প্রাচীন সমাজে প্রজননের আয়োজনেই বিবাহ।
তাহলে, প্রাচীন মানুষদের ধারণায় মদ্যের ব্যবহার শুধুমাত্র মৃত্যুকে উত্তীর্ণ হবার আশায় নয়, নবজন্মের সাফল্য-কামনাতেও।
যদি দেখা যায়, এইভাবে একই বস্তু মৃত্যুকে উত্তীর্ণ হবার আশায় এবং প্রজননের সাফল্য-কামনায়—উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে সে-বস্তুটির তাৎপর্য কী হতে পারে? প্রাণ, জন্ম, নবজীবন। যে-জীবন চলে গিয়েছে তাকে ফিরে পাবার চেষ্টা। আর যে-জীবন কামনা করা হচ্ছে তাকে সুনিশ্চিতভাবে আয়ত্তে আনবার চেষ্টা। মদ্য সম্বন্ধে এই মনোভাবটির মূলে মানবদেহের উপর মদ্যের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার প্রভাব সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাটা নিশ্চয়ই ছিলো : মদ্যপানের ফলে যে সাময়িক উৎসাহ-উদ্দীপনাদি পাওয়া যায় তা সম্যকভাবে বিচার করা আদিম মানুষদের পক্ষে সম্ভবপর হয়নি; ফলে ব্যক্তিত্বের ওই সাময়িক পরিবর্তনকে তারা মানবদেহে স্বতন্ত্র প্রাণশক্তির পক্ষে ভর করবার লক্ষণ বলেই ভুল করতে পারে। এই প্রাণশক্তি পানীয়ের মধ্যে দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করছে। ফলে, আদিম বিশ্বাস অনুসারে ওই পানীয়ই প্রাণশক্তি।
খৃস্টানদের ধর্মপুঁথিতে মদ্যকে যীশুর রক্ত বলে যে-কল্পনা করা হয়েছে তাও এই আদিম বিশ্বাসেরই পরিণাম। প্রাচীন ধর্ম বিশ্বাসের নানান দৃষ্টান্তে দেখা যায়, দশায়-পাওয়া, দিব্যোন্মাদন, ঠাকুর-দেবতার ভর হওয়া প্রভৃতি নানান নামে যে-অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয় তার সঙ্গে মদ্যপানজনিত অবস্থার সাদৃশ্য রয়েছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে(৫৭৪) ধর্মানুষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত পুরোহিত মদ্যপান করতে বাধ্য। তার কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্ঠান থেকে এই জাতীয় ধর্মবিশ্বাসের জন্ম; এবং সেই জাদুঅনুষ্ঠানের মূল কথা হলো, জীবনীশক্তির স্পর্শে বা জীবনীশক্তির একটা নকলের সাহায্যে প্রকৃতির জননশক্তিকেও আয়ত্তে আনবার আয়োজন।
অতএব, আমাদের মূল যুক্তি যদি ঠিক হয়,–যদি ওই কৃষিভিত্তিক জাদু-অনুষ্ঠান থেকেই তান্ত্রিকাদি সাধনার জন্ম হয়,—তাহলে নিশ্চয়ই মদ্যপান বিনা সে-সাধনার সম্ভাবনা থাকে না। তন্ত্র বলছে : বিনা মদ্যং মহেশানি ন সিদ্ধন্তি কদাচন।
পঞ্চমকারের মধ্যে অন্যতম মকার বলতে মৈথুন। এই ‘ম’-কারটি যে তান্ত্রিক সাধনার প্রধানতম অঙ্গ তা প্রমাণ করবার জন্য বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। শুধু তাই নয়, তন্ত্রে যেহেতু মানবীয় ব্যাপারের উপমান হিসেবেই বিশ্বরহস্য উদঘাটন করবার চেষ্টা সেইহেতু তন্ত্রের বিশ্বরূপকল্পনাতেও(৫৭৫) এই মৈথুন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
