প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির স্মৃতিচিহ্ন ওই মাতৃমূর্তিগুলিকেও তাই মানত-মূলক মনে না করে জাদুবিশ্বাস-মূলক মনে করাই সঙ্গত ও স্বাভাবিক। এবং সে জার্হবিশ্বাসের মূল কথা শুধুমাত্র মানবীর পক্ষে সন্তান-কামনাই নয়— প্রকৃতির ফলপ্রসূতার কামনাও।
স্যর জন মার্সাল যে-মূর্তিগুলিকে বিশেষ-করে মানত-মূলক উপচার বলে সন্দেহ করছেন সেগুলির মধ্যে প্রধানতই হলো, অস্তঃসত্ত্বা নারীর মূর্তি। মোহেনজোদারোর আমলে এই অন্তঃসত্ত্বা মাতৃমূর্তিগুলির তাৎপর্য মানত-মূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো কিনা, সে-আলোচনা স্বতন্ত্র। তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধানে আমাদের কাছে যে-বিষয়টি আপাতত সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তা হলো, এ-জাতীয় মূর্তিরচনার পিছনে আদিমতম মানববিশ্বাসের রূপটা কী রকম? কিংবা, কোন বিশ্বাস থেকে এই জাতীয় মূর্তি রচনার প্রেরণা জন্মেছে? আমাদের পদ্ধতি অনুসারে, সে-বিশ্বাসের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে আজকের পৃথিবীতেও যে-সব মানবদল পিছিয়ে-পড়া দশায় আটকে রয়েছে, তাদের ধ্যানধারণা পরীক্ষা করলে। বস্তুত, স্যর জন মার্সালের নিজের মন্তব্য বিশ্লেষণ করলেও এ-জাতীয় একটা যুক্তির উপরই নির্ভর করার পরিচয় পাওয়া যায়। সিন্ধুসভ্যতার মাতৃমূর্তি প্রসঙ্গেই তিনি(৫০৯) বলছেন, এ-দেশের কোনো কোনো আর্য-পূর্ব ট্রাইব কখনোই হিন্দুত্বের আওতায় এসে পড়েনি। কিন্তু এই অসভ্য মানুষগুলির মধ্যেই যে সভ্য মানুষদের ভুলে-যাওয়া অতীতকে দেখতে পাওয়া যেতে পারে, স্যর জন মার্সাল সে-সম্ভাবনার উপর সচেতনভাবে জোর দেননি।
অস্তঃসত্ত্বা মানবী সংক্রান্ত একটি আদিম বিশ্বাস হলো, তার স্পর্শে প্রকৃতি ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে।
জুলুদের(৫১০) মধ্যে দেখা যায়, শস্য-বৃদ্ধির কামনায় অন্তঃসত্ত্বা মেয়েরা শস্য পেশাই করে ক্ষেতের উপর ছড়িয়ে দিচ্ছে। সুমাত্রায় মিনাংদের(৫১১) মধ্যে প্রথা হলো, ধানের-গোলা তৈরি করবার সময় কোনো অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে কিছুটা চাল খেতে হবে, কেননা তাদের বিশ্বাস এইভাবেই ধানেধানে গোলা ভরে যাবে। নিকোবার দ্বীপের(৫১২) আদিবাসীদের বিশ্বাস, অন্তঃসত্ত্বা নারীর উপস্থিতির ফলে, বা বাগানে যদি অন্তঃসত্ত্বা নারী বৃক্ষরোপণ করে তাহলে বাগান সুফলা হবে। আদিম ও অসভ্য মানুষদের মধ্যে এ-জাতীয় ধারণা অত্যন্ত ব্যাপক এবং এমনকি ইয়োরোপের চাষীদের লোককথায় (৫১৩) আজো এ-জাতীয় বিশ্বাসের রেশ খুঁজে পাওয়া যায়।
The condition of the pregnant woman is often thought to have magical power, especially for fruitfulness……Probably for similar reasons pregnant cows were sacrificed at the Roman Fordicidia to the earth ‘pregnant with the seed’, the unborn calves burned, and their ashes used at the Parilia(৫১৪)।
বিশেষ করে প্রকৃতিকে সুফলা করবার ব্যাপারে প্রায়ই মনে করা হয়েছে যে, মানবীর অন্তঃসত্ব অবস্থার জাদুশক্তি আছে।..খুব সম্ভব এই কারণেই রোমান ফর্ডিসিডিয়ায় বীজগর্ত পৃথিবীর কাছে অন্তঃসত্বা গাভী বলি দেওয়া হতো, পেরিলিয়ায় বাছুরের ভ্রূণ পুড়িয়ে তার ছাই ব্যবহার করা হতো।
