মোহেনজোদারোর দেবীমূর্তি-প্রসঙ্গে স্যর জন মার্সালের ওই মন্তব্যগুলি আধুনিক ভারততত্ত্ববিদ-দের উপর অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গতভাবেই গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। কেননা, প্রধানত এই মন্তব্যের নির্দেশ অনুসারে অগ্রসর হয়েই আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকে বলছেন, শাক্ত মতবাদ শুধুই যে আজকের দিনে আমাদের দেশে বেঁচে রয়েছে তাই নয়—এর ইতিহাস অনেক হাজার বছরের পুরানো। দ্বিতীয়ত, এ-মতবাদের বিকাশ অতীতকালে শুধুমাত্র আমাদের দেশের গণ্ডিটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো না, দেশান্তরেও তার বিকাশ ঘটেছিলো। যেমন মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ(৪৯৮) বলছেন :
An enquiry into the ancient cultures would show that the cult of Sakti is very old in India as in other parts of the world. And it is quite possible that it existed along with Saiva and Pasupata cults in the days of the pre-historic IndusValley civilization. প্রাচীন সংস্কৃতি সংক্রান্ত অনুসন্ধানের ফলে দেখা যায়, শাক্ত পুজা-পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সুপ্রাচীন। খুব সম্ভব, প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতাতে শৈব ও পাশুপত পূজাপদ্ধতির পাশাপাশি এই শাক্ত পূজাপদ্ধতিও বর্তমান ছিলো।
তাই বলে এই শাক্ত-পূজাপদ্ধতিকে শুধুমাত্র অতীতের ঘটনা মনে করা চলবে না। মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ(৪৯৯) তাই বলছেন :
The cult of Sakti produced a profound influence on general Indian thought. A topographical survey of India would show that the country is scattered over with numerous centers of Sakti-sadhana. It was widespread in the past and has continued unbroken till today.
শাক্ত-পূজাপদ্ধতি সামগ্রিকভাবে ভারতীয় চিন্তাধারার উপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। স্থানবিবরণের দিক থেকে ভারতবর্ষের আলোচনা করলে দেখা যায়, দেশের উপর অসংখ্য শক্তিসাধনার কেন্দ্র ছড়ানো রয়েছে। অতীতে এই শাক্ত-ধর্ম অত্যন্ত প্রবল ছিলো এবং আজকের দিন পর্যন্ত তা অবিচ্ছেদ্যভাবেই চলে আসছে।
আজো ভারতবর্ষের বুকে শক্তি-সাধনার কতো অসংখ্য কেন্দ্র ছড়ানো আছে তার নজির দেখাবার জন্যে মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ স্যর জন উদ্রফের “শক্তি ও শাক্ত” গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন। এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, উদ্রফ্ প্রমুখের গবেষণা অনুসরণ করে শক্তি-সাধনার কেন্দ্রের দিক থেকে ভারতবর্ষের একটি মানচিত্ৰ আঁকলে তা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক হবে। এবং স্যর জন মার্সালের মন্তব্যকে আমরা যদি গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত থাকি তাহলে মানতে হবে শাক্ত ধ্যানধারণার সঙ্গে সম্ভবত মাতৃপ্রধান সমাজ-ব্যবস্থার যোগাযোগ ছিলো। ভক্টর এরেন্ফেস্ল্ মাতৃপ্রধান(৫০০) সমাজ-ব্যবস্থা ও তার স্মারকগুলির দিক থেকে ভারতবর্ষের বাস্তবিকই একটি মানচিত্র প্রস্তুত করেছেন। এই মানচিত্রের সঙ্গে শক্তি-সাধনার কেন্দ্রের দিক থেকে আঁকা আমাদের প্রস্তাবিত মানচিত্রটির তুলনা