অথচ, কতো বড়ো একজন বিদ্বান কতো তুচ্ছ যুক্তি ও তথ্যের উপর নির্ভর করে কতোখানি কাল্পনিক এক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন— অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের উদ্ধৃত যুক্তিটি বোধ হয় তারই এক চূড়ান্ত নিদর্শন।
উপনিষদের উপাখ্যানটির ঠিক কী ইঙ্গিতের উপর নির্ভর করে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাইছেন?
প্রথমত, লোকায়ত হলো দেহতত্ত্ব, দেহাত্মবাদ। ছান্দোগ্যে বলা হয়েছে, এই দেহাত্মবাদ অসুরদের উপনিষৎ—বা প্রকৃত জ্ঞান। এই দেহাত্মবাদের দরুনই অসুরেরা মৃতদেহকে মাল্যগন্ধাদি ও বসন-অলঙ্কারে সুসজ্জিত করে। অসুর মানে হলো প্রাচীন সুমের-সভ্যতার মানুষ। এবং তাদের মধ্যেও এই জাতীয় সৎকার প্রণালীই প্রবর্তিত ছিলো। অতএব দেহাত্মবাদী ওই লোকায়তিক মতবাদ খুব সম্ভব প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা থেকেই আমদানি হয়েছিলো। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত(৬০১) অবশ্যই বলছেন :
The later Lokayatas or the Carvakas also believed that this body was the self, but the difference between them and the dehatmavadins referred to in the Chandogya is that they admitted “another world” where the bodies rose from the dead and prospered in the fine clothes, ornaments and food that were given-to the dead, body……This later on became sofar changed that it was argued that since the self and the body were identical and since the body was burnt after death,, there could not be any survival after death and hence there could not be anotherworld after death. .
পরের যুগের লোকায়ত বা চার্বাকরাও এই দেহকেই আত্মা মনে করেছে। কিন্তু ছান্দোগ্য-উপনিষদের দেহাত্মাবাদীদের সঙ্গে চার্বাকদের একটা তফাত আছে; ছান্দোগ্যের দেহাত্মাবাদীরা পরকাল মানে—সেই পরকালে মৃতদেহগুলির পুনরুজ্জীবন হবে এবং তখন তারা ওই বস্ত্র, অলঙ্কার, খাদ্য প্রভৃতি উপভোগ করবে। (ছান্দোগ্যের এই দেহাত্মবাদটা খুব সম্ভব প্রাচীন স্কুমেরীয়-সভ্যতা থেকে আমদানি হয়েছিলো)। কিন্তু উত্তর যুগে এই মতবাদটি এতোই পরিবর্তিত হলো যে, তর্ক করে বলা হলো, যেহেতু দেহই আত্মা এবং যেহেতু মৃত্যুর পর দেহ ভস্মীভূত হয় সেইহেতু মৃত্যুর পর আর কিছুই বাকি থাকে না এবং অতএব পরলোক বলেও কিছু নেই।
ছান্দোগ্যের ওই উপাখ্যানকে উপলক্ষ্য করে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত লোকায়ত-দর্শনের সুমেরীয় উৎস প্রসঙ্গে যে অত্যাশ্চর্য সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সেটিকে গ্রহণ করতে হলে অনেকগুলি কথা মেনে নেওয়া দরকার।
এক : বৈদিক সাহিত্যে অসুর বলতে প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার মানুষদেরই উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই; একমাত্র প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতাতেই মৃতদেহকে রতন-ভূষণ-খাদ্যের সম্ভার সহ কবর দেবার প্রথা ছিলো।
তিন : সুমেরীর সভ্যতার এই সৎকার প্রণালীর অন্তর্নিহিত দেহাত্মবাদই ক্রমশ লোকোত্তরে বিশ্বাস খুইয়ে ভারতীয় লোকায়ত দর্শনে পরিণত হয়।
দুঃখের বিষয়, এই তিনটি উক্তির একটিও ঐতিহাসিকভাবে সমর্থনযোগ্য হবে না।
প্রথমত, বৈদিক সাহিত্যে অসুর বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে তা আজো অনেকাংশে তর্কাধীন। এ-বিষয়ে প্রধানত দুটি মত পাই; কিন্তু সে-দুটির একটিও অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের সিদ্ধান্ত সমর্থন করবে না।
একটি মত(৬০২) হলো, অসুর শব্দে প্রাচীন আর্যভাষাভাষীদের ইরাণীয় শাখাটিকে বোঝানো হয়েছে। এই মতের সমর্থকদের যুক্তি হলো, বৈদিক সাহিত্যে অসুর শব্দটি বরাবরই হীনাৰ্থবাচক নয় : “পরো দেবেভিরসুরৈ যদস্তি” (ঋ. ১০.৮২.৫), “ইন্দ্রায় হি দৌরসুরো অনম্যত” (ঋ. ১.১৩১.১), “অপো নিষিঞ্চন্নসুরঃ পিতা নঃ” (ঋ, ৫.৮৩.৬), “মহস্পুত্রাসো অসুরস্য বীরা দিবো ধর্ত্তার উর্ব্বিয়া পরি খ্যন্” (ঋ. ১০.১০.২), ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই পরমাত্মা অসুরই আবেস্তায় অহুর বা অহুরমজদ রূপ ধারণ করিয়াছে।… অসুর শব্দের হীনার্থবাচিতার সহিত আবেস্তার ‘দএব’ অর্থাৎ দেব শব্দের হীনার্থবাচিতা তুলনীয়। আবেস্তায় ‘দএব’ শব্দের অর্থ দৈত্য, আমাদের অসুর। সম্ভবত ইরাণীয় ও ভারতীয় আর্যদিগের মধ্যে তীব্র ধর্মবিরোধের ফলেই সংস্কৃত ভাষায় অসুর এবং ইরাণীয় ভাষায় (আবেস্তার) ‘দএব’ (দেব) শব্দের অর্থ বিকৃতি ঘটিয়াছে(৬০৩)।
এই মতের সমর্থনে আরো বলা যায় যে, শতপথব্রাহ্মণ(৬০৪) অনুসারে অসুররাও প্রজাপতির পুত্র : দেবতাদের সঙ্গে পৃথিবীকে দখল করা নিয়ে তাদের ঘোর যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে তারা শেষ পর্যন্ত দেবতাদের কাছে পরাজিত হয়। ছান্দোগ্য-উপনিষদেও(৬০৫) বলা হয়েছে : দেবাসুর হ বৈ যত্র সংযেতির উভয়ে প্রাজাপত্যাঃ, ইত্যাদি। অর্থাৎ, দেব ও অসুর উভয়েই প্রজাপতির দুই সন্তান; উভয়ে পরস্পর যুদ্ধ করিয়াছিল। ইত্যাদি।
দ্বিতীয় মত হলো, আজো ছোটোনাগপুর অঞ্চলে অসুর নামের যে ট্রাইব টিকে আছে তারাই সম্ভবত বৈদিক সাহিত্যে উল্লেখিত অসুরদের বংশধর। এই মত অনুসারে, প্রাচীন যুগে ওই অসুর-ট্রাইবের মানুষের বৈদিক মানুষদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে ছোটনাগপুর অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে; তারপর তারা আবার কোলারিয়ান ও ড্রাভিডিয়ান ট্রাইবের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হবার যোগাড় হয়েছে :
