জন্মের পরেই শিশুকে মাটিতে শুইয়ে দেবার প্রথা ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে। শিশুর সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্কমূলক বিশ্বাস এই প্রথার মধ্যে প্রকাশিত।
সিংহলের অসভ্য আদিবাসীরা(৪৮৪) মনে করে, জন্মের পরই শিশুকে মাটির উপর শুইয়ে দেওয়ার প্রথাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিফন্ট(৪৮৫) দেখাচ্ছেন, ব্ৰেজিল, গোল্ডকোস্ট ও মধ্য-আফ্রিকার অসভ্য মানুষদের মধ্যে ঠিক একই অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে। সিসিলিতে এখনো এই বিশ্বাস টিকে আছে : মেয়েরা মনে করে, সন্তান-জন্মের পরই যদি নবজাতককে ভূমিষ্ঠ করা বা মাটিতে শোয়ানো না হয় তাহলে হাসপাতালেই তার মৃত্যু হবে।
অস্ট্রেলিয়া(৪৮৬) এবং উত্তর-আমেরিকায়(৪৮৭) আদিবাসী মেয়েদের বিশ্বাস, পৃথিবীরই কোনো কোনো গুহা থেকে তারা পেটের ছেলে পেটে পায়। ওরা বলে, গুহাগুলোর আশপাশে মাটির উপর কান দিলে অজাত-শিশুদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়।
আফ্রিকার(৪৮৮) এক আদিবাসী-সর্দারকে চেয়ারে বসতে বলা হয়েছিলো। সে বললো, তার চেয়ে মায়ের কোলে বসা ঢের ভালো। এই বলে সে মাটির উপর বসে পড়লো।
সংক্ষেপে : আদিম মানুষের বিশ্বাস, মানবীয় ফলপ্রসূতা ও প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে। কৃষিআবিষ্কারের পর্যায়ে স্বভাবতই এই বিশ্বাসটির উপরই বিশেষ গুরুত্ব অর্পিত হয়। কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার। কৃষিকেন্দ্রিক ধ্যানধারণা তাই নারীকেন্দ্রিক—প্রজনন ব্যাপারে পুরুষের ভূমিকা অপ্রধান। মানবীয় উৎপাদন-শক্তি বলতে নারীর ভূমিকাটুকুই, প্রধান। অতএব, এই পর্যায়ের ধ্যানধারণা অনুসারে নারীর উৎপাদিক-শক্তি এবং প্রকৃতির উৎপাদিকা-শক্তি—উভয়ের মধ্যে গভীর ও নিবিড় যোগাযোগ পরিকল্পিত হয়েছে।
অতএব একদিকে দেখা যায়, নারীর উৎপাদিকা-শক্তির উপরই প্রাকৃতিক উর্বরতা নির্ভরশীল : পৃথিবীর আদি-শস্য নারীদেহ-সমুদ্ভূত বলেই কল্পিত, কিংবা প্রজনন-সংক্রান্ত কোনো মেয়েলি ব্যাপারের সাহায্যেই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূত আয়ত্বে আনবার কল্পনা।
অপরদিকে দেখা যায়, প্রাকৃতিক উৎপাদিকা-শক্তির উপরই নারীর উৎপাদিকা-শক্তি নির্ভরশীল : পৃথিবীই আদি-জননী, মানবসন্তান পৃথিবী-সমুদ্ভূত, কিংবা প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের সাহায্যেই মানবীর সন্তান-কামনা সফল করবার আয়োজন করা হচ্ছে।
সমাজ-বিকাশের পিছন-দিককার পর্যায়ের মামুষেরা—confused the process by which human beings reproduce their kinds with the process by which plants discharge the same function, and fancied that by resorting to the former they were simultaneously forwarding the latter(৪৮৯)—দুটি বিষয়ের মধ্যে তফাত করতে শেখেনি : একটি বিষয় হলো নিজেদের বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত পদ্ধতি, আর একটি বিষয় হলো গাছগাছড়ার বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত পদ্ধতি। অতএব তারা কল্পনা করেছে যে, প্রথমটির সাহায্যেই দ্বিতীয়টিকেও আয়ত্বে আনা সম্ভবপর।
কিন্তু সেই সঙ্গেই মনে রাখা দরকার যে, কৃষিকেন্দ্রিক সমাজে প্রকৃতিকে আয়ত্বে আনবার কল্পনায় এই যে অনুষ্ঠান এরই সঙ্গে নারীপ্রাধান্যের যোগাযোগও অত্যন্ত স্পষ্ট। তার কারণ, কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার, তাই প্রাকৃত পর্যায়ের কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ নারীপ্রধান এবং অতএব, কৃষিকেন্দ্রিক এই অনুষ্ঠানটিও নারীপ্রধান। অধ্যাপক জর্জ টম্সন(৪৯০) যেমন বলছেন :
the ritual for fertilising the soil was modelled on the ritual for reproducing the human species, that is the ritual of childbirth. The socialstatus of the women corresponded fo the importance of their part in the economic life. The community was ruled by female chiefs, whose sexual life was treated as a teremonial cycle of mimetic magic. The queen had to conceive in order that the earth might become fruitful.
