এতোখানি জ্যামিতিক নিষ্ঠা নিয়ে, শোভা এবং উপশোভায় বিভূষিত করে, এই যে সর্বতোভদ্রমণ্ডলটি আঁকবার নির্দেশ পাওয়া গেলো, এর মূল কথা কী? তন্ত্রবেত্তারা জানেন, এর মূল কথা হলো অষ্টদলপদ্ম ও বীথিকা :
যট্ত্রিংশত পদৈৰ্ম্মধ্যে লিখেং পদ্মং সুলক্ষণম্।
বহিঃ পঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা॥
সুলক্ষণ পদ্ম এবং বীথিক; ওই বীথিকার নাম কল্পলতিকা :
আলিখেং কল্পলতিকা দলপুষ্পসমন্বিতাং।
প্রথমে মনে রাখা দরকার, তন্ত্রে এই পদ্ম এবং বীথিকার গুরুত্ব কতোখানি। কেননা, শুধুমাত্র সর্বতোভদ্রমণ্ডল নয়, প্রায় সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রেরই মূল বিষয়বস্তু বলতে এই পদ্ম এবং বীথিকাই। এখানে কয়েকটি তান্ত্রিক যন্ত্রের ছবি দেওয়া গেলো (পৃ: ৪০৭—৮, নীচে); ছবিগুলিকে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে খুঁটিনাটির তারতম্য থাকলেও অষ্টদলপদ্ম এবং বীথিকাই সমস্ত চিত্রের মূল বিষয়বস্তু।
অতএব, যন্ত্র-প্রসঙ্গে প্রধানতম প্রশ্ন ওঠে, ওই পদ্ম বা অষ্টদলপদ্মের প্রকৃত তাৎপর্য কী?
বাংলার পূজাপদ্ধতি এবং তন্ত্রের যন্ত্র-সংকেতের সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় যাঁর আছে তিনিই জানেন, তন্ত্রে পদ্ম বা অষ্টদলপদ্ম নারী-জননাঙ্গের প্রতীক মাত্র। অনেক সময় তান্ত্রিক রচনায় পদ্ম শব্দটিকে একেবারে সোজাসুজি সেই অর্থেই গ্রহণ করা হয়। যথা(৫৪৯) :
পদ্মমধ্যে গতে শুক্রে সন্ততিস্তেন জায়তে ॥
তন্ত্রে ‘পদ্ম’-শব্দের এই জাতীয় ব্যবহার একটুও দুর্লভ নয়। বৌদ্ধতন্ত্র প্রসঙ্গে আধুনিক বিশেষজ্ঞ(৫৫০) বলছেন :
Vajra (with the variant mani) is a decent or mystic plgese for linga, the male organ, just as padma, lotus, is the literary rendering of bhaga or yoni,
অর্থাৎ, বজ্র (বা মণি) শব্দ পুরুষ-অঙ্গবাচক, যেমন পদ্ম শব্দ হলো নারী জননাঙ্গের সাহিত্যিক প্রতিশব্দ।
এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা দরকার, পদ্মের এই প্রতীকী অর্থ শুধুমাত্র প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই নয় :
In Egypt and amongst the Saivites in India, the lotus is a symbol of the reproductive act (Creuzer, Symbolik und Mythologie, Leipzig, 1836-43, 1, i, 412). The Buddhists of north countries still repeat, without suspecting the origin of the phrase, ‘Om. The jewel in the lotus. Amen (Brinton, The Religious Sentiment, 214). In the West, too, these symbols persist, even when, as also among the Buddhists, they contradict the central doctrine of the religion in which they appear(৫৫১)
অর্থাৎ ভারতবর্ষের শৈবদের মধ্যে যে-রকম মিশরেও সেইরকম পদ্ম হলো যৌনমিলনের (অঙ্গের) প্রতীক। উত্তরাঞ্চলের বৌদ্ধরা এখনো কথাগুলির মানে না জেনেই আবৃত্তি করে : ‘ওম্! মণি পদ্মে হুং’! পাশ্চাত্যেও এই প্রতীকগুলি টিকে থেকেছে, এমন কি—বৌদ্ধধর্মের মতোই—ধৰ্ম-বিশ্বাসটির সঙ্গে এর বিরোধ সত্ত্বেও ।
