মোহেনজোদারো-প্রসঙ্গে স্যর জন মার্সালের মন্তব্যই আধুনিক বিদ্বানদের এ-বিষয়ে সচেতন করেছে যে, একদিকে মোহেনজোদারোর ওই নারীমূর্তিগুলি থেকে এবং অপরদিকে আধুনিক ভারতবর্ষের গ্রামদেবতাগুলির স্বরূপ-উপলব্ধির দিক থেকে—শাক্ত মতবাদের আদি-অকৃত্তিম রূপটিকে চেনবার
চেষ্টা করা যায়। তাই আমাদের পক্ষে এখানে সুস্পষ্টভাবে দেখা দরকার এ-বিষয়ে স্যর জন মার্সাল ঠিক কী বলছেন(৫০১) :
মোহেনজোদারো বা হরপ্পায় শক্তিবাদ সংক্রান্ত কোনো অপরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই কথাটি আমি খুব স্পষ্টভাবে বলে রাখতে চাই। যেটুকু প্রমাণ আছে তা প্রধানতই ইংগিতমূলক। ভারতবর্ষে শক্তি উপাসনা অত্যন্ত সুপ্রাচীন। বসুমাতার পূজাপদ্ধতি থেকেই এর জন্ম এবং শিবপূজাপদ্ধতির সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাছাড়া, পশ্চিম-এসিয়ার রকমারি পূজাপদ্ধতির সঙ্গে এই শাক্ত উপাসনার কয়েকটি অঙ্গের সাদৃশ্য এত গভীর যে, আমরা তার কথা এড়িয়ে যেতে পারি না, বা, সিন্ধু উপত্যকার মানুষদের মধ্যে এর অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারি না। শক্তিবাদের মূল কথা হলো, যৌন দ্বৈতভাব।…আদিম মাতৃকাউপাসনার এই বিকাশটির মধ্যে, দেবী পরিণত হয়েছেন নারী-শক্তির ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রূপে (শক্তি) বা এক অনাদি সত্যে (প্রকৃতি); এবং চিরন্তন পুরুষ-তত্ত্বের (পুরুষ) সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি বিশ্বের এমনকি দেবতাদেরও স্রষ্টা ও মাতা হয়েছেন (জগন্মাতা বা জগদম্বা)। সর্বোচ্চ রূপের দিক থেকে তিনি হলেন মহাদেবী, শিবের সঙ্গিনী, যাঁর (শিবের) পুজোর সঙ্গে, আমরা আগেই বলেছি, শক্তিবাদ অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধে আবদ্ধ হয়েছিলো। তবুও তিনি শিবের স্রষ্টা ও শিবের চেয়েও বড়ো বলে কল্পিত হয়েছেন।…শক্তিবাদের অনেক তত্ত্ব ও আচার অনুষ্ঠান উত্তর যুগের হিন্দুধর্মের অবদান এবং তা প্রধানতই আর্য-প্রভাবের ফল। কিন্তু তার মৌলিক অঙ্গগুলি সুনিশ্চিতভাবেই অনার্য এবং এগুলি যৌন দ্বৈতের ধারণা থেকে উদ্ভূত–যে-যৌন-দ্বৈতের ধারণা, বাৰ্থ বলছেন, ভারতবর্ষের মতোই পুরোনো।
মেডিটারেনিয়ানের কিনারায়, এসিয়া মাইনর-এ, মাতৃকা-তন্ত্রের যে-বিকাশ দেখা যায় তার সঙ্গে শক্তিবাদের তুলনা করে স্যর জন মার্সাল(২০২) বলছেন:
মৌলিক ধ্যানধারণার দিক থেকে এই (এসিয়ামাইনরদের) পূজাপদ্ধতিগুলির সঙ্গে ভারতীয় শক্তিবাদের সাদৃশ্য যথেষ্ট স্পষ্ট। এই পূজাপদ্ধতিগুলির কেন্দ্রে আছেন মাতা বা প্রকৃতি দেবী, যিনি আত্মদেহ থেকে নিজের সঙ্গী দেবতাটির সৃষ্টি করেছেন–ঠিক যেমন ভারতবর্ষের দেবীমাতা শিবকে সৃষ্টি করলেন আর তারপর এই দেবতাটির সঙ্গে মিলিত হয়েই সবকিছুর জন্ম দিলেন…। ওই দেবীমাতার পূজাপদ্ধতির অঙ্গ হলো নির্বিচার যৌনমিলন ও রক্তবহুল বলিদান। এই পূজাপদ্ধতির সঙ্গে ভারতবর্ষীয় শক্তিপূজার আশ্চর্য সাদৃশ্যের কথা বহুদিন থেকেই স্বীকৃত হয়েছে; এবং একথাও স্বীকৃত হয়েছে যে, একজাতীয় সমাজ-ব্যবস্থা থেকেই (অর্থাৎ মাতৃপ্রধান সমাজ-ব্যবস্থা থেকেই) উভয়ক্ষেত্রে (অর্থাৎ ভারতবর্ষে এবং ভারতবর্ষের বাইরে) এই পূজাপদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিলো : প্রাক্-আর্য যুগে ভারতবর্ষ ও নিকট-প্রাচ্য উভয় দেশেই মাতৃপ্রধান সমাজ ছিলো বলে অনুমান করা হয়। যে-কথাটি স্বীকার করা হয়নি—এবং হরপ্পা-মোহেনজোদারো আবিষ্কৃত হবার শুধুমাত্র পরই যা দেখতে পাওয়া সম্ভবপর হলে,—তাই যে, তাম্রপ্রস্তর যুগেও ভারতবর্ষ ও পশ্চিম-এসিয়া একই সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ ছিলো!
