তান্ত্রিক যন্ত্রগুলি নিয়ে আলোচনা তোলবার আগে ওই প্রাকৃত বিশ্বাসটির ক্রমবিকাশ সংক্রান্ত সামান্য আলোচনার অবতারণা করবো।
আমাদের আলোচনা এখানে কিছুটা বিক্ষিপ্ত হতে পারে। তাই আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে শুরু করাই বাঞ্ছনীয় হবে।
প্রথমত, আমরা দেখবার চেষ্টা করবো যে আদিম মানুষ ক্রমশই নারী জননাঙ্গকেই প্রজনন-শক্তির আধার বলে চেনবার চেষ্টা করেছে।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃতির ফলপ্রসূতাকে আয়ত্তে আনবার আশায় আদিম মানুষ স্বভাবতই ওই জননাঙ্গকেই অসামান্য গুরুত্ব দিয়েছে।
তৃতীয়ত, এই পর্যায়ের আদিম বিশ্বাসটির দিক থেকেই তন্ত্রের লতাসাধনা, ভগযাগ ও যন্ত্রগুলিকে বোঝবার সুযোগ আছে।
অতএব, পৃথিবীর নানান জায়গায় আজো যে-সব মানবদল পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় আটকে রয়েছে তাদের বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানকে বিশ্লেষণ করলে তন্ত্রের এই আপাতঃ-দুর্বোধ্য দিকগুলির উপর আলোকপাত হতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিকের যে-আদিমতম মাতৃমূর্তিটি আবিষ্কার করতে পেরেছেন তার নাম দেওয়া হয় ‘ভিলেন্ডর্ফের ভেনাস’ বা ‘Venus of Willendorf’৷ এই মূর্তিটি প্রত্ন-প্রস্তর যুগে রচিত হয়েছিলো। আবিষ্কৃত হবার সময় দেখা যায়, মূর্তিটির গায়ে লাল গিরিমাটি মাখানো। অতএব, অনুমিত হয়, মূর্তিটি আধুনিক অর্থে শিল্প-নিদর্শন হতে পারে না। এর সঙ্গে জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠানাদির সম্পর্ক নিশ্চয়ই ছিলো।
মূর্তিটি গড়বার সময় শিল্পীর চেষ্টা ছিলো, নারীদেহের অন্যান্য অবয়বের অনুপাতে স্তনদ্বয়কেই প্রধানতম করে দেখানে : এর চোখমুখ প্রভৃতি স্পষ্টভাবে গড়বার কোনো উৎসাহই চোখে পড়ে না।
আদিম শিল্পীর এ-রকম প্রচেষ্টা কেন? উত্তরে প্রজনন-সংক্রান্ত আদিম ধারণার ক্রমবিকাশের আলোচনা তোলা দরকার।
আদিম মানুষের পক্ষে প্রজননের প্রকৃত রহস্য অনুমান করা সম্ভব নয়। তারা মৈথুনের সঙ্গে প্রজননের সম্পর্ক দেখতে শেখেনি। আধুনিক পণ্ডিতেরা(৫১৫) আদিম মানুষের এই অজ্ঞতার নানা রকম স্বাভাবিক কারণ অনুমান করে থাকেন। মৈথুনের অনুপাতে গর্ভসঞ্চারের দৃষ্টান্ত অবশ্যই দুর্লভ; তাই প্রাচীন মানুষদের পক্ষে মৈথুনকেই গর্ভসঞ্চারের কারণ মনে করা স্বাভাবিক নয়। ফলে, গর্ভসঞ্চার সংক্রান্ত নানারকম অবাস্তব ধারণা প্রশ্রয় পাওয়াই স্বাভাবিক। বস্তুত, পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে এ-জাতীয় নানা ধারণা দেখতে পাওয়া যায় এবং রূপকথা ও লোককথায় তার স্মারক খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।
এ-জাতীয় ধারণার মধ্যে অত্যন্ত প্রাকৃত পর্যায়ের একটি ধারণা(৫১৬) হলো, সন্তানের প্রথম আবির্ভাব হয় নারীর বক্ষদেশে; তারপর বক্ষস্থল থেকে সন্তান পেটের দিকে নেমে আসে। পেটের মধ্যে জরায়ু প্রভৃতি অঙ্গের কথা এই পর্যায়ের চিন্তাধারায় উদিত হয়নি। এই পর্যায়ের ধারণায় তাই স্তনদ্বয়ই প্রধানতম জননাঙ্গ। আধুনিক বিদ্বানের এ-জাতীয় ধারণার ব্যাখ্যা হিসেবে অনুমান করছেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থার প্রথম লক্ষণ স্তনদ্বয়েই দেখা যায়।

