কিন্তু গুণরত্নের এই উক্তিকে অতোখানি সহজ-সরল অর্থে গ্রহণ করায় বাধা আছে। প্রথমে গুণরত্ন(৫৯৭) ঠিক কী বলছেন তাই দেখা যাক :
।। অথ লোকায়তমতম্।।
প্রথমম্ নাস্তিক স্বরূপমুচ্যতে। কাপালিকাঃ ভস্মোদ্ধুলনপরাঃ যোগিনঃ ব্রাহ্মণাদ্যস্ত্যজাতাশ্চ কেচন নাস্তিকা ভবন্তি। তে চ জীবপুণ্যপাপাদিকং ন মন্যন্তে। চতুর্ভূতাত্মকং জগদাচক্ষতে। কেচিত্তু চার্ব্বাকৈকদেশীয়া আকাশং পঞ্চমং ভূতমভিমন্যমানাঃ পঞ্চভূতাত্মকং জগদিতি নিগদন্তি। তন্মতে ভূতেভ্যো মদশক্তিবচ্চৈতন্যমুতূদ্যতে। জলবুদ্বুদবজ্জীবাঃ। চৈতন্যবিশিষ্টঃ কায়ঃ পুরুষঃ ইতি। তে চ মদ্যমাংসে ভুঞ্জতে মাত্রাদ্যগম্যাগমনমপিকুর্বতে। বর্ষে বর্ষে কস্মিন্নপি দিবসে সর্বে সংভূয় যথানামনির্গমং স্ত্রীভিরভিরমন্তে। ধর্মং কামাদপরং ন মন্যতে। তন্নামানি চার্ব্বাকাঃ লোকায়তাঃ ইত্যাদীনি। গলচর্ব অদনে। চর্ব্বয়ন্তি ভক্ষয়ন্তি তত্ত্বতঃ ন মন্যন্তে পুণ্যপাপাদিকং পরোক্ষং বস্তুজাতমিতি চার্ব্বাকাঃ। …লোকাঃ নির্ব্বিচারাঃ সামান্যাঃ লোকাস্তদ্বদাচরন্তি স্মেতি লোকায়তা লোকায়তিকা ইত্যপি। বৃহস্পতিপ্রণীতমতত্বেন বার্হস্পত্যাশ্চ ইতি।
অর্থাৎ,
অনন্তর লোকায়ত। প্রথমে নাস্তিকদের কথা। কাপালিক :–ভস্ম আচ্ছাদিত যোগীগণ এবং অন্ত্যজ ব্রাহ্মণাদি কেহ কেহ নাস্তিক। তাহারা জীবগণের পুণ্য পাপ প্রভৃতির বিচার করে না। তাহারা জগতকে চতুর্ভূতাত্মক বলিয়া মনে করে। চার্বাক প্রভৃতি মতাবলম্বীদিগের কেহ কেহ আকাশকে পঞ্চম ভূত রূপে ধরিয়া জগতকে পঞ্চভূতাত্মক বলিয়া থাকে। তাহাদের মতে চৈতন্য মদশক্তির ন্যায় আবির্ভূত হয়। জীবগণ জলবুদবুদ্ তুল্য। পুরুষ চৈতন্যবিশিষ্ট শরীরমাত্র। তাহারা মদ্যপান ও মাংস ভোজন করিয়া থাকে এবং মাতা প্রভৃতি অগম্য নারী প্রভৃতিতেও গমন করিয়া থাকে। প্রতি বৎসর কোনো একদিনে সকলে একত্র হইয়া যথাভিপ্রেত স্ত্রীগণের সহিত রমন করিয়া থাকে। কাম ব্যতীত ধর্ম নাই। এই জন্যই চার্বাকদিগকে লোকায়ত বলা হইয়া থাকে। পরোক্ষ বস্তুসমূহ হইতে জাত গলাধঃকরণ ও চর্বণ হেতুই চার্বাক বলা হইয়া থাকে। …নির্বিচারে সাধারণ লোকের ন্যায় আচরণ করে বলিয়াই তাহাদিগকে লোকায়ত বা লোকায়তিকও বলা হইয়া থাকে। তাহাদের মত বৃহস্পতি প্রণীত বলিয়াই তাহাদের বার্হস্পত্যও বলে।
গুণরত্বের কয়েকটি কথা বিচার করা যাক।
ওরা ‘সাধারণ মানুষের মতো’ ব্যবহার করে আর, সেই কারণেই ওদের বলা হয় লোকায়ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ হিসাবে আমরা জামাদের আশেপাশে, যাদের দেখি,—কিম্বা খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর লেখক গুণরত্ন তাঁর আশেপাশে যাদের দেখতেন,—তারা কি সত্যিই ওইভাবে মদ খায়, মাংস খায়, প্ৰমত্ত হয় অবাধ মৈথুনে? তারা কি সত্যিই বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে ওইভাবে অবাধ-মিলনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একত্র মিলিত হয়? নিশ্চয়ই নয়। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হলে, বছরের একটি বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনের উল্লেখ। যারা লম্পট তারা নিশ্চয়ই দিনক্ষণ বেছে লাম্পট্য করে না। অতএব, গুণরত্নের লেখায় একটি নির্দিষ্ট দিনের উল্লেখ থেকেই বোঝা যায়, লোকায়তিকদের এই বাৎসরিক সম্মেলনটা্র আসলে একটা আনুষ্ঠানিক তাৎপর্ষ—ritual significance—নিশ্চয়ই ছিলো। তাহলে গুণরত্বের ওই ‘সাধারণ মানুষ’ বলতে সত্যিই কি কোনো রকম অসাধারণ মানুষের দলকে বুঝতে হবে? তাও নয়। কেননা সমাজ-বিকাশের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে সাধারণ মানুষ বলতে বোঝায় এই রকম মানুষই। এবং তাদের এ-জাতীয় আচরণ যে লাম্পট্য নয়, এ-কথা আমরা ইতিপূর্বেই আলোচনা করেছি। তাই গুণরত্বের সাধারণ মানুষেরা সত্যিই সাধারণ মানুষ,—কেবল অনুন্নত পর্যায়ের সাধারণ মানুষ, কিংবা এমনতরো কৃষিজীবীদের দল যাদের মধ্যে ওই অনুন্নত পর্যায়ের স্মারক অত্যন্ত জোরালো। তাই মদ্য, মাংস ও মৈথুনের উপর তারা যে-গুরুত্ব আরোপ করে তাকে নিছক নীতিবোধের অভাব বা নীতিপরায়ণতা বলে অনুমান করা নিশ্চয়ই সঙ্গত নয়। অন্তত, ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তা যে একান্তই অসঙ্গত, এ-কথা নিশ্চয়ই অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের মতো ভারততত্ত্ববিদকে স্মরণ করিয়ে দেবার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, অন্যান্য নানা শাস্ত্রের মতোই তন্ত্ৰ-শাস্ত্রে তার জ্ঞান অত্যন্ত সুবিস্তীর্ণ(৫৯৮)। এবং যড়-দৰ্শন-সমুচ্চয়ে বর্ণিত লোকায়তিকদের সঙ্গে তান্ত্রিকদের সাদৃশ্য যে সত্যিই কতোখানি তার আর একটি নজির হিসেবে এখানে মণিভদ্রের টীকার উল্লেখ করা যায়। ষড়-দৰ্শন-সমুচ্চয়ের(৫৯৯) একটি শ্লোকে বলা হয়েছে : “পিব খাদ চ চারুলোচনে” —ইত্যাদি। টীকা-প্রসঙ্গে মণিভদ্র বলছেন, “পিবেতি অধরাদিপানং কুরু, খাদেতি ভোগা উপভুঙক্ষ্ব, ইতি কাম্যুপদেশ”। অতএব, এখানেও কামতত্ত্বের কথা—এবং এই কামতত্ত্ব অত্যন্ত প্রকটভাবে তান্ত্রিক ধ্যানধারণারই পরিচায়ক।
তাছাড়া, গুণরত্ন স্পষ্টভাষায় বলছেন, লোকায়তিকের গায়ে ভষ্ম মাখে, তারা যোগী, তারা কাপালিক।
অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত যদি এ-বিষয়ে সচেতন হতেন যে, এ-যুগেও আমাদের দেশে তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার এমন ব্যাপক ও গভীর প্রভাবকে শুধুমাত্র জাতীয় নীতিপরায়ণতা বলে ব্যাখ্যা করা চলে না এবং তিনি যদি গুণরত্ন-বণিত লোকায়তিক ও তান্ত্রিক ধ্যানধারণার মধ্যে আমন স্পষ্ট যোগাযোগকে একেবারে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা না করতেন তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর মতে বিদ্বানের পক্ষে লোকায়তের উৎস-সংক্রান্ত সমস্যার উপর অত্যন্ত মূল্যবান আলোকপাত করা সম্ভবপর হতো। কিন্তু হুঃখের বিষয় তাঁর মনে এ জাতীয় কোনো সমস্যাই জাগেনি। ব্যাপারটা আরো বেশি দুঃখের এই কারণে যে, তাঁর পূর্বগামী ভারততত্ত্ববিদ্দের মধ্যে অন্তত একজনের কাছে এই যোগাযোগটির কথা ধরা পড়েছে এবং এ-দিক থেকে যে অন্তত কিছুকিছু মৌলিক সমস্যা ওঠে তার পরিচয় তিনি দিয়ে গিয়েছেন। আমরা ইতিপূর্বে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মন্তব্য উদ্ধৃতি করেছি। সেই মন্তব্যগুলিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত লোকায়তের উৎস-প্রসঙ্গে যে-সিদ্ধান্তে উপনীত হবার চেষ্টা করছেন তা স্বভাবতই অত্যন্ত কৃত্রিম হয়ে দাঁড়িয়েছে(৬০০) :
