ডানিউব-সংস্কৃতির প্রথম পর্যায়ে (Phase I) সামান্য কিছু কিছু ছোটো স্ত্রীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এ-জাতীয় মূর্তি পাওয়া গিয়েছে অজস্র। তৃতীয় পর্যায়ে এ-জাতীয় মূর্তি অনুপস্থিত। তার মানে, ওই প্রাচীন সংস্কৃতির মামুষের যে-পার্থিব প্রয়োজনের দরুন এ-রকম মূর্তি গড়েছে, তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছবার পর সে-প্রয়োজনের তাগিদ নিশ্চয়ই কমে গিয়েছিলো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই তৃতীয় পর্যায়ের জীবন-যাপন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য কী? অধ্যাপক গর্ডন চাইল্ড দেখাচ্ছেন, তৃতীয় পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য হলো, পশুপালন ও যুদ্ধবিগ্রহ। যদি ভাই হয় তাহলে সে-পর্যায়ে শুধুই যে মেয়েদের মহিমা ক্ষুণ্ণ হবার কথা তাই নয়, পৃথিবীতে উর্বর-শক্তি সঞ্চার করবার তাগিদও শিথিল হওয়া সম্ভবপর।
রুমানিয়ার গুমেলনিটা-সংস্কৃতির প্রথম পর্যায়ে দেখা যায় ছোটো ছোটো অজস্র মৃত্তিকা-মূর্তি—সমস্তই নারীমূর্তি। দ্বিতীয় পর্যায়ে নারীমূর্তির অভাব নেই কিন্তু তারই সঙ্গে পুরুষ-মুর্তির আবির্ভাবও চোখে পড়ে। ওমেলনিটা-সংস্কৃতির ধ্বংসস্তূপের উপর আর একটি পরবর্তী সংস্কৃতির স্বাক্ষর পাওয়া যায়। তার বৈশিষ্ট্য হলো, পাথরের তৈরী তীরের ফলক আর যুদ্ধের কুড়ুল। এই সংস্কৃতির স্বাক্ষরগুলির মধ্যে নারীমূর্তি চোখে পড়ে না।
অধ্যাপক জর্জ টম্সন এ-জাতীয় প্রত্নতত্ত্বমূলক আরো প্রমাণের উল্লেখ করছেন। সেগুলি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, একই স্থানে এবং একই জাতির মানুষদের বেলায় জীবনধারণ পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন দেখা দেবার ফলে এ-জাতীয় নারীমূর্তি রচনার প্রেরণাও ফুরিয়ে গিয়েছে। তার থেকেই অনুমান করা যায় যে, মাতৃমূর্তি-রচনার এই প্রেরণাটি মানবমনের কোনো শাশ্বত বা সনাতন বৃত্তির বিকাশ নয়; তার বদলে এর মূলে রয়েছে জীবনধারণ সংক্রান্ত পার্থিব প্রয়োজন। সেই একই প্রয়োজনের তাগিদে স্বতন্ত্র দেশের মানবদল পরস্পর নিরপেক্ষভাবেই মাতৃমূর্তি রচনায় মন দিতে পারে। কিংবা প্রত্নতত্ত্বের নজির থেকে যদি এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, ওই সুদূর প্রাগৈতিহাসিক যুগে এ-দেশের মাতৃকাতন্ত্র ওদেশের মাতৃকাতন্ত্রকে প্রভাবিত করেছে তাহলেও, ‘এই প্রভাব কী করে সম্ভবপর হলো?’ সে-প্রশ্নের উত্তরে মানতেই হবে, জীবন-সংগ্রামের চাহিদার দরুন ওদেশের মানুষও নিশ্চয়ই একই পার্থিব প্রয়োজন বোধ করেছিলো—তা না হলে, এই মাতৃকাতন্ত্রের বিকাশের জন্য তাদের মনে উপযুক্ত জমিই তৈরি হবার কথা নয়।
স্যর জন মার্সালের যুক্তি অনুসরণ করে আমরা যদি এই মাতৃমূর্তিগুলিকে শক্তিবাদের বাস্তব প্রতীক বলে গ্রহণ করতে রাজি হই তাহলে আমাদের পক্ষে স্বীকার করা প্রয়োজন, শাক্ত-মতবাদের প্রকৃত তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করবার কাজে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হবে, এ-মতবাদ মানবউন্নতির কোন ধরনের পর্যায়ে ঠিক কোন ধরনের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিলো?