ব্রিটিশ নিউগিনির সিনাউগোলোদের(৫১৭)মধ্যে আজো এই আদিম ধারণাটি টিকে থাকতে দেখা যায়। এবং এই ধারণাটির দিক থেকে শুধুই যে ওই ভিলেনডর্ফের ভেনাস-মূর্তিটির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তাই নয়; এ্যাস্টেক্স্রা(৫১৮) বসুমাতার মূর্তি কল্পনা করে বহু স্তনবর্তী নারী হিসেবেই। গ্রীক দেবলোকের আর্টেমিসও আদিতে বসুমাতা-মাত্রই ছিলেন এবং এফিসস্-এ(৫১৯)। তাঁকেও বহু স্তনবতী বলেই কল্পনা করা হতো। প্রাচীনচেতনার কলা-কৌশল হিসেবে কোনো একটি অঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হলে হয় অঙ্গটিকে অস্বাভাবিকভাবে বড়ো করে চিন্তা করা হবে আর না হয় তো তার সংখ্যাবৃদ্ধি করা হবে। এখানে প্রত্ন-প্রস্তর যুগের আর একটি মাতৃমূর্তির(৫২০) ছবি উদ্ধৃত করা হলো; এই মূর্তিটির স্তনদ্বয়কেও অস্বাভাবিকভাবে বড়ে করে রচনা করা হয়েছে। কিন্তু সেইসঙ্গেই শিল্পী যেন নারী-জননাঙ্গ সম্বন্ধে-অন্তত গর্ভ সম্বন্ধে সচেতন হচ্ছেন।
প্রত্নতত্ত্বের সাক্ষের দিক থেকেই দেখতে পাওয়া যায়, জননাঙ্গ হিসেবেই মানুষ ক্রমশ নারীর যোনিকে চেনবার চেষ্টা করেছে। এখানে প্রত্ন-প্রস্তর যুগেরই আর একটি মাতৃমূর্তির ছবি উদ্ধৃত করা গেলো। এই মূর্তিটিতে অবশ্যই স্তনদ্বয়কে বাড়িয়ে বড়ো করে রচনা করবার চেষ্টা চোখে পড়ে; কিন্তু তাছাড়াও— বিশেষত মূর্তিটির বা হাতের নির্দেশ অনুসরণ করলে স্পষ্টই দেখা যায়,— শিল্পী যোনিকেও গুরুত্ব দেবার চেষ্টা করেছেন।
এর পর আমরা আরো তিনটি আদিম মাতৃকামূর্তির প্রতি মনোযোগ দেবার চেষ্টা করবো। তিনটিই অত্যন্ত প্রাচীন যুগের মূর্তি এবং শাক্ত মতবাদ যে প্রাচীন পৃথিবীর কতোখানি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছিলো তার নিদর্শন হিসেবেও এই তিনটি মূর্তির সাক্ষ্য মূল্যবান। অবশ্যই ওই সাদৃশ্য থেকে কেউ যদি সিদ্ধান্ত করতে চান যে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে ওই সুবিস্তীর্ণ এলাকা-জুড়ে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান প্রচলিত ছিলো, তাহলে আমাদের যুক্তির দিক থেকে সে-সিদ্ধান্ত খুব বেশি মূল্যবান হবে না। কেননা, আমরা দেখবার চেষ্টা করছি, এ-জাতীয় মূর্তি-রচনার পিছনে প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিযয় হলো বাস্তব প্রয়োজন বোধ। সেই প্রয়োজন বোধের সাদৃশ্যর দরুনই মূর্তিগুলির মধ্যেও অমন নিকট সাদৃশ্য। বস্তুত, ভারতবর্ষের মাটি খুঁড়ে পাওয়া আদিম মাতৃমূর্তির সঙ্গে অন্যান্য দেশের মাতৃমূর্তির কতোখানি মিল আছে তাই দেখাবার জন্যেই জনৈক আধুনিক গবেষক(৫২২) এই তিনটি আদিম মাতৃমূর্তিকে পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করতে বলেছেন। প্রত্নতত্বমূলক খননের ফলে ভারতবর্ষের সীমান্ত থেকে চিত্রে-প্রদর্শিত সর্ব-উপরের বাঁদিকের মূর্তিটি খুঁজে পাওয়া যাবার পর মেজর গর্ডন দাবি করেন পৃথিবীর অন্যান্য কোথাওই ঠিক এ-রকম মূর্তির পরিচয় পাওয়া যায় নি। অর্থাৎ কিনা, ও-জাতীয় মূর্তি অনুপম। তারই উত্তরে সিমোন কর্বিয়ান দেখাতে চেয়েছিলেন, অনুপম তো দূরের কথা, মেসোপটেমিয়ায় খুঁজে-পাওয়া, ৩০০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দের মূর্তির সঙ্গে এর সাদৃশ্য অত্যন্ত বিস্ময়কর। চিত্রে মেসোপটেমিয়ার মূর্তিটিকে ভারতবর্ষে পাওয়া মূর্তিটির ঠিক নিচে আঁকা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রাগৈতিহাসিক ইউক্রেনের মূর্তিটির সঙ্গেও এগুলির নিকট সাদৃশ্য রয়েছে।