আমাদের দেশে তথাকথিত নিচুশ্রেণীর মানুষদের মধ্যেও এই জাতীয় প্রথা দুর্লভ নয়। যেমন, মেথর ধোপা প্রভৃতির মধ্যে দেখা যায়, আত্মীয়বিয়োগ ঘটলে তারা তাড়ি বা ওই জাতীয় কোনো মদ প্রচুর পরিমাণে পান করে থাকে। সমাজের সদর মহলের মানুষ নয় বলেই এদের আচারঅনুষ্ঠানের মধ্যে সমাজ-বিকাশের পিছনকার পর্যায়ের অনেক কিছুই আজো অমনভাবে টিকে রয়েছে, তাই সেগুলিকে বিশ্লেষণ করলে পর আমাদের পূর্বপুরুষদের নানারকম দুর্বোধ্য বিশ্বাসের উপর আলোকপাত হতে পারে। ধোপা মেথরদের অনুষ্ঠান বিশ্লেষণ করে বৈদিক দেবতাদের বিশ্বাসকে বোঝাবার চেষ্টা অনেকের আত্মমর্যাদায় আটকাবে। কিন্তু সমাজ-বিকাশের যে পর্যায়ের ধ্যানধারণা মেথর প্রভৃতিদের মধ্যে আজো এইভাবে টিকে রয়েছে বৈদিক মানুষেরাও এককালে সেই পর্যায়ে জীবন যাপন করেছিলেন; তাই বৈদিক সাহিত্যে সেই পর্যায়ের বিশ্বাস খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে কেন?
ঋগ্বেদে(৫৭১) দেবতারা গাইছেন :
অমাম সোমম্ অমৃতা অভূম
—আমরা সোম পান করে অমৃতত্ব লাভ করেছি।
বৈদিকে ঋষিদের কাছে, মদ্য বলতে ওই সোমই। তাঁদের বিশ্বাস অনুসারে এই মদ্যের সাহায্যেই মৃত্যুকে উর্ত্তীর্ণ হয়ে অমৃতত্ত্ব লাভ করা যায়।
প্রাচীন পর্যায়ে আটকে-থাকা মানুষদের মধ্যেও তাই। তাই, মৃত্যুর অব্যবহিত পরে মদ্যের ব্যবহার, কবরের গায়ে গর্ত খুড়ে মৃতের উপর মদ্য ঢালবার আয়োজন, মদ্যপানরত আত্মীয়দের সঙ্গে সুতো বেঁধে কবরখানাকে সংযুক্ত করবার ব্যবস্থা—ইত্যাদি, ইত্যাদি। আজো আমাদের দেশে সাবেকি পদ্ধতিতে প্রস্তুত মদের নাম দেওয়া হয় মৃতসঞ্জীবনী।
প্রাচীন মানুষদের কল্পনায় মদ্য যদি মৃত্যুকে উত্তীর্ণ হবার,—মৃত্যুর স্পর্শ কাটিয়ে জীবনকে ফিরে পাবার,—এক রকম উপকরণ হয়, তাহলে বুঝতে হবে প্রাচীন মানুষদের কাছে মদ্যের তাৎপর্যটা অন্য রকমের ছিলো : মদ্যের বাস্তব গুণাগুণ বোঝবার মতো জ্ঞানের সঙ্গতি তাদের ছিলো না, থাকবার কথা নয়। মদ্যপানের দৈহিক ফলাফল সংক্রান্ত তাদের যেটুকু অভিজ্ঞতা সেটুকু হলো, সাময়িকভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা এমন কি শক্তি-সামর্থের বৃদ্ধি— অনেক সময় যেন মানুষটার প্রকৃতি বদলে গিয়ে নতুন মানুষে পরিণত হচ্ছে।
অতএব এই মদ্য নবজীবনের আধার, তরল জীবন–রক্তের মতো।
আর জীবন বলেই মদ্যের সাহায্যে মৃত্যুর স্পর্শকে উত্তীর্ণ হবার অতো রকম আয়োজন।
যদি তাই হয়, তাহলে মদ্যের ব্যবহার শুধুমাত্র মৃত্যু প্রসঙ্গেই হবার কথা নয়। জাদু-বিশ্বাস অনুসারে প্রাচীন মানুষের পক্ষে নবজাতককে পাবার— সন্তান-উৎপাদনের—সহায়ক হিসেবেও মদ্যের সংস্পর্শ মূল্যবান হবার কথা।
সাঁওতালদের সৃষ্টি-উপাখ্যানে(৫৭২) এই বিশ্বাসেরই ইংগিত পাওয়া যায়। আদি-নর এবং আদি-নারী গড়বার পর মরণ-বুরু দেখলে তাদের মধ্যে সন্তান-উৎপাদনের কোনো তাগিদ নেই। অতএব মরণ-বুরু তাদের মদ তৈরি করতে শেখালো—এই মদ পান করবার পরই তাদের মধ্যে প্রজননের উৎসাহ প্রথম দেখা দিলো, তারই ফলে সম্ভব হলো মনুষ্যজাতির আবির্ভাব।
প্রাচীন পর্যায়ে আটকে-থাকা মানুষদের মধ্যে দেখা যায়, যৌন-মিলনমূলক উৎসবের প্রধানতম অঙ্গ হলো মদ্যপান। আমরা আগেই দেখেছি, এবং পঞ্চমকারের মৈথুন-প্রসঙ্গে সে-কথার পুনরুল্লেখ করবো যে, এ-উৎসবের যৌন-মিলনকে আধুনিক সমাজের গণিকালয়ের আলোয় চিনতে গেলে খুবই ভূল হবে। কেননা সে-উৎসবের পিছনে মূল কথাটা হলো প্রকৃতিকে ফলপ্রস্থ করবার কামনা। তেমনি, ওই উৎসবের মদ্য-ব্যবহারকেও আধুনিক সমাজের সুঁড়িখানার আলোয় চিনতে গেলে ভুল করা হবে; কেননা, তার পিছনে মূল কথা হলো, ওই তরল প্রাণশক্তি ব্যবহারের সাহায্যেই প্রকৃতিতে নবজন্মের আয়োজন করা।