সুদূর প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভারতবর্ষের সঙ্গে পশ্চিম এসিয়ার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিলো কি না এবং যদিই বা ছিলো তাহলে তা ঠিক কোন ধরনের যোগাযোগ,—এ-বিষয়ে প্রত্নতত্বমূলক গবেষণার মূল্যকে ছোটো করবার প্রশ্ন নিশ্চয়ই ওঠে না। কিন্তু গবেষকের দৃষ্টি যদি শুধুমাত্র এই প্রশ্নটির উপর আবদ্ধ থাকে যে, ‘এ-দেশ থেকে শক্তিবাদ ওদেশে রপ্তানি হয়েছিলো, না, ওদেশ থেকে তা এদেশে আমদানি হয়েছিলো?’(৫০৩)—তাহলে তা আমাদের বর্তমান সমস্যা-প্রসঙ্গে অনেকাংশেই অবান্তর হতে বাধ্য। কেননা, এই আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত প্রকল্পগুলির পরিণতি শেষ পর্যন্ত যাই হোক না কেন, বর্তমানে আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, সেই সুদূর অতীতে এই জাতীয় ধ্যানধারণা ও বিশ্বাস-অনুষ্ঠান ঠিক কোন ধরনের পার্থিব প্রয়োজন মেটাবার চেষ্টা করেছে? এই শক্তিবাদের বাস্তব কারণ ঠিক কী? কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার চেষ্টায় মানবচেতনায় এই শক্তিবাদের আবির্ভাব হয়েছিলো? কোনো-না-কোনো বাস্তব কারণ নিশ্চয়ই ছিলো, নিশ্চয়ই ছিলো কোনো-না-কোনো পার্থিব প্রয়োজন মেটাবার তাগিদ। কেননা শক্তিবাদ– তথা, যে-কোনো রকম ধ্যানধারণাই হোক না কেন,—নিশ্চয়ই অকারণও হতে পারে না, স্বয়ম্ভুও হতে পারে না। মানুষের পক্ষে পারিপার্থিক পৃথিবীটাকে আয়ত্বে আনবার চেষ্টার পরিণাম হিসেবেই ধ্যানধারণার পক্ষে মানুষের চেতনায় আবির্ভূত হওয়া সম্ভবপর।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলছেন, সিন্ধুসভ্যতার ওই বসুমাতাগুলির সঙ্গে প্রাচীন পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের বসুমাতাগুলির আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে। যদি তাই থাকে তাহলে অনুমান করতে হবে, যে-উদ্দেশ্য সাধন করবার জন্য, যে-পার্থিব পরিবেশে, প্রাচীনকালের অন্যান্য দেশের মানুষেরা এই বসুমাতা মূর্তিগুলি গড়েছিলো, সেই উদ্দেশ্যেই প্রাচীনকালের সিন্ধুউপত্যকার মানুষেরাও গড়েছিলো তাদের বসুমাতা-মূর্তি। প্রত্নতত্ত্ববিদের যদি মূর্ত তথ্যের নির্ভরে সত্যিই প্রমাণ করেন যে, অন্যান্য দেশের শক্তিবাদ সিন্ধুসভ্যতার শক্তিবাদকে প্রভাবিত করেছিলো, কিংবা, সিন্ধুসভ্যতার শক্তিবাদ প্রভাবিত করেছিলো অন্যান্য দেশের শক্তিবাদকে,—তাহলেও, এই পার্থিব প্রয়োজন মেটানোর তাগিদটির কথা সত্যিই ছোটো হয় না। কেননা, ওই পার্থিব প্রয়োজনের দাবি মেটাবার তাগিদ ছাড়া কোনো মানবদলের মনেই এই শক্তিবাদের ঠাই হওয়া সম্ভব নয়(৫০৪)। ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, দেশোদ্ভূতই হোক আর বিদেশাগতই হোক, শক্তিবাদের বিকাশের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্রের প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রটির অভাবেই পশুপালনজীবী বৈদিক মানুষদের জীবনে শক্তিবাদের বিকাশ সম্ভবপর হয়নি। কিংবা, প্রত্নতত্ত্বেরই নজির রয়েছে যে, একই দেশে এবং একই জাতির জীবনে মৌলিক পরিবর্তন দেখা দেবার ফলে ওই বাস্তব-প্রয়োজনের তাগিদে রূপান্তর ঘটেছে—তাই শক্তিবাদের প্রভাবও বিলুপ্ত হয়েছে : এই জাতীয় নজির থেকে অনুমান করা যায়, শক্তিবাদের সম্যক-উপলব্ধি ব্যাপারে ওই পার্থিব প্রয়োজনের প্রসঙ্গটিই সবচেয়ে মৌলিক। অধ্যাপক জর্জ টমসনের(৫০৫) রচনা অনুসরণ করে এখানে কয়েকটি প্রত্নতত্ত্বমূলক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়।
