প্রাচীন মাতৃমূর্তির পরিকল্পনায় যদি জননাঙ্গকেই ক্রমশ নারীদেহের প্রধানতম অবয়ব বলে গ্রহণ করবার চেষ্টা দেখা যায় তাহলে স্বভাবতই কৃষিভিত্তিক প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে নারীদেহের অন্যান্য অবয়ব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র যোনি বা নারী-জননাঙ্গের মূর্তি খুঁজে পাওয়া বিস্ময়ের ব্যাপার হবে না। হরপ্পা-মোহেনজোদারোর(৫২৩) ও ধ্বংসস্তৃপ থেকে খুঁজে পাওয়া এই জাতীয় একটি মৃন্ময় মূর্তির ছবি এখানে উদ্ধৃত করা গেলো।
মোহেনজোদারোর মানুষেরা এ-জাতীয় যোনি-মূর্তি রচনা করেছিলো কেন? এর পিছনে নিশ্চয়ই প্রজননের কামনা ছিলো। কিন্তু শুধুমাত্র প্রজননের কামনাই নয়। তার সঙ্গে জড়িত ছিলো ধনোৎপাদনের কামনাও— কৃষিকাজের সাফল্য-কামনাও। কেননা এই যোনি-মূর্তি মানব-বিশ্বাসের এমন এক স্তরের সাক্ষ্য বহন করছে, যেখানে শুধুমাত্র সন্তান-উৎপাদনই নয়—প্রাকৃতিক উৎপাদনও—নারী জননাঙ্গের উপর নির্ভরশীল।
এই বিশ্বাসের এক অত্যাশ্চর্য মূর্ত প্রমাণ হরপ্পার ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। আমরা ইতিপূর্বে ৩৫৭ পৃষ্ঠায় হরপ্পার সেই সিলটির ছবি উদ্ধত করেছি।
কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসটির স্মারক সিন্ধুসভ্যতার মধ্যেই পরিসমাপ্ত নয়।
স্যর্ জন মার্সাল(৫২৪) বলছেন :
Although unique, so far as I am aware, in India, this striking representation of the Earth Goddess with a plant growing from her womb is not unnatural, and is closely paralleled by a terra cotta relief of the early Gupta age, from Bhita in the United Provinces, on which the Goddess is shown with her legs in much the same posture, but with a lotus issuing from her neck instead of from her womb.
আমি যতোদূর জানি, গর্ভসঞ্জাত লতাগুল্মসহ এ-জাতীয় বসুমাতা-মূর্তি যদিও ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে অনুপম, তবুও একে অস্বাভাবিক মনে করবার কোনো কারণ নেই। যুক্তপ্রদেশের ভিটা থেকে পাওয়া গুপ্তযুগের শুরুর দিকের একটি পোড়ামাটির ভাস্কৰ্য-নিদর্শনের সঙ্গে এর নিকট সাদৃশ্য রয়েছে : সেই নিদর্শনে দেখা যায় দেবীর পায়ের ভঙ্গি হরপ্পার ওই সিলটির বসুমাতা-মূর্তির মতোই, কেবল তার গর্ভ থেকে লতা বের না হয়ে ঘাড় থেকে পদ্মফুল বের হয়েছে।
দেবীর নাম ভগবতী। এই নামকরণ থেকেই অনুমান করা যায়, দেবীর সমস্ত অঙ্গের মধ্যে জননাঙ্গটিকেই প্রধানতম বলে বিবেচনা করা হয়েছে। কেন করা হয়েছে। তার কারণ, এর মূলেও প্রাচীন বিশ্বাসের সেই পর্যায়টিরই স্বাক্ষর খুঁজে পাওয়া যায় : নারী-জননাঙ্গ শুধুমাত্র সন্তান-এর উৎস নয়, পার্থিব ঐশ্বর্যের উৎসও :
