আদিম পর্যায়ের কৃষিকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানে ঋতুরজের জাদুবিশ্বাসগত তাৎপর্য প্রসঙ্গে আমরা ইতিপূর্বে অধ্যাপক জর্জ টমসনের মন্তব্য মুদীর্থভাবে উদ্ধৃত করেছি (পৃ. ৩৩৬–৩৯)। অর্ধ-অসহায় অবস্থার ওই মানুষের প্রজননরহস্যকে যেটুকু বুঝতে পেরেছিলো সেই বোধ অনুসারে মানবীর ঋতুরজই এর মূল উপকরণ। এবং এই পর্যায়ের মানুষ জাদুবিশ্বাসের দিক থেকে যেহেতু মানবীয় ফলপ্রসূতার অন্থকরণের সাহায্যে বা সংস্পর্শের সাহায্যে, প্রকৃতির ফল-প্রসূতাকেও আয়ত্তে আনবার কল্পনা করেছে সেইহেতু তাদের ধারণায় ঋতুরঙ্গ—বা সিন্দুর প্রভৃতি ঋতুরজের নকলগুলির,—গুরুত্ব অত্যন্ত অসামান্য।
তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার মধ্যে যদি ওই প্রাকৃত পর্যায়ের কৃষিকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের স্বাক্ষর টিকে থাকে তাহলে তান্ত্রিক সাধনাতেও ঋতুরজের গুরুত্ব থাকাই স্বাভাবিক। এবং তা আছেও। তন্ত্র অনুসারে ঋতুরজের গুরুত্ব যে কতোখানি তা নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি(৫৬১) থেকেই অনুমান করা যাবে :
ক্রমসংকেত খপুপ, স্বয়ম্ভুকুমম, কুণ্ডোম্ভব, গোলোদ্ভব, বজ্ৰপুপ, উল্লাস, প্রৌঢ়, ইত্যাদি—তন্ত্রে ঐ সকল তাত্রিক শব্দের অর্থ নির্ণীত হইয়াছে। আবার অনেক সাংকেতিক শব্দের অর্থ অভিষিক্ত গুরুর নিকট ভিন্ন আর কোনো প্রকারে জানা যায় না।
স্বয়ম্ভুকুমুম—প্রথম ঋতুমতীর রজঃ। যথা—
হরসম্পর্কহীনায়াঃ লতায়াঃ কামমন্দিরে।
জাতং কুসুমমাদেী যন্মহাদেব্যৈ নিবেদয়েৎ॥
স্বয়ম্ভুকুমমং দেবি রক্তচন্দনসংজ্ঞিতম্।
তথা ত্রিশূলপুপঞ্চ বজ্রপুষ্পং বরাননে॥
অমুকুলং লোহিতাক্ষচন্দনং হরবল্লভং। (মূণ্ডমালাতন্ত্র ২ প)
হর, অর্থাৎ পুরুষের সংশ্রব ব্যতিরেকে লতা অর্থাৎ স্ত্রীলোকের যোনি হইতে যে কুসুম অর্থাৎ রজঃ হয়, তাহাকেই স্বয়ম্ভুকুসুম বা রক্তচন্দন বলা যায়। ইহার অভাবে ত্রিশূলপুষ্প ও বজ্ৰপুষ্প (চণ্ডালীর রজঃ) মহাদেবীকে নিবেদন করিবে। ইহার অনুকল্প শিবপ্রিয় লোহিতাক্ষ চন্দন।
কুণ্ডলোম্ভব—অথবা সধবা স্ত্রীলোকের রজঃ। যথা—
জীবদ্ভর্তৃকনারীণাং পঙ্কমঞ্চেব কারয়েৎ ।
তস্যা ভগস্য যদ্দ্র ব্যং তৎকুণ্ডোদ্ভবমুচ্যত ।৷ (সময়াচারতন্ত্র ২য় প)
গোলোম্ভব, অর্থাৎ বিধবা স্ত্রীলোকের রজঃ। যথা—
মৃতভর্তৃকনারীণাং পঙ্কমঞ্চেব কারয়েৎ।
তস্যা ভগস্য যদ্দ্ৰব্যং তদ্গেলোদ্ভবমুচ্যতে।।
ইত্যাদি ইত্যাদি।
তান্ত্রিক ধ্যানধারণা অনুসারে মানবীয় ফলপ্রসূতার সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সম্পর্কটি ওই তান্ত্রিক পরিভাষা থেকেও অনুমান করা যেতে পারে। তান্ত্রিক পরিভাষায়, নারী জননাঙ্গের নাম লতা : নারী জননাঙ্গ থেকেই সন্তানের আবির্ভাব হয়, প্রকৃতিতেও লতায় ফল ফলে। কিন্তু সন্তানজন্মের আগে ঋতুরজঃ, ফলের আগে ফুল। তন্ত্রেও তাই ঋতুরজঃকে কুসুম, পুষ্প ইত্যাদি পরিভাষা দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে।
