বলাই বাহুল্য, ওই আদিম বিশ্বাসটির উপরে এখানে পূজা, মোক্ষ ইত্যাদি নানাবিধ আধুনিক শব্দের পলি পড়েছে। তবু, তাকে অনুসন্ধান করবার জন্যে অন্তত একটি সূত্র উপরের উদ্ধৃতির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। সূত্রটি হলো, ‘লতা’ শব্দের ব্যবহার। কেননা, তন্ত্র-সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের একটি পারিভাষিক অর্থ আছে। সে-অর্থ হলো, নারী-জননাঙ্গ। এখানে কয়েকটি নমুনা উদ্ধৃত করা যায় :
ততঃ পরলতাসক্তঃ পুনঃকাৰ্য্যং তথৈব চ॥(৫২৯)
কিংবা,
নগ্নাং পরলতাং পশ্যন্ জপেৎ মন্ত্রমনন্যধীঃ॥(৫৩০)
কিংবা,
মহাপূজাং প্রকুর্ব্বীত লতামণ্ডলমধ্যগঃ॥(৫৩১)
কিংবা,
লতাভির্কেটিতে ভূত্বা জপেয়ন্ত্ৰমনন্তধীঃ॥৩২
কিংবা,
রাত্রে তাম্বলপুরান্তে লতামগুলমধ্যগঃ॥(৫৩৩)
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
তন্ত্র-বিষয়ে যাঁরা অভিজ্ঞ তারা এই ‘লতা’ শব্দের তাৎপর্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন না। কিন্তু কোন্ বিশ্বাসের প্রভাবে উদ্ভিদ-বোধক এই শব্দটিই নারী-জননাঙ্গ-বোধক শব্দে পরিণত হয়েছে তার আলোচনা সাধারণত তোলা হয় না। অথচ, সে-আলোচনা বাদ দিয়ে তন্ত্রের আদি-তাৎপর্য কী করে নির্ণয় করা সম্ভব?
এই প্রসঙ্গেই তন্ত্রের একটি চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা যায়। তন্ত্রকাররা প্রশ্ন তুলেছেন, কী কী লক্ষণ থাকলে তন্ত্র বলা হবে? এবং উত্তরে বলছেন, সেই লক্ষণগুলির মধ্যে একটি হলো তরু-উৎপত্তি বিষয়ের বর্ণনা : “উৎপত্তির্বিবুধানাঞ্চ তরূণাং কল্পসংজ্ঞিতম্” (৫৩৪)।
তন্ত্রে শুধুও যে ওই পারিভাষিক অর্থে লতা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তাই নয়। লতা-সাধনা বলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধনারও নির্দেশ রয়েছে। এ-সাধনাও অতি গোপন,—উপরোক্ত সাধনার মতোই গুহ্যৎ গুহ্যতরং। এবং অতি কঠিন এই সাধনা :
বরং ফণী ধরিয়া বিষভক্ষণ করা সহজ, বরং সিংহশার্দুলের সহিত যুদ্ধ করা সহজ, কিন্তু লতা-সাধনা অতি কঠিন, অতি কঠোর।(৫৩৫)
এ-হেন গুহ্য ও কঠিন লতা-সাধনার মূল কথাটা কী? হুবহু উপরোদ্ধৃত ভগযাগের মতোই :
এই সাধনার প্রধান অধিকরণ স্ত্রী, এইজন্য ইহাকে লতাসাধনা কহে। এই সাধনার বিষয় তন্ত্রে বর্ণিত হইয়াছে..