জননী ও পৃথিবী এক। আদিম Earth-goddesses al Earth-mothers বা বসুমাতাগুলি এই বিশ্বাসেরই বিকাশ।
শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ(৪৯১) অনুমান করছেন, যে-বিশ্বাসটি থেকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আদিম বসুমাতা-পরিকল্পনার জন্ম সেই বিশ্বাসটিই আমাদের দেশের শাক্ত মতবাদকে বোঝবার মূলসূত্র। এবং লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-সন্ধানে অগ্রসর হয়ে আমরা দেখেছি, লোকায়তিক ধ্যানধারণাকে বোঝবার জন্য শাক্ত মতবাদের আদি-তাৎপর্য বোঝবার প্রয়োজন আছে। অতএব আমাদের পক্ষে ওই আদিম বসুমাতাগুলির কিছুটা পরিচয় পাবার চেষ্টা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
——————
৪৪৭. R. Briffault 3:54-5.
৪৪৮. J. Frazer GB 28.
৪৪৯. Ibid. 28-9.
৪৫০. R. Briffault op. cit. 3.55.
৪৫১. Ibid.
৪৫২. Ibid.
৪৫৩. J. Frazer op. cit. 29.
৪৫৪. R. Briffault op. cit. 3:59.
৪৫৫. Ibid. 3:55.
৪৫৬. Ibid. 3:54.
৪৫৭. Ibid. 3:55. ৪৫.
৪৫৮. J. Frazer op. cit. 29.
৪৫৯. Ibid. 119.
৪৬০. W. Crooke op, cit. 242.
৪৬১. R. Briffault op. cit. 3:56.
৪৬২. W. Crooke op. cit. 242.
৪৬৩. Ibid.
৪৬৪. E. Thurston CTSI 1:144; 6:20, 355; 3:103; 7.193.
৪৬৫. Ibid. 3:103.
৪৬৬. Ibid. 7:226.
৪৬৭. B G xxiii (1884) 45.
৪৬৮. E. Thurston op, cit. 1:205.
৪৬৯. Ibid. 2:359.
৪৭০. Ibid. 4:364.
৪৭১. BG xii (1880) 117; xx (1884) 132.
৪৭২. H. H. Risley TCB 139.
৪৭৩. Ibid. 2201, 229.
৪৭৪. E. T. Dalton DEB 194; H. H. Risley TCB 2:102.
৪৭৫. R. Briffault op. cit. 3:55.
৪৭৬. Ibid. 3:54.
৪৭৭. Ibid. 3:57.
৪৭৮. Ibid. 3:54ff.
৪৭৯. বিশ্বকোষ ১৪:৫৫০ |
৪৮০. ঐ।
৪৮১. ঐ । ( শুদ্ধিপত্র দ্রষ্টব্য)
৪৮২. ঐ।
৪৮৩. R. Briffault 3:58,
৪৮৪. Ibid.
৪৮৫. Ibid.
৪৮৬. Ibid.
৪৮৭. Ibid.
৪৮৮. Ibid.
৪৮৯. J. Frazer op. cit. 136.
৪৯০. G. Thomson R 10.
৪৯১. R. P. Chanda op. cit. ch. iv.
৩২. গ্রামদেবতা ও মোহেনজোদারোর বসুমাতা
মনিয়ার উইলিয়মস্(৪৯২), হপ্কিন্স(৪৯৩) ও প্রমুখ ইয়োরোপীয় বিদ্বানের প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, হিন্দুধর্মে আৰ্য-পূর্ব, বা তাঁদের পরিভাষায়, দ্রাবিড়-দের যদিই বা কোনো অবদান থাকে তাহলে তা নেহাতই নগণ্য এবং হিন্দুধর্মের যেটা হলো সবচেয়ে বীভৎস ও কুৎসিত দিক সেইটুকুই ওই অনার্যদের অবদান। অপরপক্ষে ওপ্পার্ট(৪৯৪) প্রমুখ গবেষকের হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে এই অনার্যদের অবদানটাকেই বড়ো করে দেখাবার চেষ্টা করেছেন।