করলে শাক্ত ধ্যানধারণার উৎস সংক্রান্ত সমস্যার উপর নিশ্চয়ই আলোকপাত হতে পারে। দুঃখের বিষয়, মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ মহাশয়ের চেতনায় এই তুলনামূলক পদ্ধতির কথা— এবং এর উপর নির্ভর করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানলাভের সম্ভাবনার কথা,—একবারও উদিত হয়নি। তার বদলে তিনি শাক্ত ধ্যানধারণার আলোচনা প্রসঙ্গে শুধুমাত্র নিগুঢ় অধ্যাত্মতত্ত্বের অন্বেষণেই আত্মনিয়োগ করেছেন। এবং ঠিক এই কারণেই তার অমন প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও শক্তি ও শাক্ত সম্প্রদায় সংক্রান্ত তাঁর আলোচনা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। শাক্ত ধ্যানধারণার উপর বৈজ্ঞানিক আলোকপাত করবার বদলে তিনি শুধুই অধিবিদ্যামূলক কূট বিচারের অবতারণা করেছেন। অথচ, তাঁর রচনা থেকে যে-দুটি কথা উপরে উদ্ধৃত করেছি সেই দুটির প্রতিই তিনি যদি উপযুক্ত গুরুত্ব দিতে সম্মত হতেন তাহলে তাঁকে স্বীকার করতে হতো যে, শাক্ত ধ্যানধারণার আদি ও অকৃত্রিম রূপটির মধ্যে অধিবিদ্যামূলক ওই জাতীয় কূট তত্বের অন্বেষণ করাই অপ্রাসঙ্গিক ও বিজ্ঞান-বিরুদ্ধ প্রচেষ্টা হতে বাধ্য। কেন,—সে কথা স্পষ্টভাবে দেখা দরকার। স্যর জন মার্সালের মন্তব্য অনুসারে শাক্ত মতবাদের আদি-আকৃত্রিম রূপটিকে খুঁজে পাবার প্রধানত দু’রকম উপায় আছে। এক : হরপ্পা-মোহেনজোদারো এবং সে-আমলের সিন্ধু-নদ থেকে নীল-নদ পর্যন্ত সুবিস্তৃত ভূখণ্ড জুড়ে মাটি-খুঁড়ে-পাওয়া মাতৃমূর্তিগুলির তাৎপর্য নির্ণয় করে। দুই; আধুনিক ভারতবর্ষের ট্রাইব্যাল ও আধা-ট্রাইব্যাল অঞ্চলের গ্রামদেবতাগুলির তাৎপর্য নির্ণয় করে। অবশ্যই, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, মধ্যযুগে রচিত তান্ত্রিক ও শৈবাদি পুঁথিপত্রের মধ্যে অধিবিদ্যামূলক তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলি স্পষ্টই অধ্যারোপের ফল— প্রাগৈতিহাসিক ধ্যানধারণার উপর বা, যা একই কথা, সমাজ-বিকাশের অত্যন্ত প্রাচীন পর্যায়ের ধ্যানধারণার উপর মধ্যযুগীয় ও অপেক্ষাকৃত আধুনিক ধ্যানধারণার অধ্যারোপ। তান্ত্রিকাদি রচনায় এই জাতীয় অধিবিদ্যামূলক ধ্যানধারণা যে অধ্যারোপেরই পরিণাম তার একটি স্পষ্ট প্রমাণ হলো এই অধিবিদ্যামূলক ধ্যানধারণাগুলির মধ্যে অসংলগ্নতা ও পরস্পর-বিরোধিতা : বিভিন্ন বৌদ্ধসম্প্রদায়ের তত্ত্ব, বৈদাস্তিক তত্ত্ব প্রভৃতি নানা প্রকার তত্বের পরিচয় পাওয়া যায় তান্ত্রিক পুঁথিপত্রগুলির মধ্যে। তাই স্পষ্টই বোঝা যায়, উত্তরযুগে এই জাতীয় তত্ত্ব কৃত্রিমভাবে শাক্ত ধ্যানধারণার উপর আরোপিত হয়েছে বা এই জাতীয় তত্বের কাঠামোর মধ্যে কৃত্রিমভাবে শাক্ত ধ্যান ধারণাগুলিকে পুরে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে, শাক্ত মতবাদের আলোচনায় গবেষক যদি এই অধিবিদ্যামূলক কূট তত্ত্বের উপরই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখেন,–দুঃখের বিষয়, মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ তাই আবদ্ধ রেখেছেন,—তাহলে শাক্ত মতবাদকে উপলক্ষ্য করে হলেও তার আলোচনা প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগীয় কূট অধিবিদ্যার আলোচনাই হয়ে দাঁড়াবে,—মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজের আলোচনা যে-রকমটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