লতায়াঃ সাধনং বক্ষ্যে শৃণুম্ব হরবল্লতে।
শতং কেশে শতং ভালে শতং সিন্দুরমগুলে।
স্তনদ্বয়ে শতদ্বন্দ্বং শতং নাভৌ মহেশ্বরি।
শতং যোনী মহেশানি উত্থায় চ শতত্ৰয়ম্ ॥
এবং দশশতং জপ্ত্বা সৰ্ব্বসিদ্ধিশয়ো ভবেৎ।
অথান্যৎ সংপ্রবক্ষ্যামি সাধনং ভূবি দুর্লভম্।
রজোহবস্থাং সমানীয় তদ্ যোনৌ স্বেষ্টদেবতাম্।
পূজয়িত্বা মহারাত্রৌ ত্রিনিদং পূজয়েন্মনুম্।
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
।।ভাবাৰ্থ; বিশ্বকোষ, ১৭ খণ্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।।
বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক রুচি ও নীতিবোধের কাছে এই জাতীয় চিন্তাধারা বীভৎস কামবিকারের পরিচায়কমাত্র এবং আমাদের আধুনিক জ্ঞানের দিক থেকে এই জাতীয় ব্যবস্থাকে কোনো প্রকার সাধনপদ্ধতি মনে করবার মতো উৎকট ও অসম্ভব ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না। এবং এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের আধুনিক রুচিবোধ, নীতিবোধ এবং ধ্যানধারণাগুলি অমূলক নয়। তাই বীভৎস কামবিকার বা উৎকট ও অসম্ভব ধারণার তাগিদ ছাড়া আজকের দিনে তন্ত্রসাধন-পদ্ধতিতে প্রেরণা পাবার কথা অচিন্তানীয়। একথা ভুলে গিয়ে আজকের দিনে যদি কোনো দেশবাসী জনৈক বিদেশী বিচারকের তন্ত্রবিচারে মুগ্ধ হয়ে এই লতাসাধনাদির মধ্যেই অতীব উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক ধারণা আবিষ্কার করেন তাহলে তার উদ্ভাবনশক্তি দেখে স্তম্ভিত হলেও আমরা মানতে বাধ্য হবে যে, দেশের মানুষকে তিনি এক অন্ধ বিকৃতির মধ্যেই আবদ্ধ রাখতে চাইছেন। কিন্তু শুধু এইটুকু বললেই তান্ত্রিক সাধনাদি সম্বন্ধে সব কথা বলা হয় না। কেননা, এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, ভারতীয় সংস্কৃতির, বিশেষ করে বাংলা দেশের সংস্কৃতির চোদ্দ আনার উপরই হলো তান্ত্রিক।
বাস্তবিক এখন ভারতের সর্বত্রই, বিশেষত এই বাংলাদেশে যে-সকল ক্রিয়াকাণ্ড ও পূজাপদ্ধতি প্রচলিত, তাহা সমস্তই তান্ত্রিক।(৫৩৬)
এ-কথাকে অতিশয়োক্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই প্রশ্ন ওঠে; নিছক কামবিকার, বা অন্তঃসারশূন্য আজগুবি ধারণামাত্র, একটি জাতির সাংস্কৃতিক জীবনকে কী করে এমন গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করতে পারলো? এ-প্রশ্নের মাত্র দুটি উত্তর সম্ভবপর। এক, পুরো জাতটাই হলো কামবিকারগ্রস্থ। দুই, আধুনিক যুগের পটভূমিতে এই সব তান্ত্রিক ধ্যানধারণা বা সাধন-পদ্ধতির পরিণাম যাই হোক না কেন, এগুলির আদি-তাৎপর্য নিশ্চয়ই অন্য রকম ছিলো। অর্থাৎ, সমাজ-বিকাশের কোনো এক পর্যায়ে এই জাতীয় ধ্যানধারণা এবং সাধন-পদ্ধতিই বাস্তব অর্থে উদ্দেশ্যমূলক ছিলো, জীবনের কোনো এক বাস্তব তাগিদ মেটাতে চেয়েছিলো। আমরা এই দুটি সম্ভাবনার মধ্যে প্রথমটিকে অমূলক বলে প্রত্যাহার করতে চাই : পুরো জাতটাকে কামবিকারগ্রস্ত বলে কল্পনা করবার কোনো কারণ নেই। অর্থাৎ আমরা দেখতে চাই : আধুনিক যুগের পটভূমিতে ওই তান্ত্রিক সাধনাদি যতো বীভৎস বিকৃতি বলে প্রতীয়মান হোক না কেন, সমাজবিকাশের যে-পর্যায়ে এগুলির উদ্ভব হয়েছিলো একমাত্র তারই পটভূমিতে এগুলির আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধান করা যাবে। এবং আমাদের দেশের উৎপাদন-কৌশলের উন্নতি ব্যাঘাতগ্রস্ত ও বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থেকেছে বলেই সমাজবিকাশের সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণা এবং আচার-অনুষ্ঠানের স্মারক এমন জোরালোভাবে আমাদের সংস্কৃতিকে আধুনিক কাল পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় –
