আমরা বলতে চাইছি, এইভাবে নারী-জননাঙ্গের চিত্র অঙ্কন করবার পিছনে এক আদিম বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়; সেই বিশ্বাস হলো নারীজননাঙ্গের উপরই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও নির্ভরশীল।
প্রথমে দেখা যাক, এ-বিষয়ে তন্ত্রের আভ্যন্তরীণ তথ্য কী রকম।
ইতিপূর্বে (পৃঃ ৩৫৬-৩৫৮) দুর্গাপূজা-প্রসঙ্গে আমরা শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দের মতবাদ উদ্ধৃত করেছি। আদিতে দুর্গা যে শস্য-জননী ছিলেন এবং দুর্গোৎসব যে শস্য-উৎসবই ছিলো—সে-বিষয়ে শ্রীযুক্ত চন্দ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করছেন। প্রথমত, দুর্গোৎসব হলো শারদোৎসব—ফসল পাকবার ঋতু তখন। দ্বিতীয়ত, শাকম্ভরী, অন্নপূর্ণা প্রভৃতি দুর্গার নাম। তৃতীয়ত, দুর্গাপূজায় নবপত্রিকার গুরুত্ব। এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, শ্রীযুক্ত চন্দের উল্লিখিত এই প্রমাণগুলি অসামান্য মূল্যবান। আমরা এখানে আরো কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্যের অবতারণা করবো।
প্রথমত শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৫৪৭) আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন,
এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজা দুর্গার প্রতিমা গড়িয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বর্ষ পুর্বে ঠিক এমনভাবের প্রতিমা বাংলার কারিকর গড়িত না। গোড়ায় যখন সিংহবাহিনীর মৃন্ময়ী মূর্তির পূজা এ দেশে প্রচলিত হয়, তখন কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী, কেহই ছিলেন না।…আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময়ে যে প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডীমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে উৎসব করিয়া থাকি, সে উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণ ঘটের, দেবীকে আহ্বান করিতে হয় যন্ত্রে ও ঘটে।
তাহলে দুর্গাপূজার আদি-অকৃত্রিম রূপটিকে চিনতে হলে পুত্ৰকন্যাপরিবৃতা ওই দশভূজাকে বাদ দিয়ে যন্ত্র ও ঘটের উপরই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা প্রয়োজন।
দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ ওই যন্ত্র ও ঘটের দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা যাক। যন্ত্রটির নাম সর্বতোভদ্রমণ্ডল। এটি তন্ত্রের একটি বিখ্যাত যন্ত্র :
এই চিত্রটি আঁকবার নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে(৫৪৮) :
ঘট্ত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেং পদ্মং স্বলক্ষণম্।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা॥
দ্বারশোভোপশোভাস্রাং শিষ্টাভ্যাং পরিকল্পয়েৎ।
শাস্ত্রোক্তবিধিনা মন্ত্রী ততঃ পদ্মং সমালিখেৎ॥
পদ্মক্ষেত্রস্য সংত্যজ্য দ্বাদশাংশং বহিঃ সুধীঃ।
তন্মধ্যং বিভজেদ্বৃত্তৈস্ত্রিভিঃ সমবিভাগতঃ॥
আদ্যং স্যাৎ কর্ণিকাস্থানং কেশরাণাং দ্বিতীয়কম্।