অথচ আধুনিক রুচিবোধ এবং নীতিবোধের দিক থেকে তন্ত্রকে বিচার করতে গিয়ে আধুনিক বিদ্বানেরা এই ‘ম’-কারটি নিয়েই সবচেয়ে বিব্রত হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই বিষয়টির উল্লেখ করেই তন্ত্রকে অতি জঘন্য ও বিকৃত মনোভাবের পরিচায়ক বলে নিন্দা করে থাকেন। অপরের তন্ত্রকে সমর্থন করতে গিয়ে এই বিষয়টিকে হয় গোপন করতে চান বা কৃত্রিম ব্যাখ্যার সাহায্যে একে সমর্থন করতে চেষ্টা করেন।
প্রথমে এই রকম কয়েকটি উক্তি উদ্ধৃত করা যাক। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী(৫৭৬) বলছেন :
অন্যকথা খুলিয়া বলিতে গেলে সভ্যতার সীমা অতিক্রম করিতে হয়,—হয়তো পিনাল কোডের ধারায়ও পড়িতে হয়। তবে একটা কিছু না বলিলে নয়—তাই কয়েকটি নমুনা দিতেছি—
দ্বাদশাব্দিকাং কন্যাং চণ্ডালস্য মহাত্মন: ।
সেবয়েং সাধকে নিত্যং বিজনেষু বিশেষতঃ।।
মোট কথা এই যে,
দুষ্করৈৰ্নিয়মৈস্তীব্রৈঃ সেব্যমানে ন সিদ্ধতি।
সৰ্বকামোপভোগৈশ্চ সেবয়ংশ্চাণ্ড সিদ্ধতি।।
অর্থাৎ দুষ্কর কঠোর নিয়ম করিয়া সেবা করিলে কিছুতেই সিদ্ধিলাভ হয় না। সর্বপ্রকার কামোপভোগ করিয়া যদি সেবা করে—তাহা হইলে নিশ্চয় শীঘ্র সিদ্ধিলাভ হইবে।…
একজন ইউরোপীয় লেখক বলিয়াছেন—ভারতবর্ষের অধঃপতনের কারণ খুঁজিতে গেলে এই সকল জঘন্য বই ঘাঁটিতে হইবে। ভবিষ্যতে কোন হতভাগ্য পণ্ডিতের অদৃষ্টে যে সে দুর্ভোগ আছে তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু সে দুৰ্যোগ না ভুগিলেও এত বড় ধর্মটা–কেন যে অধঃপাতে গেল, তাহা তো বুঝা যায় না। তাই কাহাকেও না কাহাকেও একদিন সে দুর্ভোগ ভুগিতে হইবে। কিন্তু যে ভুগিবে সে সত্য সত্যই ভারতের একটা মহা উপকার সাধন করিয়া যাইবে। সে অন্তত বলিবে—“বাপু! এ পথে আর আসিও না—এ পথে আসিলে অধঃপতন অবধারিত”।
মহামহোপাধ্যায়ের মতে এই তন্ত্র হলো বৌদ্ধধর্মের অধঃপাতে-যাওয়ার পরিণাম। তাঁর ওই মত কতোখানি স্বীকারযোগ্য সে-আলোচনা পরে তোলা যাবে। আপাতত আমাদের প্রশ্ন হলো, তান্ত্রিক ধর্মের আধুনিক সংস্করণটি যতো বীভৎসই হোক না কেন—এই বীভৎসতাই তন্ত্রের আদিতাৎপর্য হতে পারে না। কেননা, শুধু বীভৎসতা, শুধু বিকৃতি এতে বড় একটা জাতকে, এতো শতাব্দী ধরে সত্যই এমনভাবে প্রভাবিত করে রাখতে পারে না। তাই প্রশ্ন ওঠে, সেই আদি-তাৎপর্য কী ছিলো? কেমনভাবে কোন পদ্ধতিতে, আমাদের পক্ষে তা অন্বেষণ করা সম্ভবপর? উত্তরটা মহামহোপাধ্যায়ের আশঙ্কা থেকেই অনুমান করা যেতে পারে : ‘খুলিয়া বলিতে গেলে সভ্যতার সীমা অতিক্রম করিতে হয়। বস্তুত আমাদের যুক্তিও ঠিক তাই-ই। তন্ত্রের আদি রহস্য বুঝতে হলে সভ্যতার সীমা অতিক্রম করে পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়ে থাকা অসভ্য মানুষদের আচার-অনুষ্ঠান ও বাস্তব বিশ্বাসকেই পরীক্ষা করতে হবে। তাতে নিশ্চয়ই তন্ত্রকে সমর্থন করবার যুক্তি পাওয়া যাবে না; কিন্তু তন্ত্রকে বুঝতে পারবার—ব্যাখ্যা করবার,—একটা উপায় হতে পারে। এবং তার সাহায্যে ‘ভারতবর্ষের অধঃপতনের কারণ’ বোঝা না গেলেও অনুন্নতির বা বাধাপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষণকে চিনতে পারা সম্ভব হবে।