বলাই বাহুল্য, কুসুম বা পুষ্পের মতো কাব্যিক নাম সত্ত্বেও তন্ত্রের ওই কথাবার্তাগুলি আমাদের আধুনিক রুচিকে অত্যন্ত কঠোরভাবে পীড়িত করে। তার কারণ কি সত্যই এই যে, আমরা আজকের দিনে ঋতুরজের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্যকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে চিনতে শিখেছি এবং অতএব তন্ত্রের ওই কল্পনা আমাদের কাছে কুসংস্কার মাত্র? এ-বিষয়ে নিশ্চয়ই কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে, আমাদের আধুনিক জ্ঞানের কাছে তন্ত্রের ওই কল্পনা অন্ধ কুসংস্কারের আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে খপুষ্পাদি প্রসঙ্গে আমাদের রুচি যে এইভাবে পীড়িত হয় তার প্রকৃত কারণ আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়—তার বদলে আমাদের মনের একটি নতুন কুসংস্কার। আমরা লালিত হয়েছি পুরুষ-প্রধান সমাজে, আমাদের রুচি ও সংস্কারের উপর তাই পুরুষ-প্রধান সমাজের অনিবার্য স্বাক্ষর। ফলে, আমাদের পক্ষে ঋতুরজকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে মানবদেহজাত অন্যান্য রক্তের সমতুল্য বলে গ্রহণ করতে পারা সম্ভব নয়। মাতৃপ্রধান সমাজে এই রক্তের প্রতি যে-কুসংস্কার ছিলো পিতৃপ্রধান সমাজে তারই বিপরীত কুসংস্কার আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করতে চায়; মাতৃপ্রধান পরিবেশে মাতৃত্বের মূল উপাদান হিসেবে মানুষ যাকে পবিত্রতম মনে করেছে পিতৃপ্রধান পরিবেশে তাই এক রকম ঘৃণিত, অপবিত্র ও অশুচিসূচক বস্তু। এও নিশ্চয়ই বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক চিন্তার পরিচয় নয়, এক রকমের কুসংস্কারই। তবে, তান্ত্রিক কুসংস্কারের ঠিক উল্টো।
এখানে ভারতীয় ইতিহাসের বৈশিষ্ট্যের কথা মনে রাখা দরকার। প্রথমত, অসমান উন্নতির ফলে আমাদের দেশের স্থান-বিশেষে সমাজ-বিকাশের ওই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়টি এখনো বিলুপ্ত হয়নি। দৃষ্টান্ত হিসেবে আসাম অঞ্চলের (বিশেষত খাসি আর গারোদের) কথা উল্লেখ করা যায়; সে-অঞ্চলে মেয়েরা নাকি জাদু জানে, পুরুষদের ভেড়া করে রাখে। আবার সে-অঞ্চলেরই প্রধান তীর্থ কামরূপ-কামাখ্যা হলো যোনিপীঠ। অম্বুবাচীর দিন দেবী রজঃস্বল হন—ওই দিনটিই এ-অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো উৎসব। শুধু তাই নয়। এই স্তরের মানবচেতনায় জাদুবিশ্বাসের দাবি অনুসারে মানবীর (এবং অতএব দেবীর) দেহভাণ্ডের উপমা দিয়েই ব্ৰহ্মাণ্ডকে বোঝবার চেষ্টা; তাই কল্পনা করা হয় এই দিনটিতে পৃথিবীও রজঃস্বলা হন : সামনে ফসলের সময় এসেছে, ফসলের জন্ম দিতে হলে মানবীর অনুকরণে পৃথিবীকেও রজঃস্বল হতে হবে।
