জয়পুর অঞ্চলে পাঞ্চাদের(৫৮৫) মধ্যে নববর্ষ উপলক্ষ্যে (ফসলের সময় থেকেই বর্ষারম্ভ; এবং আগেই প্রকাশ আমাদেরও আগে অগ্রহায়ণ থেকে বর্ষারম্ভ হতো) একমাস ধরে অবাধ যৌন-মিলনের উৎসব চলে।
এই উৎসবই চোখে পড়ে নিলগিরি পাহাড়ের কোটারদের(৫৮৬) মধ্যে। বলাই বাহুল্য, এ-জাতীয় উৎসব শুধু উৎসব নয়-গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানও। :
বাটলারের(৫৮৭) বর্ণনা অনুসারে আসামের ট্রাইবদের মধ্যে বসন্তোৎসবের সময়ে মেয়েরা পরিপূর্ণ যৌন-স্বাধীনতা পায় এবং উৎসবকালীন আচরণ নিয়ে পরে তাদের কোনো রকম সমালোচনা শুনতে হয় না, দুর্নাম কুড়োতে হয় না।
হড্সনের(৫৮৮) বর্ণনা অনুসারে দেখা যায়, মণিপুরের নাগা ট্রাইবদের মধ্যে একই উৎসব বা অনুষ্ঠান বর্তমান রয়েছে।
এ্যাণ্ডারসন(৫৮৯) তার বর্মা-অভিযান-এ উত্তর-বর্মার একটি উৎসবের বর্ণনা দিচ্ছেন; অন্যান্য জায়গায় প্রচলিত অবাধ মিলনোৎসবের সঙ্গে উত্তর-বর্মার এই উৎসবটির সাদৃশ্য অস্পষ্ট নয়।
কেবল এখানেও মনে রাখা দরকার, ইউরোপীয় পরিদর্শকদের চোখে যে-ঘটনা শুধুমাত্র উৎসব বলে মনে হয়েছে তা আধুনিক অর্থে উৎসব নয়। কেননা, আধুনিক অর্থে উৎসব বলতে প্রধানতই আমোদ-প্রমোদের ব্যাপার মনে হয়। অথচ, ওই প্রাচীন পর্যায়ের মানুষদের কাছে এর গুরুত্ব অসামান্য,— এমন কি এতে যোগ দেওয়ার পিছনে একটা কঠিন কর্তব্যপরায়ণতার চাপও আছে। তাই, একে উৎসব না বলে অনুষ্ঠান বলাই সঙ্গত-হয়তো ধর্মানুষ্ঠানই বলা যেতো, কিন্তু আমরা দেখাতে চাই যে, সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়ে এই জাতীয় অনুষ্ঠানের বিকাশ সে-পর্যায় প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ও প্রাক্-ধর্মানুষ্ঠানিক। তাই একে জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠান বলাই শ্রেয়—ধর্মের আগে জাদুবিশ্বাস এবং ধর্মের সঙ্গে জাদুবিশ্বাসের গুণগত বৈষম্য।
আসল কথা হলো, আমাদের পক্ষে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের ওই উৎসব বা অনুষ্ঠানের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে পারা খুব কঠিন। শুধু তাই নয় এর তাৎপর্যকে ভুল বোঝবার সম্ভাবনাই প্রচুর। কেননা, শুধুই যে আমরা জামাদের আধুনিক রুচিবোধ আর নীতিবোধের দিক থেকে এ-জাতীয় অনুষ্ঠানকে কদৰ্য নীতিপরায়ণতা বলে মনে করতে পারি তাই নয়, প্রাকৃতিক নিয়ম সংক্রাস্ত জ্ঞানের দিক থেকেও আমরা এতো বেশি এগিয়ে গিয়েছি যে, প্রাচীন মানুষদের ওই বিশ্বাসটিকে আমরা স্বভাবতই অবিশ্বাস্য রকমের কাল্পনিক বলে মনে করতে বাধ্য।
আসলে, প্রাচীন মানুষদেরও একটা কর্তব্যাকর্তব্য জ্ঞান আছে। এবং যেহেতু অন্ন লাভের উপরই ওদের পুরো দলের জীবনমরণ নির্ভর করছে সেইহেতু ওদের ধারণায়, অল্পকে বহু করবার জন্য অনিবাৰ্যভাবে প্রয়োজনীয় এই অনুষ্ঠানটিকে, তারা গুরুত্বপূর্ণকর্তব্য বলেই মনে করে। স্যর জেমস ফ্রেসার(৫৯০) যেমন বলছেন, মধ্য-আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে বীজবপন-উপলক্ষ্যে এই মৈথুন-অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যেরই অন্তর্গত—in default of which it was not lawful to sow the seeds, এ-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে বীজবপনের কাজটাই বেআইনী।
