অন্যত্র(৪৬৯) ব্যবস্থা হলে, নবদম্পতী সরার উপর ন’-রকম বীজ বুনবে। কোথাও(৪৭০) আবার প্রথা আছে, বরকে ছুরি দিয়ে একটুখানি জমি কোপাতে হবে—তার উপর নববধূ বীজ বপন করবে, বীজ বপন করে জলসিঞ্চন করবে।
কোথাও(৪৭১) বা প্রথা আছে, বিবাহের সময় নববধূর কোলে একটি শিশুসন্তান বসিয়ে দেওয়া—কিন্তু মানব সন্তানের বদলে গাছের ফলও হতে পারে। উত্তরভারত থেকে শুরু করে দক্ষিণভারত পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে নানা জায়গায় এই প্রথাটি দেখা যায়। গাছের ফল এবং মানুষের ফলকে সমজাতীয় মনে করবার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত এই প্রথার মধ্যে রয়েছে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিবাহের প্রাথমিক অনুষ্ঠান হিসেবে বর বা বধু বা উভয়কেই প্রথমে গাছের সঙ্গে মিলিত হতে হচ্ছে। রিজলি-র(৪৭২) বর্ণনা অনুসারে, বাংলাদেশে বাগদিদের মধ্যে প্রথা হলো, বিয়ের দিন সকাল বেলায় বরের সঙ্গে মহুয়াগাছের বিয়ে হবে : যুবকটি মহুয়া গাছকে আলিঙ্গন করবে, মহুয়াগাছের গায়ে সিঁদুর মাখিয়ে দেবে, তার কব্জিতে সুতো বেঁধে সুতোর অপর প্রান্ত গাছের চার পাশে জড়িয়ে দেওয়া হবে এবং শেষ কালে ওই সুতো দিয়ে বরের কব্জিতে মহুয়া পাতা বেঁধে দেবার পরই সে কনে-বাড়ি গিয়ে বিয়ে করতে পারবে। অন্যত্র, বিয়ের আগে বর ও বধূ উভয়ের সঙ্গেই আমগাছের বিয়ে হয়, আমগাছের বদলে আমের ডালও হতে পারে। কূর্মীদের(৪৭৪) মধ্যে প্রথা হলো, বিয়ের আগে বরের সঙ্গে বিয়ে হবে আমগাছের, বধূর সঙ্গে বিয়ে হবে মহুয়াগাছের।
ব্রিফন্ট(৪৭৫) বলছেন, সারা পৃথিবী জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়, বিবাহঅনুষ্ঠানের একটি অঙ্গ হলো, বর-বধুর মাথায় শস্য স্থাপন করা। আমাদের দেশে ধান-দুর্বার ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক; ব্রিফট-এর রচনা অনুসরণ করলে দেখা যায়, ইয়োরোপের কৃষক মহলেও এই অনুষ্ঠানই হয়তো অল্পবিস্তর রূপান্তরের আড়ালে আজো টিকে রয়েছে।
এই জাতীয় সমস্ত অনুষ্ঠানেরই মূল কথা হলো, প্রাকৃতিক ফলপ্রসূত এবং মানবীয় ফলপ্রসূতা উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য ও যোগাযোগে বিশ্বাস। কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে এ-বিশ্বাস অনিবাৰ্যভাবেই বসুমাতার আদিরূপটির জন্ম দিয়েছে। কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার। কৃষিভিত্তিক সমাজ মাতৃ-প্রধান। এই স্তরের মানুষদের ধারণায়, প্রজননের মূল রহস্য নারীপ্রকৃতির মধ্যে—পুরুষ অপ্রধান, বীজ অপ্রধান; নারীই প্রধান, ক্ষেত্রই প্রধান। মানবীয় ফলপ্রসূতা বলতে মূলতই নারীর ফলপ্রসূতা, উৎপাদিক-শক্তি। এই স্তরের চেতনায়, পৃথিবী ও জননী এক এবং অদ্বিতীয়। পৃথিবীই আদি-জননী, আদি-জননীই পৃথিবী। রবার্ট ব্রিফন্ট (৪৭৬)বলছেন, মানবসংস্কৃতির আদিম পর্যায়ের বসুমাতাগুলিকে এই বিশ্বাসের বিকাশ হিসেবেই চেনবার চেষ্টা করতে হবে :