——————-
৪৯২. M. Monier-Williams RTLI 57-8.
৪৯৩. E. W. Hopkins RI542.
৪৯৪. Oppert OII 574.
৪৯৫. J. Marshall op. cit. 1:48.
৪৯৬. G. Thomson SAGS 246.
৪৯৭. J. Marshall op cit. 1:51.
৪৯৮. S. Radhakrishnan HPEW 401.
৪৯৯. Ibid. 402.
৫০০. O. R. Ehrenfels MRI-a# sạtvề đề Tiafõẽ #*I
৫০১. J. Marshall op. cit. 1:57.
৫০২. Ibid.
৫০৩. G. Thomson SAGS 238. cf. G. Thomson AA4: “Since the function of all social institutions, alien or indigenous, is to satisfy some need, the origin of this or that custom is not explained by saying that this was borrowed from abroad. As Ferguson remarked, ‘nations borrow only what they are nearly in a condition to have invented themselves’ “.
৫০৪. G. Thomson SAGS 239.
৫০৫. Ibid. 238.
৫০৬. Ibid. 246.
৫০৭. Ibid. 245.
৫০৮. Ibid. 246.
৫০৯. J. Marshall op. cit. 1:52.
৫১০. ERE 10:244.
৫১১. Ibid.
৫১২. Ibid.
৫১৩. Ibid.
৫১৪. Ibid.
৩৩. প্রজনন ও জননাঙ্গ : লতাসাধনা ও তান্ত্রিক যন্ত্র
প্রজনন ও জননাঙ্গ : লতাসাধনা ও তান্ত্রিক যন্ত্র
ওই আদিম মাতৃপ্রধান বা শক্তিপ্রধান সংস্কৃতির সমস্ত দিক নিয়ে আলোচনার অবকাশ স্বভাবতই এখানে পাওয়া যাবে না। তার বদলে আমরা আদিমাতৃকা সংক্রান্ত বিশ্বাসের বিশেষ করে সেই দিকগুলিরই আলোচনা তুলবো, যেগুলি আমাদের তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার উপর আলোকপাত করতে পারে।
তন্ত্র-সাধনায় এক রকম চিত্রের ব্যবহার আছে। সেগুলিকে যন্ত্র বলে। যন্ত্রগুলি স্ত্রী-জননাঙ্গের প্রতীক। আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, কৃষিকেন্দ্রিক জাদু-বিশ্বাস থেকেই এই যন্ত্রগুলির উদ্ভব হয়েছে : ক্রমোন্নতির কোনো এক পর্যায়ে মানুষ এই নারী-জননাঙ্গকেই প্রজননের মূল কারণ বলে কল্পনা করেছে আর তাই তারই সাহায্যে প্রকৃতির উর্বরা-শক্তির বৃদ্ধি ও বিকাশকে আয়ত্তে আনতে চেয়েছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে প্রজনন রহস্য উদ্ঘাটন-প্রচেষ্টারও একটা ইতিহাস আছে : নারী জননাঙ্গকেই প্রজননের অন্যতম কারণ বলে কল্পনা করবার আগে মানুষ অন্যভাবে প্রজনন-রহস্য বোঝবার চেষ্টা করেছে এবং সেই বোধের উপর নির্ভর করেই সে-পর্যায়ের মানুষ প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাকে আয়ত্তে আনবার চেষ্টা করেছে।
