সে-সব খাঁটি বাংলার জিনিস যদি খুঁজিয়া বাহির করিতে চাও, তবে বাঙালীর বৈষ্ণব ধর্ম, সহজিয়া ধর্ম এবং বাংলার তন্ত্র এবং তান্ত্রিক ধর্ম বুঝিবার এবং জানিবার চেষ্টা কর।…বাঙালার বাঙালীকে ঠিকমতো বুঝিতে হইলে, এই দেশের বৈষ্ণব ধর্ম এবং তন্ত্রের ধর্ম বুঝিতে হইবে।
কিংবা(৫৩৮),
এই সকল তন্ত্র-পুস্তকের মধ্যে বাঙালার দুই হাজার বছরের ইতিহাস লুকানো আছে, যুগে যুগে জাতির পদ্ধতি, রীতি নীতির কথা প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে। এই তন্ত্ৰ-সাগর মন্থন করিতে পারিলে বাঙালার বহু লুপ্ত রত্নের উদ্ধার হইতে পারে, বাঙালা ইতিহাসে বহু তমসাবৃত কোটরে আলোকমালা ফুটিয়া উঠিতে পারে।
কিংবা(৫৩৯),
ব্রাহ্মণ্য-প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় বাঙালায় বহু জালজুয়াচুরি চলিয়াছিল, ঘটক ঠাকুরেরা অনেক সত্যের গোপন করিয়াছেন, স্মার্ত নাটোর ও নদীয়ার ব্রাহ্মণ রাজাদের প্রভাবে ও চেষ্টায় আরো অনেক গোলমাল গোলযোগ স্মৃতিশাস্ত্রের রূপার তবকে ঢাকা পড়িয়াছে। এই সকল আবরণ খুলিয়া সত্যের অনুসন্ধান করিতে হইলে তন্ত্রের আলোচনা করিতে হইবে। বাংলার গত দুই হাজার বৎসরের প্রকৃত ইতিহাস প্রচার প্রয়োজন, তীব্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকগণের সাহায্যে উহাদের আলোচনার প্রয়োজন এবং নিৰ্ভয়ে সত্য কথা বলিবার বুকের পাটারও প্রয়োজন; এই তিন প্রয়োজন সিদ্ধি না হইলে বাঙালী জাতির অতীত ইতিহাস ঠিকমতো প্রকাশিত হইবে না, বাঙালার পুরাতন গৌরবের মহিমা আমরা বুঝিয়া উঠিতে পারিব না।
আমাদের যুক্তিও নিশ্চয়ই তাই। কিন্তু সেই সঙ্গেই আমরা এ-কথাও বলতে চাই যে, ওই প্রাচীন ধ্যানধারণাগুলির উপর আধুনিক যুগের ধ্যানধারণা আরোপ করে এগুলির মহত্ত্ব বাড়াবার চেষ্টা করলেও আমরা খাঁটি বাংলার জিনিসকে খুঁজে পাবো না, তার বদলে বরং আত্মপ্রবঞ্চনাই করবো। এই জাতীয় আত্মপ্রবঞ্চনার নমুনা শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাতেও বিরল নয়। যেমন, তিনি(৫৪০) বলছেন, “আবার তন্ত্রকে জাগাইয়া তুলিতে না পারিলে জাতি হিসাবে আমরা উন্নত হইতে পারিব না। ইহাই আমার বিশ্বাস।” আমাদের বক্তব্য ঠিক এর উল্টো। তন্ত্রকে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টার বদলে আমাদের পক্ষে এইটুকু স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার যে, আমাদের দেশের ওই তন্ত্রসাধনায় স্ত্রী-জননাঙ্গ প্রভৃতির উপর যে-গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো তার মূলে ছিলো অত্যন্ত আদিম পর্যায়ের এক বিশ্বাস : স্ত্রী-জননাঙ্গ শুধুই সন্তানদায়িনী নয়, শস্যাদি ঐশ্বর্যদায়িনীও। অতএব, এই বিশ্বাসটির স্বরূপ উপলব্ধি করার জন্য পিছু হটে পৃথিবীর প্রাচীন সংস্কৃতি এবং আধুনিক যুগেও যে-সব মানবদল পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে আটকে থেকেছে তাদের আচারঅনুষ্ঠান, সম্যকভাবে বিচার করা দরকার। সে-বিচারের সাহায্যে আমর আমাদের সংস্কৃতির এই অঙ্গটিকে চিনতে পারবে এবং চিনতে পারবে৷ বলেই তা থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করতে পারবো(৫৪১)।