তৃতীয় তত্ৰ পত্রাণাং মুক্তাংশেন দলাগ্রকম্।
বাহ্যবৃত্তান্তরালস্য মানেন বিধিনা সুধীঃ।
নিধায় কেশরাগ্রেষু পরিতোহর্ধনিশাকরান্॥
লিখিত্বা সাৰ্দ্ধসংস্থানি তত্ৰ সূত্রাণি পাতয়েৎ।
দলাগ্রণাঞ্চ যন্মানং তন্মানাৎ বৃত্তমালিখেৎ॥
তদন্তরালং তন্মধ্যসূত্রস্যোভয়তঃ সুধী।
আলিখেদ্বাহ্যহন্তেন দলাগ্রাণি সমন্ততঃ॥
দলমূলেষু যুগশঃ কেশরাণি প্রকল্পয়েৎ।
এতং সাধারণং প্রোক্তং পঙ্কজং তন্ত্রবেদিভিঃ ॥
…………………………………………
অঙ্গুলোৎসেধবিস্তারাঃ সীমারেখাঃ সিতাঃ শুভাঃ।
কর্ণিকাং পীতবর্ণেন কেশরাণ্যরুণেন চ॥
শুক্ল-বর্ণানি পত্রাণি তৎসন্ধীন্ শ্যামলেন চ।
রজসা রঞ্জয়েন্মন্ত্রী যদ্বা পীতৈব কর্ণিকা॥
কেশরাঃ পীতরক্তা: স্যুররুণানি দলানি চ।
সন্ধয়ঃ কৃষ্ণবর্ণা: স্যুঃ সিতেনাপ্যসিতেন বা॥
রঞ্জয়েৎ পীঠগর্ভাণি পাদাঃ স্যুররুণপ্রভাঃ।
গাত্রাণি তস্য শুক্লানি বীথিষু চ চতসৃষু॥
আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্।
বর্ণৈনানাবিধৈশ্চিত্ৰৈঃ সৰ্ব্বদৃষ্টিমনোহরাম্॥
দ্বারানি শ্বেতবর্ণানি শোভা রক্তাঃ সমীরিতাঃ ।
উপশোভাঃ পীতবর্ণাঃ কোণান্যসিতভানি চ॥
তিস্রো রেখা বহিঃ কাৰ্য্যাঃ সিতরক্তাসিতাঃ ক্ৰমাৎ।
মণ্ডলং সৰ্ব্বতোভদ্রমেতং সাধারণং মতম্॥
অর্থাৎ
তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে। পরে অবশিষ্ট দুই পংক্তি দ্বারা মধ্যস্থলে দ্বার, উভয় পার্থে দুইটি করিয়া শোভা এবং শোভান্বয়ের পার্থে দুইটি করিয়া উপশোভা এবং পরে কোণ প্রস্তুত করিতে হইবে। যে ৩৬টি ঘর লইয়া পদ্ম অঙ্কিত, তাহার দ্বাদশটি ঘর বাহিরে পৃথক রাখিয়া তন্মধ্যস্থ ২৪টি ঘরকে ৩টি বৃত্ত দ্বারা সমভাগে বিভক্ত করিবে। উহার প্রথম বৃত্ত কণিকা, দ্বিতীয় বৃত্ত কেশর ও তৃতীয়টি পদ্মপত্র। যে দ্বাদশাংশ বাহিরে রাখা হইয়াছে, উহা পত্রের অগ্র। তৃতীয় বৃত্তের মধ্যস্থ স্থানের পরিমাণে পদ্মপত্র রচনা করিবে। কেশর সমূহের অগ্রভাগে অর্ধচন্দ্র অঙ্কিত করিবে। অর্ধচন্দ্রাকৃতি রেখা-সমূহের মধ্যভাগে সূত্রপাত করত পদ্মপত্রের অগ্রগুলির সমান মাপে বৃত্তরেখা আঁকিবে।
মধ্যস্থ সূত্রপাতের দুই পার্শ্বে স্থির হস্তে দলাগ্র আঁকিবে। দলমূলে দুই দুইটি করিয়া কেশর করিতে হয়। ইহাকেই তন্ত্রবেত্তারা সাধারণ পদ্ম কহেন।…।
এক অঙ্গুলি উৎসেধ অর্থাৎ বেধ পরিমাণে শুভ্রবর্ণদ্বারা সীমারেখা সকল চিত্রিত করিয়া পীতবর্ণদ্বারা কণিকা, রক্তবর্ণগুণ্ডিকাদ্বারা কেশর ও শুক্লবর্ণদ্বারা পত্ৰসকল রঞ্জিত করিয়া শ্যামবর্ণে সমস্ত সন্ধিস্থান চিত্রিত করিবে। প্রকারান্তরে যথা— কর্ণিকা পীতবর্ণ, কেশরসকল পীত রক্তবর্ণ, পত্ৰসকল রক্তবর্ণ, সন্ধি কৃষ্ণবর্ণ, পীঠগর্ভ শুক্লবৰ্ণ কিংবা কৃষ্ণবর্ণ, পীঠপাদ রক্তবর্ণ ও পীঠগাত্র শুক্লবৰ্ণ করিয়া বীথিচতুষ্টয়ে পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে। এই কল্পলতিকা দর্শনমনোহর করিবে। দ্বারসকল শুক্লবৰ্ণ, শোভা রক্তবর্ণ, উপশোভা পীতবর্ণ ও কোণ চতুষ্টয় কৃষ্ণবর্ণ করিবে। মগুলের বহির্দেশে শ্বেত রক্ত ও কৃষ্ণবর্ণ তিনটি রেখা চিত্রিত করিবে। এই প্রকারে সাধারণ সর্বতোভদ্রমণ্ডল নির্মাণ করিতে হইবে।