অর্থাৎ, এক-কথায়, প্রাচীন মানুষদের এই যে ভিন্ন-রুচি ও ভিন্ন-নীতি তার পিছনেও অত্যন্ত বাস্তব ও মূর্ত কারণ ছিলো। সেটা হলো, বাঁচবার ভাগিদ, কিংবা বাঁচবার পক্ষে সবচেয়ে প্রাথমিক যে প্রয়োজন—অন্ন—তারই তাগিদ। কেবল, এই মূর্ত তাগিদটিকে মেটাবার জন্যে তারা যে-অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর করতে চাইছে সেটা তাদের পার্থিব দারিদ্র্যের অনুরূপ জ্ঞানের দারিত্র্যেরই পরিণাম : তাদের ধারণায় উৎপাদনের একটা নকল তুলতে পারলেই প্রকৃতির উৎপাদন-বৃত্তিও আয়ত্তে আনা যাবে। সেটা ভুল, সেটা নিশ্চয়ই কল্পনামাত্র। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রাচীন সমাজের পটভূমিতে এবং প্রাচীন মানুষদের চেতনা অনুসারে অনুষ্ঠিত এই মৈথুন নিছক নীতিবোধের অভাব নির্ণায়ক। আসলে, তাদের কাছে এইটে হলো নীতিবোধেরই বিকাশ—কেবল তাদের এই নীতিবোধ তাদের অর্থনৈতিক উন্নতিরই অনুরূপ। অন্যান্য সমাজের মতো প্রাচীন সমাজের নীতিবোধও নিরালম্ব নয়—অর্থনৈতিক জীবনের উপর, ধনউৎপাদন-পদ্ধতির উপর তা নির্ভরশীল।
আমাদের যুক্তি হলো, তন্ত্রের ওই প্রধানতম মকারটি যে এতো বড়ো একটা দেশকে এতোদিন ধরে এমন গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছে, তার কারণ এর পিছনে একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস ছিলো। সে-ইতিহাসের আভাস পাওয়া যায় পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের পরীক্ষা করলে। মানবউন্নতির একটা বিশেষ স্তরে মৈথুন বলতে শুধুমাত্র রতিবাসনার চরিতার্থতা নয়, তার বদলে একরকম অনুষ্ঠান বিশেষ—এবং এ-অনুষ্ঠান সবচেয়ে মৌলিক অর্থনৈতিক চেষ্টারই অঙ্গ। আমাদের দেশের ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে এর স্মারক অমন প্রকটভাবে টিকে রয়েছে তার কারণ অর্থনৈতিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে আমাদের দেশের সমাজ-বাস্তব থেকে ওই প্রাচীন পর্যায়ের স্মারক মাত্র অসম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।
অবশ্যই, তন্ত্রে আজ আমরা অনুষ্ঠানটিকে যে-রূপে দেখতে পাই তার মধ্যে ওই প্রাচীন পর্যায়ের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য-সাধনের পরিচয় নেই; তন্ত্রে মৈথুন ধর্মানুষ্ঠানের অঙ্গ, উৎপাদন-পদ্ধতির অঙ্গ নয়। বস্তুত, ওই আদি-উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হবার ফলে আদিম প্রক্রিয়াটির পক্ষে ধর্মানুষ্ঠানে পরিণত হওয়াটা একটি স্বাভাবিক বা জাগতিক নিয়মেরই ফল। কেননা, ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মানুষ্ঠান হলো সেইসব আচার-বিচারেরই আধার, যেগুলি এককালে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করবার জোরেই—জীবনোপায়ের সহায়ক ছিলো বলেই— মানুষের চেতনায় এবং মানবসমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করতে পেরেছিলো। দৃষ্টান্ত-স্বরূপ এখানে বৈদিক যজ্ঞের উল্লেখ করা যায় : আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ অনুসারে যজ্ঞ এককালে দেবতাগণের কাছে অন্ন-লাভের উপায়মাত্র ছিলো এবং তা ছিলো বলেই বৈদিক মানুষদের জীবনে যজ্ঞের স্থান অমন অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরকালে, ওই অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যজ্ঞ পরিণত হলো নিছক ধর্মানুষ্ঠানে।
