শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু তন্ত্রকে সমর্থন করতে চান। আর সেই কারণে আমাদের প্রস্তাবিত পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত পদ্ধতিই তিনি অনুসরণ করতে উদ্যত হয়েছেন—অর্থাৎ কিনা, পিছিয়ে-পড়া মানুষদের দিকে তাকাবার বদলে উন্নততর জাতিদের দোহাই দিয়ে তন্ত্রের মহিমা প্রচার করবার চেষ্টা করছেন(৫৭৭):
নরনারীর সঙ্গমটাকে জঘন্য ব্যাপার বলিয়া পরিচিত করিলেই, তাহার পর হইতে দুর্বল পুত্রকষ্ঠ উৎপন্ন হইবে, যথাশাস্ত্র বংশরক্ষা দুষ্কর হইবে। জর্মন মনীষিগণ এইটুকু বুঝিতে পারিয়াই গত কুড়ি বৎসর কাল জর্মনির চিকিৎসকগণ মৈথুনের সায়ান্স-সন্মত পদ্ধতি প্রকাশ্যভাবেই ব্যাখ্যা করিতেছেন।
…জর্মনির বিদ্বজ্জন সমাজে জীবসৃষ্টির পদ্ধতির ব্যাখ্যা লজ্জাজনক নহে। আমাদের দেশে যখন তন্ত্রধর্ম প্রবল ছিল, তখন মৈথুনটা গোপ্য, নিন্দনীয় ও জঘন্য ব্যাপার বলিয়া পরিচিত ছিল না। খৃষ্টানী বুদ্ধিতে এখন তন্ত্রের পঞ্চমকারের নিন্দা করিলে চলিবে কেন?
কোন উদ্দেশ্যে জর্মনিতে আধুনিক যুগে প্রজনন-তত্বের উপর অমন গুরুত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো এবং তার বাস্তব ফলাফলই বা কী হয়েছিলো—এ-আলোচনা অবশ্যই স্বতন্ত্র। আমাদের যুক্তির বর্তমান পর্যায়ে যে-কথাটুকু প্রাসঙ্গিক তা হলো, এইভাবে হাল-জর্মনির দোহাই দিয়ে তন্ত্রের মৈথুনকে সমর্থন করবার চেষ্টা অত্যন্ত প্রকটভাবেই কৃত্রিম। তার কারণ, তন্ত্র অতি প্রাচীন ব্যাপার— আমাদের দেশে এ-যুগে তার প্রভাব যতো গভীরই হয়ে থাকুক না কেন, সমাজ-বিকাশের এক অতি প্রাকৃত পর্যায়েই তার উৎস। বস্তুত, আমাদের আধুনিক সমাজ-বাস্তবের মধ্যে থেকে সেই প্রাকৃত সমাজ-বাস্তবের চিহ্ন অসমাপ্তভাবে বিলুপ্ত হয়েছে মাত্র; তাই তান্ত্রিক ধ্যানধারণা আজো আমাদের দেশে এতো ব্যাপক, এতো বিপুল প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। অতএব, সেই সুপ্রাচীন সমাজ-বাস্তবের দিক থেকেই তন্ত্রের তাৎপর্য অনুসন্ধান করতে হবে—তার বদলে আধুনিক ইউরোপীয় সমাজের নজির দেখিয়ে তন্ত্রের সমর্থন খোঁজবার চেষ্টাটা এ-যুগের বিদ্বানের পক্ষে তন্ত্রের প্রতি ভ্রান্ত অনুরাগের পরিচায়ক।
অতএব, আমরা আমাদের পদ্ধতি অনুসারে পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করে তন্ত্রের এই প্রধানতম মকারটির আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করবো।
আমরা ইতিপূর্বেই এ-বিষয়ে কিছু তথ্যের উল্লেখ করেছি। আমরা দেখেছি, কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকৃতির উর্বরা-শক্তির সঙ্গে মানবীর উর্বরা-শক্তির নিবিড় সাদৃশ্য ও এমন কি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ কল্পনা করা হয়েছে। ফলে, এই স্তরের চেতনায় প্রজনন ও ধনউৎপাদন—সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং ফসল ফলানো—দুটি সম্পর্কহীন ক্রিয়া নয়। অর্থাৎ, ওই অর্ধঅসহায় অবস্থায় মানুষেরা সন্তান লাভ সংক্রান্ত নানারকম ক্রিয়াকলাপের সাহায্যেই শস্য উদ্গমের আর শস্য-বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে, কিংবা, অপরপক্ষে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার নকল তুলে নিজেদের প্রজনন-প্রচেষ্টাকেও সফল করতে চেয়েছে।
