দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত ও খর্ব হয়ে থাকবার দরুন এই অর্থনৈতিক বিকাশের উপর প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক খিলানটির গায়েও দীর্ঘস্থায়ী কারুকার্যের মতো ওই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের চিন্তা-চেতনার বহু স্মারক অত্যন্ত প্রকটভাবে টিকে থেকেছে। অবশ্যই, এইভাবে টিকে থাকতে গিয়ে সেগুলির একজাতীয় রূপান্তর ঘটতে বাধ্য : এককালে যে-চেতনা ছিলো জীবন-সংগ্রামের উপায়, সে-চেতনা জীবন-সংগ্রামের বাস্তব পটভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে জীবন-সংগ্রামের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে, অর্থহীন ও বীভৎস ধর্মমোহের রূপ গ্রহণ করেছে। ধর্মমোহের প্রকৃতিই ওই রকম, তার মধ্যে অতীতকে খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু আদি ও অকৃত্রিম তাৎপর্যপূর্ণ অতীত হিসেবে নয়, বিপরীতে পর্যবসিত অতীত হিসেবে। অতীতের যে-জাদু-অনুষ্ঠান ছিলো জীবন-সংগ্রামের উপায়, ধর্মমোহ হিসেবে তাই হয়ে দাঁড়ায় জীবন-সংগ্রামের অন্তরায়। কাল্পনিক হলেও আদিম জাদুবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত মানুষের ধ্যানধারণাগুলি কীভাবে তাকে জীবন-সংগ্রামের ব্যাপারে মানসিক উদ্দীপনা যুগিয়েছে তার আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করেছি; ধর্মমোহের অঙ্গ হিসেবে আজকের দিনে এই আদিম বিশ্বাসের স্মারকই কী রকম অর্থহীন বীভৎসতায় পরিণত হয়েছে তার কিছু নমুনা দেখা যাক।
ত্রিবাঙ্কুরের মন্দিরে একটি প্রধান অনুষ্ঠানের নাম ত্রিপ্লুখারত্তু(৫৬২)। স্থানীয় বিশ্বাস অনুসারে দেবী বছরে আট-দশবার রজঃস্বলা হন, সেই উপলক্ষ্যেই উক্ত অনুষ্ঠান। দেবীর অঙ্গবন্ত্র তখন নাকি রক্তের দাগে লাল হয়ে যায়, এই বস্ত্রের একটু টুকরো পাবার জন্যে জনসাধারণের মধ্যে কাড়াকড়ি পড়ে যায়। অন্যত্র(৫৬৩) দেবী পাৰ্বতীর অনুরূপ অবস্থা কল্পনা করে একই রকমের বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায়। এই বিশ্বাসই আধুনিক সমাজে কতো চূড়ান্ত কামবিকারে পরিণত হতে পারে তার একটি নমুনা হলো বাংলাদেশের গৌরীগরণ : “…এই অনুষ্ঠানের রক্তে নিষিক্ত ন্যাকড়া ‘সিদ্ধবস্ত্র’ রূপে সমাজে চলে—রোগ-বিনাশ, শক্র-নিপাত, মামলা-জয়, পরীক্ষা-পাস ইত্যাদি ব্যাপারে বিশেষ ফলপ্ৰদ বিশ্বাসে অনেকে তা সংগ্রহ করে রাখেন, মাদুলীতে ধারণও করেন। কিন্তু জিনিসটা কী তা হয়তো অনেকেই জানেন না।” (৫৬৪)
তন্ত্রের পঞ্চমকার সম্বন্ধে একই কথা। কুলার্ণব-তন্ত্র(৫৬৫) বলছে :
মদ্যং মাংসঞ্চ মৎস্যঞ্চ মুদ্রামৈথুনমেবচ।
মকারপঞ্চকং দেবি দেবতাপ্রতিকারকম্।।
—মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন—এই পাঁচটি বস্তুর নামের আদিতে ম’ অক্ষরটি থাকায় ইহাদের সংক্ষিপ্ত নাম মকার …
মকারপঞ্চকং দেবি দেবানামপি দুর্লভং।
মদ্যৈর্মাংসৈস্তথা মৎস্যৈর্মুদ্রাভির্মৈখুনৈরপি।।
স্ত্রীভিঃ সার্দ্ধং মহাসাধুরর্চ্চয়েৎ জগদম্বিকা।
অন্যথা চ মহানিন্দা গীয়তে খণ্ডিতৈঃ সুরৈ॥
পঞ্চমকার তন্ত্রের প্রাণস্বরূপ। পঞ্চমকার ব্যতীত তান্ত্রিকের কোনো কার্যেই অধিকার নাই। পঞ্চমকার দেবতাদিগেরও দুর্লভ; মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন এই পঞ্চমকার দ্বারা জগদম্বিকাকে পূজা করিতে হয়।
কিংবা(৫৬৬),
পঞ্চমেন বিনা দেবি চণ্ডিমন্ত্ৰং কথং জপেৎ।
—পঞ্চমকার ব্যতীত চণ্ডিমন্ত্র কেমন করিয়া জপ হইতে পারে?