নবজন্মের কামনায় এই তরল জীবনীশক্তির ব্যবহার আজো মানবসমাজে কীভাবে টিকে রয়েছে তার কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায় দেশবিদেশের বিবাহ-অনুষ্ঠানকে বিশ্লেষণ করলে : বহু ক্ষেত্রেই বিবাহ-অনুষ্ঠানের একটি প্রধান অঙ্গ হলো মদ।
At Tipperah weddings the bride recives a glass of liquor from her mother. She takes this to the bridegroom, sits on his knee, and, after drinking some of the liquor, gives the rest to him. …Among the Nakri Kunbis of Thana, liquor is given to the pair when the wedding ceremony is completed. The girl relatives of the Khyoungtha bride bar the entrance to the village against the bridegroom with a bamboo. Across this he has to drink with them a loving cup of fraternity before he is allowed to enter. At weddings in Morocco the priest hands to the pair a cup of wine which he has blessed. … Among the Larkas, a cup of beer is given to each of the two parties; they mix the beer and then drink it. This completes the marriage. In the Moluccas, Japan, Bengal, Brazil, Russia, Scandinavia and many other districts of Europe, the bridal pair drinks, as the marriage ceremony or part of it, wine or beer from one vessel. At Beni-Israil weddings the bridegroom pours wine into the bride’s mouth. In Korea and China the pair drink wine from two cupo which are tied together by a red thread. In Christian countries the rite is separated from the ceremonial proper, but is carried out independently when the pair receive together the wine of the Communion, which is to be partaken of immediately or soon after the marriage itself. Among the Gonds, the respective fathers of the bridal pair drink together(৫৭৩).
অর্থাৎ, (সারমর্ম), ত্রিপুরায় বিয়ের অনুষ্ঠান হিসাবে কনের মা কনেকে একপাত্র মদ দেয়; কনে সেই পাত্র নিয়ে বরের কাছে যায়, তার কোলে বসে পাত্র থেকে নিজে কিছুটা খায় আর তারপর বাকিটুকু বরকে খেতে দেয়। থানা অঞ্চলে নকরি কুনবিদের মধ্যে প্রথা হলো, বিবাহ-অনুষ্ঠানের শেষে বরবধূকে মদ্যপান করতে দেওয়া হবে। খিয়ুঙটায় কন্যাপক্ষের মেয়েরা বরের সামনে বাঁশ দিয়ে গ্রামে চোকবার পথ বন্ধ করে রাখে; বাঁশের উপাশে দাঁড়িয়ে এদের সঙ্গে মদ্যপান করবার পর তবেই তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়। মোরোক্কোর বিবাহানুষ্ঠানে পুরোহিত একটি মদের পাত্রে আশীৰ্বাদ বর্ষণ করে বরবধূকে পান করতে দেয়। সারকাদের মধ্যে প্রথা হলো, বর ও বধূ উভয়কেই এক পাত্র করে মদ দেওয়া হয়; তারা পাত্রের মদ একসঙ্গে মিশিয়ে পান করে; এরই পর বিবাহানুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি। মলুক্কাস, জাপান, বাংলা, ব্রেজিল, রাশিয়া, স্কাণ্ডিনেভিয়া এবং ইয়োরোপের নানা অঞ্চলে বিবাহ-অনুষ্ঠান বা তার অঙ্গ হিসেবে বরবধূকে একই পাত্র থেকে মদ পান করতে হয়। বেনি-ইসরাইল-এর বিয়েতে বর কনের মুখে মদ ঢেলে দেয়। কোরিয়া আর জাপানে প্রথা হলো, লাল সুতো দিয়ে বাঁধা দুটি পাত্র থেকে বর ও বধূকে মদ্যপান করতে হবে। খৃস্টান দেশে যদিও মূল বিবাহ-অনুষ্ঠান থেকে, এই ব্যবস্থাটুকু বিচ্ছিন্ন হয়েছে তবুও স্বতন্ত্রভাবে তা পালন করবার ব্যবস্থা দেখা যায়—বিবাহের অব্যবহিত পরে বর ও বধূকে মদ্যপান করতে হয়। গোণ্ডদের মধ্যে প্রথা হলো, দুই বেয়াই একসঙ্গে বসে মদ্যপান করবে।
