তাহলে সমস্যা ওঠে : সেই আদি-তাৎপর্যের অনুসন্ধান কেমন করে সম্ভবপর হবে? আমাদের পদ্ধতি অনুসারে, তার জন্যে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজো যে-সব মানবদল পিছিয়ে-পড়া দশায় আটকে রয়েছে তাদের বিশ্বাস আর অনুষ্ঠানকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
পঞ্চমকারের মধ্যে আমরা বিশেষ করে মদ্য ও মৈথুন—এই দুটির আলোচনা তুলবো। কেননা, এই দুটি নিয়েই সন্দেহ জাগে সবচেয়ে বেশি। আধুনিক বিদ্বান(৫৬৮) – যেমন বলছেন :
বৈধ মাংস, মাছ এবং মুদ্রা সম্বন্ধে কোনো কথা উঠে না, কিন্তু মদ্য ও মৈথুন এই দুটিই সাধনার অঙ্গরূপে কীভাবে গৃহীত হইতে পারে—এই সন্দেহ জাগে।
অথচ তন্ত্র(৫৬৯) বলছে, মদ্যপান বিনা সাধনা সম্ভব নয় :
বিনা মদ্যং মহেশানি ন সিদ্ধন্তি কদাচন।
তস্মাদাদৌ প্রযত্নেন পীত্বা তাং পায়য়েদ্বুধঃ।।
কিন্তু ইহাতে মদ্য বিনা কখনই সিদ্ধি হইতে পারে না। সেই জন্য পুর্বে যত্নপূর্বক স্বয়ং মদ্যপান করিয়া এবং তাহাকে পান করাইয়া জপ করিবে।
প্রশ্ন হলো, মানব-উন্নতির কোন স্তরের চেতনা আজো আমাদের দেশে এইভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপাসনা হিসেবে টিকে রয়েছে?
পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে মদ্যপানের দৃষ্টান্ত যথেষ্টই দেখতে পাওয়া যায়। এই মদ্যপান যে আধুনিক অর্থে এবং আধুনিক উদ্দেশ্যে মদ্যপান নয় তার প্রমাণ হলো, প্রাচীন সমাজে মদ্যপানের অনুষ্ঠান-গত গুরুত্ব রয়েছে। আমরা এখানে বিশেষ করে দুটি অনুষ্ঠানের উল্লেখ করবো। কেননা এই দুটি অনুষ্ঠান থেকেই প্রাচীন মানুষদের মদ্য সংক্রান্ত ধ্যানধারণার তাৎপর্য অনুমান করবার সুযোগ হতে পারে।
একটি অনুষ্ঠান মৃত্যুকে উত্তীর্ণ হবার কামনায়। আর একটি অনুষ্ঠান নবজাতককে লাভ করবার কামনায়। তাই এই দুটি অনুষ্ঠানকে পরীক্ষা করলে অনুমান করা যেতে পারে যে, আদিম মামুষের চেতনায় মদ্যও রক্তের মতোই জীবন ও জন্মের একটি মূল উপাদান বা অন্তত প্রধান সহায়ক। তাই নবজন্মের কামনা—তা সে মানবীয়ই হোক আর প্রাকৃতিকই হোক— যেহেতু তান্ত্রিক সাধনার আদি তাৎপর্য, সেইহেতু মদ্যপান বিনা তান্ত্রিক সাধনাকে প্রাচীনের অসম্ভব মনে করেছিলেন।
প্রথমত, প্রাচীন সমাজের এই দু’রকম অনুষ্ঠানকে পরীক্ষা করা যাক। মৃত্যুকে অতিক্রম করবার কামনায় মন্ত্রের ব্যবহার আধুনিক গবেষকদের কাছে অপরিচিত নয় :
The Irish wake is a familiar example of the practice of drinking to celebrate death. In West Africa the Tshi people drink heavily during the fast which follows a death, and the mourners are generally intoxicated. The same is the case among the Yorubas. But it is chiefly after the funeral that drinking is the rule of the feast.