প্রত্নতত্ত্বলব্ধ ওই মাতৃমূর্তিগুলি যে উর্বর-শক্তির কামনাতেই রচিত হয়েছিলো—এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ। কিন্তু ওই প্রাচীন মানুষদের কাছে উর্বরা-শক্তির কামনা বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছে এবং এই মাতৃমূর্তিগুলির সাহায্যে তারা কী ভাবে সে-কামনা সফল করবার চেষ্টা করেছে—এ-বিষয়ে স্পষ্টতর ধারণা পাবার প্রয়োজন আছে।
আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, এ-বিষয়ে একটা মত হলো, মূর্তিগুলি মানতমূলক। মাতৃত্বের কামনায় মেয়েরা তখনকার কালে এ-জাতীয় মাতৃমূর্তি মানত করতো। শুধুই যে মোহেনজোদারোর মাতৃমূর্তিগুলি প্রসঙ্গে এই জাতীয় মানত-মূলক মনোভাবে অনুমান করা হয়েছে তাই নয়, প্রাগৈতিহাসিক গ্রীসের এ-জাতীয় মূর্তিকেও অনেকে মানত-মূলক মনে করেছেন। কিন্তু অধ্যাপক জর্জ টম্সন(৫০৬) দেখাচ্ছেন, এই মানত-মূলক উপচার (Votive offerings) বলে শব্দকে পরিহার করাই বাঞ্চনীয়। কেননা, তার দরুন, বিষয়টি সম্বন্ধে আমাদের একটা সংস্কারগত ধারণ হতে পারে। এ-কথায় কোনো সন্দেহ নেই যে, ওই মূর্তিগুলির মধ্যে বিশেষ করে পরের যুগের মূর্তিগুলি মানতমূলক বলেই মনে হয়; কিন্তু এগুলির সবই মানত-মূলক নয়। এবং,
…their neolithic antecedents must have belonged to predeistic cults in which the very idea of an offering was unknown(৫০৭).
এগুলির অগ্রবর্তী নব্যপ্রস্তরযুগের মূর্তিগুলি নিশ্চয়ই প্রাক্-ঈশ্বর পর্যায়ের অনুষ্ঠানাদির অন্তর্গত, ঘে-পর্যায়ে পুজোপচারের ধারণাটিই অজ্ঞাত ছিলো।
মানত করে এবং মনোবাঞ্ছা পূরণ হলে পর যে-পুজোপচার দেওয়া হয় তাকেই মানত-মূলক উপচার বলে : আপনি বিপদে পড়েছেন, আপনি তখন ঈশ্বরের কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে আপনি তাকে অমুক বা তমুক জিনিস দেবেন। প্রায়ই দেখা যায়, মনোবাঞ্ছা পূরণ হবার আগেই প্রতিশ্রুত দ্রব্য ঈশ্বরকে দেওয়া হচ্ছে। আজকের দিনে যাঁরা মানসিক করছেন তারা হয়তো এই বলে সান্ত্বনা পেতে পারেন যে, তাদের পক্ষে সবটাই ঈশ্বরভক্তির পরিচয়। আসলে কিন্তু তা নয়। এর মূলে রয়েছে অত্যন্ত আদিম পর্যায়ের এক জাতীয় বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান। গ্রীসে গরু ভেড়ার রোগ হলে চাষিরা মাটির ষাঁড় গড়ে মন্দিরে দিয়ে আসতো, দেবী ডিমিটর যাতে মাটির ষাঁড় পেয়ে আসল ষাঁড়কে বাঁচিয়ে দেন। ঘটনাটিকে মানত হিসেবে দেখতে গেলে, দেবীকে খুশি করবার বদলে বরং বোকা বানাবার চেষ্টাই চোখে পড়ে : নকল ষাঁড়ের বদলে তার কাছ থেকে আসল ষাঁড় আদায় করে নেবার চেষ্টা। দেবীই বা কেমন বুদ্ধিমতী যে ওই রকম একটা বাজে জিনিস পেয়ে খুশি হয়ে তার বদলে অমন ভালো জিনিস দিয়ে বসবেন? আসল কথা হলো, এই পুরো ঘটনাটির পিছনে অত্যন্ত প্রাকৃত পর্যায়ের একরকম বিশ্বাস টিকে রয়েছে—তারই নাম জাদুবিশ্বাস। মনে রাখা দরকার, এই জাদুবিশ্বাসের সঙ্গে দেবদেবীকে তুষ্ট করবার বা খুশি করবার, করুণা চাওয়ার বা আশীৰ্বাদ চাওয়ার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কেননা, জাদুবিশ্বাস হলো প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী পর্যায়ের চেতনা। জাদুবিশ্বাসের মূল কথা, প্রার্থনা-উপাসনা নয়—তার বদলে প্রকৃতিকে বশ করবার চেষ্টাই। তার মধ্যে প্রায় সবটাই অবশ্য মনগড়া, কল্পনা। কিন্তু তবুও প্রার্থনা-উপাসনা নয়। বৃষ্টির একটা নকল তুলে আকাশে আসল বৃষ্টি ডেকে জানবার আয়োজন করা, বা শক্রর একটা মোমের মূর্তি পুড়িয়ে শক্রকে বিনাশ করবার চেষ্টা করা—এগুলি আর যাই হোক ঈশ্বরের কাছে আশীর্বাদ ভিক্ষা করা নয়। তেমনি, মাটি দিয়ে সুস্থ ষাঁড়ের নকল করে আসল ষাঁড়কেও সুস্থসবল করে তোলবার আয়োজন; তার মধ্যে বাস্তব প্রাকৃতিক জ্ঞানের অভাব যতোই বিকট হোক না কেন, কৃপাভিক্ষার মনোভাব নেই,–যদিও অবশ্যই উত্তরযুগে, আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে দেবদেবীদের জন্ম হবার পর, ওই আদিম জাদু-বিশ্বাসটির উপর উত্তরযুগের প্রার্থনা-উপাসনার মনোভাব এসে জমেছে : দেবী ডিমিটর যেন নকল ষাঁড় পাওয়ার খুশিতেই আসল ও সুস্থ ষাঁড় ফিরিয়ে দেবেন(৫০৮)।