তাহলে পদ্মের অর্থ নারীজননাঙ্গই। এই পদ্মই হলো সর্বতোভজমণ্ডলের— তথা সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রের—মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু সেই সঙ্গেই লক্ষ্য করা দরকার, তান্ত্রিক যন্ত্রগুলিতে শুধুমাত্র পদ্মের চিত্র নয়; পদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে বীথিকার সম্পর্ক কী? তান্ত্রিক যন্ত্র প্রসঙ্গে এই প্রশ্নটি স্বভাবতই সবচেয়ে মৌলিক। আমাদের যুক্তি অনুসারে, এর মূলে আছে এক আদিম বিশ্বাস : যে-বিশ্বাস থেকে দেবীর নাম হয়েছিলো শাকম্ভরী, কিংবা, যে-বিশ্বাসের মূর্ত পরিচয় হরপ্পার ওই অত্যাশ্চর্য সিলটিতে টিকে আছে। এবং, এইভাবে প্রাকৃতিক উর্বরতার সঙ্গে মানবীর উর্বরতার সংযোগ কল্পনা করা হয়েছে বলেই তন্ত্রে নারী-জননাঙ্গকে উদ্ভিদ-বাচক নাম (লতা) দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো।
দুর্গাপূজার আলোচনায় ফেরা যাক। দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ হলে যন্ত্র ও ঘট সর্বতোভজমণ্ডলের উপর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হবে।
অনন্তর সর্বতোভদ্রমগুলোপরি ঘট স্থাপন করিবে। যথা—শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করিবে, তদুপরি ধৌত সুলক্ষণ ঘট, তাহাতে দধ্যক্ষত (দধি মাখানো আতপ চাউল) দিয়া শুদ্ধ জলপূর্ণ করিয়া স্থাপন করিবে। তাহার কণ্ঠে আচারৎ লাল সুতা ও আলতা দেওয়া হয়। মধ্যে পঞ্চপল্লব (আম্র, অশ্বথ, বট, পাকুড়, যজ্ঞীয়ডুম্বুর শাখা), অলভে কেবল আম্রপল্লব দিবে। তদভাবে দুইটি পানও দিবার ব্যবস্থা আছে। এক সরা চাউলে একটি হরিতকী কিংবা সুপারী দিয়া তদুপরি স্থাপন করিবে। তদুপরি একটি নির্দোষ সশীর্ষ ফুল (নারিকেল অথবা কদলী) দিবে; ঐ ফলকে সিন্দুর রঞ্জিত করিবে। ঘটে একটি সিন্দুর পুত্তলিকা আঁকিবে, পুষ্পমাল্য দিয়া শোভিত করিবে…(৫৫২)
সর্বতোভজমগুলের অর্থ হলো নারী-জননাঙ্গ : সৰ্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট, ঘটের গায়ে সিন্দুরপুত্তলিকা—মানবীয় প্রজননের প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ নকল তোলবার আয়োজন। এইভাবে মানবীয় প্রজননের নকল তুলে কোন কামনা সফল করবার কল্পনা করা হচ্ছে তার আভাস আমরা আগেই পেয়েছি : নারী-জননাঙ্গের তান্ত্রিক নাম লতা, তান্ত্রিক যন্ত্রে অষ্টদলপদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিক। অর্থাৎ, নারী অঙ্গের জননশক্তির স্পর্শে প্রকৃতিকে ফলপ্রস্থ করবার কল্পনা। ঘট-স্থাপনার মধ্যে সেই চেষ্টাকেই আরো একটু এগিয়ে নিয়ে যাবার আয়োজন করা হলো। শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করে ফসল ফলানোর মহড়া শুরু হলো। আর তারপর ঘটের উপরস্থ পল্লবকে স্পর্শ করে কামনা জানানো হবে :