অণিমাদি অষ্টবিধ ঐশ্বৰ্ষ, সমগ্র বীর্য, সমগ্ৰ যশ, সমগ্র ঐ, সমগ্র জ্ঞান এবং সমগ্র বৈরাগ্য—এই ষড়ৈশ্বর্ষের নাম ভগ।
ঐশ্বৰ্য্যস্য সমগ্ৰস্য বীৰ্য্যস্য যশসঃ শ্রিয়ঃ।
জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব যণ্ণাং ভগ ইতীরিত: ॥ ২৬
কোন আদিম বিশ্বাসের প্রভাবে নারী-জননাঙ্গবাচক শব্দটিই ষড়ৈশ্বর্যবাচক শব্দে পরিণত হয়েছে,—সে-বিষয়ে নিশ্চয়ই ভেবে দেখবার প্রয়োজন আছে।
আপত্তি উঠতে পারে, ভগ বলতে আদিতে জনৈক বৈদিক দেবতাকেই(৫২৭) বোঝাতো। ঐশ্বর্য বিতরণই ছিলো সে-দেবতার বৈশিষ্ট্য। তাই, এ-শব্দের যড়ৈশ্বৰ্য-বাচকত্বের উৎপত্তি সেই দেবতার নাম থেকে হওয়াও অসম্ভব নয়।
উত্তরে বলা যায়, এ-কথা সত্যি হলেও এই প্রসঙ্গেই ওই আদিম বিশ্বাসটির কথা অপ্রধান হবে না। কেবল, সমস্যাটাকে একটুখানি অন্যদিক থেকে ভেবে দেখতে হবে : আদিতে যে-নাম ছিলো ঐশ্বর্যবাচক বা ঐশ্বর্যবিতরণ-মূলক, সেই নামই নারী-জননাঙ্গবাচক হয়ে দাঁড়ালো কী করে? এ-প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তরই পাওয়া সম্ভবপর : নারী-জননাঙ্গকেই পার্থিব ঐশ্বর্ষের উৎস বলে বিশ্বাস করা হয়েছিলো, তাই।
এই আদিম বিশ্বাসটির দিক থেকে তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলিকে কতোখানি বুঝতে পারা সম্ভব তাই দেখা যাক।
প্রথমত, তন্ত্রমতে নারী-জননাঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ‘স্ত্রীভগং পূজনাধারঃ'(৫২৮) বা এইজাতীয় কথা তন্ত্রে বহুবার পাওয়া যায়। বস্তুত, তন্ত্রের একটি প্রসিদ্ধ সাধনার নামই হলো ভগযাগ :
তথাপি প্রত্যয়ো নো চেৎ ভগযাগমখাচরেং।
কামিনীং যুবতীং যত্বাং পুষ্পিতাঞ্চ বিশেষতঃ ॥
তামানীয় প্রযত্বেন স্বঞ্চ ভূষপমাচরেং।
তামূর্ত্তেং স্বয়ং গন্ধৈররভূষণৈর্ব্বসনৈস্তথা ॥
মিষ্টান্নৈর্তোজয়িত্ব চ ভক্ত্যা পরময়া শিবে।
তাং বিবস্ত্রাং বিধায়ৈব স্থাপয়েদুর্দ্ধতল্লপে ॥
তত: পুজাং বিধায়ৈৰ নানাসভারসংযুতৈঃ।
তত্রৈব রময়েৎ যন্ত্রং রক্তচন্দনযাবকৈঃ ॥
ভগনামাং ভগপ্রাণাং ভগদেহাং ভগস্তনীং।
পুজয়েদষ্টপত্রেষু মধ্যে দেবীং প্রপুজয়েৎ ॥
রক্তগন্ধৈঃ রক্তমালৈা: রক্তবস্ত্রৈর্মনোরমৈঃ।
পুজয়েম্ভক্তিতে মন্ত্রী দেবীদর্শনকাম্যয় ॥
এতস্মিন সময়ে দেবী রতিমিচ্ছতি সা যদা।
লতান্ত রময়েদেবী যাবস্কোমং করোতি ন ॥
পুস্পিনী মকরলেন ততো হোমং সমাচরেং।
ওঁ নমস্তে ভগমালায়ৈ ভগন্ধপধরে শুভে ॥
ভগন্ধপে মহাভাগে ভোগমোক্ষৈকদায়িনী।
ভগবত্যাঃ প্রসাদেন মম সিদ্ধির্ভবিষ্যতি ॥
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
(তর্জমা : বিশ্বকোষ, ৭ম খণ্ড, ৫২৭ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