এ-বিষয়ে রবার্ট ব্রিফন্ট সুবিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি দেখাচ্ছেন, শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করবার বদলে জমিতে চাষ দিয়ে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা শুরু হবার পর থেকে খাদ্য-উৎপাদন সংক্রান্ত জাদু-অনুষ্ঠানের মূল কামনা হলো পৃথিবীর উর্বরা-শক্তির বৃদ্ধি এবং সে-অনুষ্ঠানের মূল অঙ্গ হলো মৈথুন।
The belief that the sexual act assists the promotion of an abundant harvest of the earth’s fruits, and is indeed indispensable to secure it, is universal in the lower phases of culture.(৫৭৮)
সংস্কৃতির নিম্নতর পর্যায়ে সর্বত্রই এই বিশ্বাস দেখতে পাওয়া যায় যে, মৈথুনের সাহায্যেই পৃথিবীতে বহুল পরিমাণে ফসল ফলানো যাবে, এমন কি পৃথিবীতে ফসল ফলানোর ব্যাপারে মানুষের মৈথুন অনিবাৰ্যভাবে প্রয়োজন।
মধ্য-আমেরিকার আদিবাসীরা(৫৭৯) বীজ বপনের রাতে এবং বীজ বপনের ঠিক মুহূর্তটিতে ক্ষেতের উপর মৈথুন করবার উদ্দেশ্যেই কয়েকজনকে বিশেষভাবে নিয়োগ করে। মুসকোয়াকি নামের রেড্-ইণ্ডিয়ানদের(৫৮০) মধ্যে প্রথা হলো, বীজবপন উপলক্ষ্যে জনৈক যুবককে নির্বাচন করা হবে এবং তাকে একটি সঙ্গিনী দেওয়া হবে—সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য যুবকটি ক্ষেতে যাবে। পেরুভিয়ানরা(৫৮১) ফসল পাকবার আগে পর্যন্ত কঠিন আত্মসংযম করে থাকে; তারপর ফসলের দিন ঘনিয়ে এলে স্ত্রী-পুরুষেরা একত্র সমবেত হয়, সকলেই দেহাভরণ খুলে ফেলে একটি দৌড়-প্রতিযোগিতায় যোগ দেয়—এই প্রতিযোগিতায় যে-পুরুষ যে-নারীকে ধরতে পারবে তারই সঙ্গে মিলিত হবে। জাভা-দ্বীপে কিষাণ-কিষাণীরা ধান ক্ষেতের মধ্যে মিলিত হয়—তাদের ধারণায় এই হলো শস্যকে প্রচুর করবার কৌশল।
রবার্ট ব্রিফল্ট(৫৮৩) ও দেখাচ্ছেন, ফসল পাবার কামনায় এইভাবে প্রকাশ্যে মৈথুনে প্রবৃত্ত হবার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া নানান অঞ্চলেই চোখে পড়ে; তিনি চিলি, নিউমেস্কিকো, মেস্কিকো, নিকারাগুয়া প্রভৃতির উল্লেখ করছেন।
হাণ্টার-এর(৫৮৪) বর্ণনা অনুসারে রাজমহল-পৰ্বত অঞ্চলের আদিবাসীদের যেটা সবচেয়ে বড়ো পরব তা স্পষ্টই কৃষিকেন্দ্রিক; এ-উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ হলো স্ত্রীপুরুষের মধ্যে অবাধ মিলন। বস্তুত, পরবের সময়ে ওরা তরুণ-তরুণীর মিলনকে অনিবাৰ্যভাবেই প্রয়োজনীয় মনে করে।