আমরা একটু পরেই পৃথিবীর প্রাচীন সংস্কৃতির নানা দৃষ্টান্ত এবং পিছিয়ে-পড়া মানুষদের নানান আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা তুলবো। তার আগে দেখা যাক, তান্ত্রিকেরা নারী-জননাঙ্গের উপর যে এতোখানি গুরুত্ব আরোপ করছেন তার মূলে এই বিশ্বাসটিই বর্তমান আছে যে, নারী-জননাঙ্গের স্পর্শেই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বর্ধিত হবে।
তন্ত্রে একজাতীয় চিত্রের ব্যবহার আছে। সেগুলিকে যন্ত্র বলে।
যন্ত্ৰ সাধারণত দুই প্রকার—পূজাযন্ত্র ও ধারণ-যন্ত্র। পুজাযন্ত্রে যে দেবতার পূজা করিতে হইবে, সেই দেবতার যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া তাহাতে পুজা করিতে হয়। ঐরূপ যন্ত্রকে পূজাযন্ত্র বলা হয়।
যে যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া ধারণ করা হয় তাহার নাম ধারণ-যন্ত্র। এই ধারণ-যন্ত্র ভূৰ্জপত্রে অঙ্কিত করিয়া ধারণ করিতে হয়।(৫৪২)
যন্ত্র নামের এই চিত্রগুলির তাৎপর্য কী?
তন্ত্রে লিখিত আছে,–দেবতার অধিষ্ঠান হইয়া থাকে, এই জন্য যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া দেবতার পুজা করিতে হয়।(৫৪৩)
আমরা সাধারণত এই জাতীয় একটা ব্যাখ্যাই সহজে গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রগুলি যে পূজা, দেবতা ইত্যাদি আধ্যাত্মিক বিষয়ের চেয়ে প্রাচীনতর,—অর্থাৎ, পূজা ও দেবতাদির বিষয় পরে কৃত্রিমভাবে যন্ত্রগুলির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে,—যন্ত্রগুলিকে ভালো করে পরীক্ষা করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমত, মোটের উপর একই চিত্রের সরে বিভিন্ন দেবদেবীর সম্পর্ক যা ঐক্য পরিকল্পিত হয়েছে(৫৪৪)। তার থেকেই বোঝা যায়, উক্ত সম্পর্কাদির চেয়েও যন্ত্রগুলি প্রাচীনতর। দ্বিতীয়ত, বহু যন্ত্রের সঙ্গেই যন্ত্রসংযুক্ত দেবতাটির স্পষ্ট বিরোধ দেখা যায়। আধুনিক তান্ত্রিক গ্রন্থাদিতে কয়েকটি প্রসিদ্ধ যন্ত্রের নাম হলো, গণেশযন্ত্র, শ্রীরামযন্ত্র, নৃসিংহযন্ত্র, গোপালযন্ত্র, কৃষ্ণযন্ত্র, শিবযন্ত্র, মৃত্যুঞ্জয়যন্ত্র ইত্যাদি(৫৪৫)। উল্লেখিত দেবতাগুলি সকলেই পুরুষ। অথচ, যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র।
তান্ত্রিক যন্ত্রগুলি যে নারী-জননাঙ্গের প্রতীকমাত্র, এ-বিষয়ে ইতিপূর্বেই দক্ষ বিদ্বানেরা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ঐচক্রপূজা প্রসঙ্গে স্যর ভাণ্ডারকরণ(৫৪৬) বলছেন :
It consists in the worship of picture of the female organ drawn in the centre of another consisting of a representation of nine such organs, the whole of which forms the Sricakra….The pictures are drawn on a bhurja leaf or a piece of silken cloth or a gold leaf of silken cloth or a gold leaf. ইত্যাদি।
