 36.
৬১৭. Ibid.
৬১৮. W. Crooke in Folk-lore xxv. “The Holi: a Vernal Festival of the Hindus.”
৬১৯. Ibid.
৩৭. তন্ত্রের অর্থ, প্রাচীনত্ব ও সম্প্রদায়-ভেদ
তন্ত্র মানে কী? তন্ত্র কতো প্রাচীন? হিন্দুতন্ত্রের সঙ্গে বৌদ্ধতন্ত্রের সম্পর্ক কী রকম?
