মোহেনজোদারো ও হরপ্পা আবিষ্কার হবার পর, স্যর্ জন মার্সাল(৪৯৫) বললেন, এই পুরোনো মতদ্বৈতের উপর নতুন আলোকপাত হলো; কেননা মোহেনজোদারো ও হরপ্পায় খুঁজে পাওয়া গেলো প্রাক্-আর্য যুগের বাস্তব কীর্তি। এই প্রসঙ্গে প্রাক্-আর্য যুগের যে বাস্তব কীর্তিগুলিকে স্যর্ জন মার্সাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান মনে করলেন তা হলো অজস্র পোড়ামাটির ছোটোছোটো নারীমূর্তি। এই জাতীয় নারীমূর্তি হরপ্পা এবং মোহেনজোদারো উভয় স্থানেই পাওয়া গেলে—শুধু তাই নয়, বেলুচিস্তানের স্থান-বিশেষেও প্রত্নতত্ত্বমূলক খননকাজের ফলে এই জাতীয় বহু মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। স্যর্ জন অনুমান করেছেন, এগুলির মধ্যে কয়েকরকম মূর্তিকে হয়তো নিছক খেলার পুতুল মনে করা যেতে পারে; কিন্তু সবগুলিকে পুতুলমাত্র মনে করবার অবকাশ নেই। এগুলির মধ্যে কয়েক-রকম মূর্তির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের যোগাযোগ থাকবার সম্ভাবনা খুবই বেশি। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্যর জন উল্লেখ করছেন, একরকম নারীমূর্তির কোলে সন্তান, আর একরকম নারীমূর্তির গর্ভে সন্তান। এবং তিনি মন্তব্য করছেন, সন্তান-কামনায় মেয়েরা হয়তো ওই রকম সন্তানবতীর মূর্তি মানত করতো। আজো ভারতবর্ষের পিছিয়ে-পড়া অঞ্চলে, নজির হিসেবে স্যর জন বলছেন, মাতৃত্বের কামনায় মাতৃমূর্তি মানত করবার প্রথা দেখা যায়। তাই তাঁর মতে এগুলির ব্যাখ্যা হলো : ex-voto offerings, perhaps with a magical significance, for the purpose of procuring offspring। এইখানে বলে রাখা যায়, অনুরূপ দৃষ্টান্তের আলোচনা-প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টম্সন(৪৯৬) দেখাচ্ছেন, এ-জাতীয় দৃষ্টান্তকে মানত-মূলক মনে করা অসঙ্গত; কেননা, এর মূলে রয়েছে জাদুবিশ্বাস এবং ধ্যানধারণার ক্রমবিকাশের দিক থেকে মানতমূলক মনোভাবের চেয়ে এই জাহুবিশ্বাস অনেক প্রাচীন পর্যায়ের পরিচায়ক। সেদিন থেকে, ex-voto offerings এবং magical significance—এই দুটি কথা পরস্পর-বিরোধী হতে পারে। তাছাড়া, একটু পরেই স্যর জন নিজেই দেখাচ্ছেন, সন্তান কামনা ছাড়াও এই মাতৃমূর্তিগুলির সঙ্গে ফসল-কামনা মূলক জাদুবিশ্বাসের যোগাযোগ থাকা খুবই সম্ভব।
অবশ্যই, স্যর জন বলছেন, হরপ্পা-মোহেনজোদারোতে পাওয়া নারীমূর্তির মধ্যে বেশির ভাগই হলো এক-ধাঁচের : প্রায় নগ্ন, দাঁড়ানো ভঙ্গি, পরিপাটি করে চুল বাঁধা, ইত্যাদি। বেলুচিস্তান অঞ্চল থেকে পাওয়া নারীমূর্তিগুলির সঙ্গে এগুলির তফাত আছে। বেলুচিস্তানের মূর্তিগুলি পূর্ণাঙ্গ নারীমূর্তি নয় : মাথা, ধড় এবং তারপর শেষ—মিনোয়ান ও মিসিনিয়ান মাতৃদেবীদের মতো। পরের যুগের বসুমাতার বা Earthgoddess-এর সঙ্গে এই মূর্তিগুলির মিল খুব বেশি।