পশ্চিম এসিয়া ও ইয়োরোপের ধর্মবিশ্বাসে মহামাতৃকাগুলি যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে তার মূলে ছিলো কৃষি-অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক—ফসলের মা, বা, সোনালি ফসলের জন্মদায়িনী বসুমাতা হিসেবেই তারা কল্পিত হয়েছিলো।
ব্রিফন্ট(৪৭৭) দেখাচ্ছেন, নারী ও পৃথিবীর মধ্যে অভেদ-কল্পনার দৃষ্টান্ত এতো অজস্র যে, তা নিয়ে পাতার পর পাতা লিখে যাওয়া যায়। রোমান আইনকর্তাদের মতে জননী ও জমি একই ধরনের। খৃস্টানদের ধর্মপুঁথিতে বলা হয়েছে, মাতৃগর্ভ থেকে আমি নগ্নভাবেই ভূমিষ্ঠ হয়েছি, নগ্ন অবস্থাতেই আমি সেখানে ফিরে যাবো। এস্কাইলাস বলছেন, পৃথিবীই সর্বমাতৃকা—কেননা পৃথিবী থেকেই সবকিছুর জন্ম এবং পৃথিবীতেই সবকিছুর লয়। ভার্জিল বলছেন, বন্দে শস্য-মাতৃকা, বন্দে সর্বমানবমাতৃকা। প্রায় একই ভাষায় অসভ্য জার্মানের গান গাইতে; বন্দে পৃথিবী, মানবমাতৃকা; দেবতার আলিঙ্গনে তুমি মানব কল্যাণে অন্নদায়িনী হয়ে ওঠো। প্রাচীন ইরাণী ধর্মবিশ্বাস অনুসারে পৃথিবী থেকেই মানুষের উদ্ভব হয়েছিলো। মানবার্থক Homo শব্দটি ক্ষেত্রবাচক Humus শব্দ থেকে এসেছে। পৃথিবী থেকেই আদি-মানব আদমের উৎপত্তি; তবুও মানুষ পোকার মতো মাটি থেকে জন্মেছিলো এ-কথা বিশ্বাস করবার জন্যে ল্যাক্টানটিউস ডিমোক্রিটাসকে ভর্ৎসনা করেছেন। জবাবে লুক্রেটিউস বলছেন, জন্তুজানোয়ার তো আর আকাশ থেকে পড়তে পারে না, পৃথিবীর বাসিন্দারা লোনা জলের হ্রদ থেকেও জন্মাতে পারে না; পৃথিবীকে যে মা বলা হয় তা ঠিকই বলা হয়—কেননা পৃথিবী থেকেই সমস্ত কিছু সৃষ্ট হয়েছে। এই প্রাচীন বিশ্বাসটির আরো অজস্র পরিচয় রবার্ট ব্রিফল্ট-এর(৪৭৮) রচনায় দেখতে পাওয়া যায়। আমরা এখানে আমাদের দেশের কিছু দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করতে পারি।
মেদিনীকোষ(৪৭৯) অনুসারে, মাতৃ শব্দের অর্থ পৃথিবী। বিশ্বকোষে(৪৮০) বলা হয়েছে : ‘আত্ম-মাতা, গুরুপত্নী, ব্রাহ্মণী, রাজপত্নী, গাভী, ধাত্রী এবং পৃথিবী–এই সাতজনকে মাত কহে। ঋগ্বেদে(৪৮১)আছে, ‘যদূর্ধ্বস্তিষ্ঠা দ্রবিণেহ ধত্তাদ্ যদ্বা ক্ষয়ো মাতুরস্যা উপস্থে’–ব্যাখ্যাকারেরা(৪৮২) বলছেন, এখানে ‘মাতার’ বলতে ‘পৃথিবীর’ বোঝায়—‘মাতুঃ অস্যাঃ পৃথিব্যাঃ’।
সন্তানের জন্ম হওয়াকে আমরা বলি ভূমিষ্ঠ হওয়া। কেন বলি? এর পিছনে ওই আমি বিশ্বাসেরই রেশ খুজে পাওয়া যায় : মানবসন্তান পৃথিবীজাত—তাই ভূমিতে স্থিত বা ভূমিতে পতিত ফলের মতোই তাকে দেখবার চেষ্টা। ব্রিফন্ট(৪৮৩) বলছেন,