ইত্যাদি ইত্যাদি। বস্তুত এ-সব কথা এমন কিছু নতুন কথা নয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যাঁরই পরিচয় আছে তিনি জানেন যে, পঞ্চমকার ছাড়া তন্ত্র সাধনা হয় না। এবং আজকের দিনে আমাদের উন্নততর ও মার্জিত রুচির কাছে এই পঞ্চমকার যে কী উৎকট বীভৎসতার রূপ গ্রহণ করেছে তাও আধুনিক বিদ্বানদের অনেকের রচনাতেই স্বীকৃত হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করে পঞ্চমকারের বীভৎসতাকে ঢাকবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ব্যাখ্যাগুলি যে নেহাতই কৃত্রিম তার একটা প্রমাণ হলো এ-জাতীয় ব্যাখ্যায় সাধারণত চূড়ান্ত মন্তব্য হিসেবে বলা হয়, পঞ্চমকারের তাৎপর্য অতি গৃঢ়, সাধারণের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কিনা, ওই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আধুনিক বিদ্বানদের কাছে তান্ত্রিক ধ্যানধারণার নগ্নতা-নিবারণের উপায়মাত্র :
যাহারা শাস্ত্রের মর্মার্থ বুঝিতে পারেন না, তাহারাই পঞ্চমকারের নামে নানা দোষারোপ করেন।…গুরূপদেশ ব্যতীত এই সকল বিষয়ে কোনো আলোচনা চলিতে পারে না। অসি ধারার উপর দিয়া চলা, বাঘের সহিত গলাগলি করা এবং বিষধর সাপ লইয়া খেলা করা অপেক্ষাও কুলসাধন কঠিন ব্যাপার। কৌল সাধকগণ এই আচারকেও বেদবাহ্য বলিয়া স্বীকার করেন না। একমাত্র জিতেন্দ্রিয় পুরুষই এই সকল আচারে অধিকারী। অসংযত ব্যক্তির পক্ষে পঞ্চতত্বের সাধনা বিশেষ দুঃখের এবং পতনের কারণ হইয়া থাকে।(৫৬৭)
ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের মন্তব্য হলো, এইভাবে আধুনিক রুচি ও আধুনিক নীতিবোধ দিয়ে পঞ্চমকারের নগ্নতা-নিবারণ করবার বা পঞ্চমকারকে সমর্থন করবার চেষ্টাটা সম্পূর্ণ নিরর্থক। কেননা, আমাদের আধুনিক জীবনের পটভূমিতে এই পঞ্চমকার নিশ্চয়ই অর্থহীন বীভৎসতা মাত্র। কিন্তু সেই সঙ্গেই আমাদের যুক্তি হলে, এই বীভৎসতাই পঞ্চমকারের আদি-তাৎপর্য হতে পারে না। কেননা তাহলে, পঞ্চমকার-প্রাণ এই তান্ত্রিক সাধনা এতো বড়ো একটা দেশকে এতো শতাব্দী ধরে এমন গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারতো না।