পার্সিয়া থেকে শুরু করে ইজিয়ন পর্যন্ত সুবিস্তীর্ণ দেশ জুড়ে বহু জায়গাতেই ওই সিন্ধু-উপত্যকা ও বেলুচিস্তান থেকে পাওয়া মাতৃমূর্তির অনুরূপ মূর্তি পাওয়া গিয়েছে : ইলাম, মেসোপটেমিয়া, ট্রান্সক্যাসপিয়া, এসিয়ামাইনর, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, সাইপ্রাস, ক্রিট, বালকান, ইজিপ্ট। স্তর, জন বলছেন, এই মূর্তিগুলি সম্বন্ধে সাধারণত বলা হয়, এগুলি হলো মহামাতৃমূর্তি (Great Mothers) of rosextet; মূর্তি (Nature Goddess),আনাতোলিয়ায় এই মাতৃতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিলো এবং তারপর তা পশ্চিম এসিয়ার নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছে : মাইরেস্-এর ধারণায় এই মাতৃতন্ত্র আনাতোলিয়া বা সিরিয়া থেকে মেসোপটেমিয়ার দিকে বিস্তৃত হয়েছিলো, দ্য-মর্গান মনে করেন মেসোপটেমিয়া থেকেই এগুলি পশ্চিম দিকে বিত্তারলাভ করেছিলো। স্যর জন মার্সাল বলছেন, বেলুচিস্তান এবং সিন্ধু উপত্যকায় এই মাতৃতন্ত্রের পরিচয় পাবার দরুন প্রমাণ হলো যে, এর আগে পর্যন্ত ওই মাতৃতন্ত্রের বিস্তার যতোটুকু মনে হতো, আসলে তার চেয়ে বিস্তারটা অনেক বেশি : পৃথিবীর যে-দেশই এর জন্মস্থান হোক না কেন, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, নব্যপ্রস্তর যুগেই—এমন কি হয়তো প্রত্ন-প্রস্তরযুগেও প্রাচ্যের বহুদূর পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিলো। ইতিপূর্বে অন্যত্র যে-সব মাতৃমূর্তি পাওয়া গিয়েছে সেগুলির সঙ্গে সিন্ধুসভ্যতার মাতৃমূর্তিগুলির সাদৃশ্য অত্যন্ত গভীর; তাই এ-সিদ্ধান্ত সংবরণ করা কঠিন যে, . সিন্ধুসভ্যতার ওই মূর্তিগুলিও বসুমাতার মূর্তিই এবং পশ্চিমাঞ্চলের অনুরূপ মূর্তি যে-উদ্দেশ্য সাধন করেছে এগুলিও নিশ্চয়ই তা সাধন করতো। হরপ্পা-মোহেনজোদারো আবিষ্কৃত হবার পর এই সিদ্ধাস্তের গুরুত্ব অত্যন্ত বেড়ে গেলো; কেননা দেখা গেলো নীল-নদ থেকে সিন্ধু-নদ পর্যন্ত সুবিস্তীর্ণ ভূখণ্ড জুড়ে একটানাভাবে—যে-ভূখণ্ড শুধুমাত্র ভৌগোলিকভাবেই সংযুক্ত নয়, তাম্র-প্রস্তর যুগে যার মধ্যে সংস্কৃতিক যোগাযোগও বর্তমান ছিলো,—এই মাতৃমূর্তিগুলি মাটি চাপা পড়ে রয়েছে। এই জাতীয় মাতৃকা সম্বন্ধে স্যর জন মার্সাল(৪৯৭) মন্তব্য করলেন :
ওই হলো মাতৃকা বা মহামাতৃকা এবং “প্রকৃতির” নমুন—ষে-প্রকৃতি থেকে ক্রমশ “শক্তি’র উদ্ভব হয়েছিলো। গ্রামদেবতারা তারই প্রতিনিধি। এই গ্রামদেবতাদের নাম বহু প্রকারের এবং স্থানবিশেষে তাদের গুণাগুণের মধ্যেও পার্থক্য আছে, কিন্তু তারা প্রত্যেকে একই শক্তির মূর্ত বিগ্রহ।–এই মাতৃক জননশক্তির স্রষ্টা। পশ্চিম এসিয়ার মাতৃকাদেবীদের মতোই এগুলিরও উদ্ভব যে মাতৃপ্রধান সমাজে হয়েছিলো সে-কথা খুবই সম্ভবপর মনে হয়। সে-সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, এ-বিষয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না যে, অনার্য দেশবাসীদের জাতীয় দেবদেবীদের মধ্যে এই মাতৃকারা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলো। তার নানা রকম পরিচয় পাওয়া যায়। আদিম ট্রাইবদের মধ্যে এই মাতৃকাগুলির জনপ্রিয়তা চোখে পড়ে; তাছাড়া, এদের অনুষ্ঠান-উৎসবাদি ব্যাপারেও ব্রাহ্মণদের বদলে নীচজাতির অদূতেরা প্রধান অংশ গ্রহণ করে—উক্ত আছুতেরা পুরোনো ট্রাইবের লোক এবং তারাই জানে কেমন করে মানুষের কথা ওই মাতৃকাদের কর্ণগোচর করা যায়। আর্যপূর্ব ট্রাইবগুলির মধ্যে কোনো কোনোটি কখনোই হিন্দুধর্মের অন্তভূক্ত হয়নি। এই ট্রাইবগুলির মধ্যে মাতৃকা বা বস্থমাতার উপাসনা বিশেষ জোরালো হয়ে আছে দেখা যায়। বৈদিক পুরাণজগতে দেবীর অপ্রধান; বৈদিক আৰ্যদের বস্থমাতা পৃথিবী’ আসলে মহামাতৃকা বা দেবীমাতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