At funerals among the Woolwa Indians there is much drinking of mishla. A long line of cotton is stretched, like a telegraph wire, from the house of the dead, where the drinking takes place, to the burial ground where the body has been deposited. ‘I have seen the white thread following the course of the river for many miles, crossing and recrossing the stream several times’. As soon as a Bangala man dies, the family gets in a large supply of sugar-cane wine. Dancing and drinking are carried on for three or four days and nights, or until the wine is finished. The Guiana Indians drink and dance at the funeral feast.
Among the Tshinyai of the Zambesi the native beer, pombe, plays a considerable part in post-funeral rites. For the ceremony of Bona, a large quantity is prepared. Holes are bored above the grave and pombe is poured in. In one hole, in front of the house where the grave is, the mourners wash their hands with pombe. As the procession retires, a widow of the deceased (she is called musimo, the spirit) her head covered with calico, constantly calls out for pombe, which she drinks beneath the covering. At the house of the head widow, a large hole is dug and well-cemented. This is filled with pombe, and every one lies down and drinks it without help of spoon or vessel. A feast follows consisting of pombe and meat(৫৭০).
মৃত্যু-উৎসবে মদ্যপান-ব্যবহারের একটি স্বপরিচিত দৃষ্টান্ত হলো আইরিসদের শব-সংকার। দক্ষিণ আফ্রিকায় টুশিরা কারুর মৃত্যু ঘটলে পর উপবাস দেয়, সেই উপবাসের সময় তারা অত্যন্ত বেশি মদ্যপান করে, শোকার্তরা সাধারণত মাতাল হয়ে যায়। ইয়োরুবাদের মধ্যেও একই ব্যাপার চোখে পড়ে। কিন্তু সাধারণত নিয়ম হলো, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর জ্ঞাতিভোজনের সময় মদ্যপান করা হবে।
উলওয়াদের মধ্যে দেখা যায়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় প্রচুর মদ্যপান করবার প্রথা আছে। সেই মদ্যের নাম মিশলা। মৃতের বাড়িতে মদ্যপান করা হয়, সেখান থেকে কবরখানা পর্যন্ত টেলিগ্রাফের তারের মতো সুতো টাঙিয়ে দেওয়া হয়। ‘মাইলের পর মাইল ধরে নদীর কিনারা দিয়ে এবং নদীকে বারবার ডিঙিয়ে এই সুতো খাটানো হতে আমি দেখেছি’। বগলদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার পরিবারের লোকের সঙ্গে সঙ্গে বিস্তর পরিমাণ আখের মদ সংগ্রহ করে; তারপর তিনচার দিন ধরে, কিংবা যতোক্ষণ না মদটা শেষ হচ্ছে, সারা রাত তাদের নাচ এবং মদ্যপান চলে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিমন্ত্রণে গিআনারা মদ্যপান করে এবং নাচে।
জাম্বেলির তিসিন্নাইদের পচাই মদের নাম পম্বি; অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরের অনুষ্ঠানে এই মদের ব্যবহার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ‘বোনা’ অনুষ্ঠানের জন্যে বিস্তর মদ তৈরি করা হয় এবং কবরের গর্ত খুঁড়ে পম্বি ঢালা হয়। বাড়ির সামনে কবরখানার উপরের একটি ওইরকম গর্তের গায়ে শোকতপ্তরা পম্বি দিয়ে হাত ধোয়। মিছিলটির ফিরতি পথে মৃতের এক বিধবা পত্নীকে সাদা কাপড়ের ঘোমটা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়; ঘোমটার মধ্যে থেকে সে একটানা পম্বি চাইতে থাকে এবং প্রভূত পরিমাণে তা পান করে। প্রধান বিধবার বাড়িতে একটা বড় গর্ত করা হয় এবং সেটা ভালো করে লেপন করে তার মধ্যে পম্বি ঢেলে ভরতি করা হয়। সকলে গুয়ে পড়ে সেই গর্তের ভিতর থেকে চামচ বা মগের সাহায্য ছাড়াই পম্বি পান করতে থাকে। তারপর মাংস ও পম্বির ভোজ হয়।
